রাজস্ব তহবিল থেকে টাকা নেওয়ার বিষয়ে যে ব্যাখ্যা দিলেন আসিফ মাহমুদ

কুমিল্লা জেলা পরিষদের রাজস্ব তহবিল থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও অসত্য দাবি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া।

শনিবার (৩০ মে) রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে লাইভে এসে তিনি এই ব্যাখ্যা দেন। নিচে তার বক্তব্যের মূল বিষয়গুলো এসইও ফ্রেন্ডলি ও স্পষ্ট ফরম্যাটে তুলে ধরা হলো:

অভিযোগ বনাম বাস্তব: বাজেট বরাদ্দ ও 'টাকা নিয়ে যাওয়া'র পার্থক্য

কুমিল্লা জেলা পরিষদের প্রশাসক মো. মোস্তাক মিয়া অভিযোগ করেছিলেন যে, আসিফ মাহমুদ ও দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ জেলা পরিষদের রাজস্ব তহবিল থেকে যথাক্রমে ১৫ কোটি ও ১০ কোটি (মোট ২৫ কোটি) টাকা নিয়ে গেছেন।

এই অভিযোগের জবাবে আসিফ মাহমুদ বলেন, এটি অত্যন্ত হাস্যকর ও মানহানিকর একটি বক্তব্য। বিষয়টি বোঝাতে তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন:

"আগামী দিনে proposed budget বা প্রস্তাবিত বাজেট আসতে পারে ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার। সরকার এক বছরের জন্য নির্দিষ্ট কিছু খাতে এই বাজেট বরাদ্দ করে। এখন কেউ যদি শিরোনাম করে যে—'৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা নিয়ে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান', তবে তা যেমন হাস্যকর শোনাত, কুমিল্লা জেলা পরিষদের প্রশাসকের বক্তব্যও ঠিক তেমনই।"

রাজস্ব তহবিল ও বিশেষ বরাদ্দের আইনি প্রক্রিয়া

আসিফ মাহমুদ স্পষ্ট করেন যে, জেলা পরিষদের প্রশাসক সরকারি বাজেট প্রক্রিয়ার মৌলিক বিষয়গুলো গুলিয়ে ফেলেছেন।

রাজস্ব খাতের নিয়ম: রাজস্ব খাত থেকে কারো ব্যক্তিগতভাবে বা কোনো বিশেষ এলাকায় অতিরিক্ত বরাদ্দ নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বছরের শুরুতেই জেলা পরিষদ নির্ধারণ করে এই তহবিল কোথায় খরচ হবে।

বিশেষ এডিপি বরাদ্দ (ADP Special Allocation): স্থানীয় সরকার বিভাগ ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক বাজেটের একটি অংশ থাকে 'বিশেষ বরাদ্দ' (সাধারণত ১০০ থেকে ১২৫ কোটি টাকা)। সাধারণ মানুষের আবেদনের ভিত্তিতে মন্ত্রণালয় এই বরাদ্দ দিয়ে থাকে, যা দেওয়ার এখতিয়ার সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী বা উপদেষ্টার থাকে।

যেভাবে খরচ হয় এই সরকারি টাকা (ই-টেন্ডার প্রক্রিয়া)

সাবেক এই উপদেষ্টা জানান, উপদেষ্টা বা মন্ত্রী বরাদ্দ দিলেই কাজ শেষ হয়ে যায় না। টাকা খরচের সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি একটি সরকারি কমিটির মাধ্যমে সম্পন্ন হয়:

জেলা পরিষদের সিদ্ধান্ত: বরাদ্দকৃত টাকা কোন কোন প্রকল্পে খরচ হবে, তা জেলা প্রশাসকের (DC) বা প্রশাসকের সভাপতিত্বে একটি কমিটি বসে নির্ধারণ করে।

মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন: কমিটি তাদের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত প্রশাসনিক অনুমোদনের জন্য পুনরায় মন্ত্রণালয়ে পাঠায়।

স্বচ্ছতা ও ই-টেন্ডারিং: এই টাকা কাউকে সরাসরি ক্যাশ (নগদ) দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। শতভাগ টাকা ই-টেন্ডার (e-GP) প্রক্রিয়া এবং পিপিআর (PPR) মেনে ব্যয় করতে হয়।

২০১৫ সালের বরাদ্দের খতিয়ান ও উদাহরণ:

আসিফ মাহমুদ ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি ও জুন মাসের কুমিল্লা জেলা পরিষদের মাসিক সভার কার্যবিবরণী উল্লেখ করে দেখান যে, এই বিশেষ বরাদ্দের টাকা কোথায় খরচ হয়েছে:

সোলার লাইট স্থাপনের জন্য: ১ কোটি ১৪ লাখ টাকা।

কর্মহীন অসহায়দের কর্মসংস্থানের জন্য: ৬২ লাখ টাকা।

১০৪টি বিদ্যালয় ও ১৪টি কলেজের আসবাবপত্রের জন্য: ২৩ লাখ টাকা।

এছাড়া দাউদকান্দি, নাঙ্গলকোট, চৌদ্দগ্রাম এবং সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন মসজিদ (যেমন: ৮ নম্বর ওয়ার্ডের মদিনা মসজিদ) সংস্কারে এই টাকা নিয়ম মেনে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

আইনি ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি

এনসিপি মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, একজন জেলা পরিষদের প্রশাসক হয়েও রাজস্ব খাত এবং বিশেষ বরাদ্দের পার্থক্য না বোঝা দুঃখজনক। এটিকে তিনি রাজনৈতিক 'হ্যারাসমেন্ট' বা হয়রানি এবং মানহানিকর বলে উল্লেখ করেন।

তিনি কুমিল্লা জেলা পরিষদের প্রশাসককে তার দেওয়া বক্তব্য স্পষ্ট করার আহ্বান জানান, অন্যথায় আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন। একই সাথে দেশের নাগরিকদের যেকোনো তথ্য ছড়ানোর আগে তা 'ক্রস চেক' বা যাচাই করে নেওয়ার অনুরোধ জানান।