সাদাকাতুল ফিতর কী, কাদের ওপর ওয়াজিব? 

রমজান মাসের গুরুত্বপূর্ণ একটি ওয়াজিব ইবাদত সাদাকাতুল ফিতর। এটি দুটি আরবি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত— সাদাকা অর্থ দান এবং ফিতর অর্থ রোজা ভঙ্গ বা উন্মুক্ত করা। এক মাস সিয়াম সাধনার পর ঈদুল ফিতরের মাধ্যমে রোজা ভঙ্গ করা হয় এবং এ উপলক্ষে শরিয়ত কর্তৃক নির্ধারিত এই দান অসহায় ও দরিদ্রদের মাঝে বিতরণ করা হয়। এ কারণেই এর নাম সাদাকাতুল ফিতর।

রাসুলুল্লাহ (সা.) সাদাকাতুল ফিতর ওয়াজিব হওয়ার দুটি উদ্দেশ্য উল্লেখ করেছেন— একদিকে এটি রোজার ত্রুটি-বিচ্যুতি থেকে রোজাদারকে পবিত্র করে, অন্যদিকে দরিদ্র মানুষের খাদ্যের ব্যবস্থা করে। হাদিসে এসেছে—

عَنْ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا قَالَ: فَرَضَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ زَكَاةَ الْفِطْرِ طُهْرَةً لِلصَّائِمِ مِنَ اللَّغْوِ وَالرَّفَثِ وَطُعْمَةً لِلْمَسَاكِينِ

‘রাসুলুল্লাহ (সা.) সাদাকাতুল ফিতর নির্ধারণ করেছেন রোজাদারকে অশ্লীল ও অনর্থক কথা থেকে পবিত্র করার জন্য এবং মিসকিনদের খাদ্যের ব্যবস্থা করার জন্য।’ (আবু দাউদ ১৬০৯)

কাদের ওপর সাদাকাতুল ফিতর ওয়াজিব

যেসব মুসলিম নর-নারীর মালিকানায় মৌলিক প্রয়োজনের অতিরিক্ত সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপার সমমূল্যের সম্পদ থাকে, তাদের ওপর সাদাকাতুল ফিতর ওয়াজিব।

সাদাকাতুল ফিতর ওয়াজিব হওয়ার জন্য—

বালেগ হওয়া শর্ত নয়
সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন হওয়া শর্ত নয়
মুকিম হওয়া শর্ত নয়
অতএব নাবালেগ, মুসাফির বা মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তি নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হলে তাদের পক্ষ থেকেও সাদাকাতুল ফিতর আদায় করতে হবে। নাবালেগ ও মানসিক ভারসাম্যহীনের সম্পদ থেকে তাদের অভিভাবক ফিতরা আদায় করবেন। (রদ্দুল মুহতার ২/৩৫৯)

নিসাব নির্ধারণে যেসব সম্পদ গণ্য হবে

সাদাকাতুল ফিতরের নিসাব হিসাবের ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত সম্পদ অন্তর্ভুক্ত হবে—

নগদ টাকা
সোনা ও রুপা
অলংকার
ব্যবসায়িক পণ্য
অতিরিক্ত জমি
অতিরিক্ত বাড়ি
অপ্রয়োজনীয় আসবাবপত্র
এসব মিলিয়ে যদি সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপার সমমূল্যের সম্পদ থাকে, তাহলে সাদাকাতুল ফিতর ওয়াজিব হবে।

নিসাবের ওপর বছর পূর্ণ হওয়া কি জরুরি?

সাদাকাতুল ফিতরের ক্ষেত্রে নিসাবের ওপর বছর পূর্ণ হওয়া শর্ত নয়। ঈদুল ফিতরের দিন সুবহে সাদিকের সময় নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকলেই ফিতরা ওয়াজিব হবে। তবে ঋণ থাকলে তা বাদ দিয়ে নিসাব হিসাব করতে হবে।

যে ব্যক্তি রোজা রাখতে পারেনি, তার কাছেও নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকলে ফিতরা ওয়াজিব হবে। (বাদায়েউস সানায়ে : ২/১৯৯)

যাদের পক্ষ থেকে ফিতরা দিতে হবে

যার ওপর সাদাকাতুল ফিতর ওয়াজিব, তিনি— নিজের পক্ষ থেকে, নাবালেগ সন্তানের পক্ষ থেকে (যদি সন্তানের নিজস্ব সম্পদ না থাকে) ফিতরা আদায় করবেন। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া : ১/১৯৩)

যাদের পক্ষ থেকে ফিতরা দেওয়া ওয়াজিব নয়

নিম্নোক্ত ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে ফিতরা দেওয়া ওয়াজিব নয়—

পিতা-মাতা, স্ত্রী, বালেগ সন্তান তাদের নিজস্ব নিসাব থাকলে তারা নিজেরা ফিতরা আদায় করবেন। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া : ১/১৯৩; মারাকিল ফালাহ : পৃ. ৩৯৫)

মা সামর্থ্যবান হলেও নাবালেগ সন্তানের ফিতরা দেওয়া তার ওপর ওয়াজিব নয়। (কিতাবুল আছল : ২/১৭৭; রদ্দুল মুহতার : ২/৩৬৩)

সামর্থ্যবান দাদার ওপর নাতি-নাতনির ফিতরা দেওয়া ওয়াজিব নয়। তবে আদায় করলে উত্তম। (ফাতাওয়া খানিয়া : ১/২২৮; রদ্দুল মুহতার : ২/৩৬৩)

