ইমান শুধু অন্তরের বিশ্বাস নয়; বরং মানুষের কথা, আচরণ ও চরিত্রে তার বাস্তব প্রকাশ ঘটে। একজন মানুষের ভদ্রতা, সরলতা ও সত্যনিষ্ঠতা তার ইমানের পরিচয় বহন করে। আবার ধূর্ততা, প্রতারণা ও নীচতা মানুষের অন্তরের অন্ধকার দিককে উন্মোচন করে দেয়। ইসলাম আমাদের শেখায়— ইমান মানে কেবল নামাজ-রোজায় সীমাবদ্ধ থাকা নয়; বরং মানবিকতা, চরিত্র ও আখলাকের সৌন্দর্যই হলো প্রকৃত ইমানের বাস্তব রূপ।
হাদিসের আলোকে ইমানদার ও চরিত্র
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— ‘ইমানদার মানুষ সরল ও ভদ্র হয়। আর পাপাচারী মানুষ ধূর্ত ও হীন চরিত্রের হয়।’ (তিরমিজি ১৯৬৪, মিশকাতুল মাসাবিহ ৫০৮৫)
এই হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) অত্যন্ত সংক্ষেপে ইমানদার ও পাপির চরিত্রগত পার্থক্য তুলে ধরেছেন। ইমানদারের সরলতা মানে বোকামি নয়; বরং তার অন্তর থাকে হিংসা, কপটতা ও প্রতারণামুক্ত। আর ভদ্রতা মানে দুর্বলতা নয়; বরং তা আত্মমর্যাদা ও নৈতিক শক্তির পরিচায়ক। এই সরলতা ও ভদ্রতাই ইমানদারের প্রকৃত গুণ।
কুরআনের আলোকে ইমানদারের চরিত্র
কুরআন মাজিদে আল্লাহ তাআলা ইমানদারদের চরিত্রের প্রশংসা করে বলেন— ‘রহমানের বান্দা তারাই, যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে। আর অজ্ঞরা তাদের সঙ্গে কথা বললে তারা বলে—‘সালাম’।’ (সুরা আল-ফুরকান: আয়াত ৬৩)
এই আয়াত ইমানদারের আচরণগত সৌন্দর্য তুলে ধরে—নম্রতা, সহনশীলতা ও শালীনতা। ইমানদার কখনো প্রতিশোধপরায়ণ নয়; বরং তার চরিত্রে থাকে প্রশান্তি ও ভারসাম্য।
ইমান ও উত্তম আখলাকের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক
ইমানের পূর্ণতা কেবল ইবাদতের আধিক্যে নয়; বরং উত্তম চরিত্রেই ইমানের সৌন্দর্য ফুটে ওঠে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— ‘ইমানের দিক থেকে সবচেয়ে পরিপূর্ণ হলো সেই ব্যক্তি, যার চরিত্র সবচেয়ে উত্তম।’ (তিরমিজি ১১৬২)
ধূর্ততা ও পাপাচার: ইমানের অবক্ষয়ের লক্ষণ
কপটতা ও ধূর্ততা পাপাচারের পরিচায়ক। ধূর্ততা মানুষকে সাময়িক লাভ দিলেও তা অন্তরকে কলুষিত করে এবং ইমানকে দুর্বল করে দেয়।
কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন— ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ এমন কাউকে ভালোবাসেন না, যে বিশ্বাসঘাতক ও পাপাচারী।’ (সুরা আন-নিসা: আয়াত ১০৭)
রাসুলুল্লাহ (সা.)— উত্তম চরিত্রের জীবন্ত আদর্শ
রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজের জীবনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেছেন— ‘আমি উত্তম চরিত্রকে পরিপূর্ণ করার জন্য প্রেরিত হয়েছি।’ (মুসনাদ আহমাদ ৮৯৩৯)
অতএব, যে ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)–এর অনুসরণ করতে চায়, তার চরিত্রেও ভদ্রতা, সরলতা ও নৈতিকতা ফুটে উঠবে—এটাই স্বাভাবিক।
সুতরাং ইমান এমন এক আলো, যা মানুষের অন্তরকে আলোকিত করে এবং তার আচরণকে সুন্দর করে তোলে। ইমানদার মানুষ তাই সরল, ভদ্র ও উদার চরিত্রের হয়। সে প্রতারণায় পারদর্শী নয়, ধূর্ততায় সিদ্ধহস্ত নয়; বরং তার শক্তি হলো সততা ও নৈতিকতা। আর পাপাচারী মানুষ বাহ্যিকভাবে যত চতুরই হোক না কেন, তার চরিত্রে ধরা পড়ে হীনতা ও কপটতা।