অন্যের পক্ষ থেকে ফিতরা আদায়

স্ত্রী বা বালেগ সন্তানের পক্ষ থেকে ফিতরা আদায় করে দিলে তা আদায় হয়ে যাবে।

كَانَ ابْنُ عُمَرَ يُعْطِي عَنْ أَهْلِهِ زَكَاةَ الْفِطْرِ

‘আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে সাদাকাতুল ফিতর আদায় করতেন।’ (মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা ১০৪৫৫)

তবে তা আগে জানিয়ে নেওয়া উত্তম।

নিসাবের মালিক নাবালেগ সন্তানের ফিতরা তার সম্পদ থেকেই আদায় করা নিয়ম। তবে পিতা চাইলে নিজ সম্পদ থেকেও দিতে পারেন। (বুখারি ১/২০৪, বাদায়েউস সানায়ে ২/১৯৯)

সাদাকাতুল ফিতরের পরিমাণ

হাদিসে পাঁচ প্রকার খাদ্য দ্বারা ফিতরা আদায়ের কথা এসেছে—

১. যব

২. খেজুর

৩. পনির

৪. কিশমিশ

৫. গম

যব, খেজুর, পনির ও কিশমিশ দ্বারা দিলে দিতে হবে এক সা‘ (প্রায় ৩ কেজি ২৭০ গ্রাম)।

গম দ্বারা দিলে দিতে হবে অর্ধ সা‘ (প্রায় ১ কেজি ৬৩৫ গ্রাম)।

এগুলো ওজনের পার্থক্য হলেও মূল্যের পার্থক্যও রয়েছে। সামর্থ্য অনুযায়ী যে কোনোটি দিয়ে ফিতরা আদায় করা যাবে। আল্লাহ তাআলা বলেন—

فَمَنْ تَطَوَّعَ خَيْرًا فَهُوَ خَيْرٌ لَهُ

‘কেউ স্বেচ্ছায় বেশি ভালো কাজ করলে তা তার জন্য উত্তম।’ (সুরা আল বাকারা: আয়াত ১৮৪)

মূল্য দ্বারা ফিতরা আদায়

খাদ্যদ্রব্য ছাড়াও সমমূল্যের অর্থ দিয়ে ফিতরা আদায় করা যায়।

كَانَ عُمَرُ بْنُ عَبْدِ الْعَزِيزِ يَأْخُذُ نِصْفَ دِرْهَمٍ قِيمَةً

ওমর ইবনে আবদুল আজিজ (রহ.) অর্ধ সা‘ গম বা তার মূল্য গ্রহণ করতেন। (মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা ১০৪৭০)

তাবেয়ি আবু ইসহাক (রহ.) বলেন—

أَدْرَكْتُهُمْ يُعْطُونَ فِي صَدَقَةِ الْفِطْرِ الدَّرَاهِمَ بِقِيمَةِ الطَّعَامِ

‘আমি তাদেরকে খাদ্যের মূল্য দিয়ে ফিতরা আদায় করতে দেখেছি।’ (বুখারি ১/১৯৪)

চাল বা অন্য খাদ্যশস্য দ্বারাও ফিতরা দেওয়া যায়। (আলমাবসূত ৩/১১৪)

একজন গরিবকে পূর্ণ ফিতরা দেওয়া উত্তম, তবে ভাগ করে দেওয়া জায়েজ। (বাদায়েউস সানায়ে ২/২০৮)

প্রবাসীদের ফিতরা

বিদেশে অবস্থানকারী ব্যক্তি দেশে ফিতরা পাঠালে তার অবস্থানস্থলের মূল্য অনুযায়ী ফিতরা দিতে হবে। (বাদায়েউস সানায়ে ২/২০৮, রদ্দুল মুহতার ২/৩৫৫)

প্রবাসে থাকা ব্যক্তির নাবালেগ সন্তানের ফিতরাও প্রবাসের মূল্য অনুযায়ী দিতে হবে।

সাদাকাতুল ফিতর আদায়ের সময়

ঈদের দিন ঈদের নামাজে যাওয়ার আগে ফিতরা দেওয়া উত্তম।

أَمَرَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ تُؤَدَّى زَكَاةُ الْفِطْرِ قَبْلَ خُرُوجِ النَّاسِ إِلَى الصَّلَاةِ

‘রাসুলুল্লাহ (সা.) ঈদের নামাজে যাওয়ার আগে ফিতরা আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন।’ (বুখারি ১৫০৯)

ঈদের কয়েক দিন আগেও ফিতরা দেওয়া জায়েজ। (আবু দাউদ ১৬০৬, মুয়াত্তা মালেক ৩১৬)

নির্ধারিত সময়ে আদায় না করলে পরে আদায় করাও জরুরি। (ফাতহুল কাদির ২/২৩১)

যাদেরকে ফিতরা দেওয়া যাবে

যাদেরকে জাকাত দেওয়া যায়, তাদেরকেই সাদাকাতুল ফিতর দেওয়া যাবে। (আদ্দুররুল মুখতার ২/৩৬৮)

আত্মীয়স্বজনকে ফিতরা দেওয়া

নিম্নোক্ত ব্যক্তিদের ফিতরা দেওয়া যাবে না— পিতা-মাতা, দাদা-দাদি, ছেলে-মেয়ে, নাতি-নাতনি, স্বামী-স্ত্রী।

তবে নিম্নোক্ত আত্মীয়দের দেওয়া যাবে— ভাই-বোন, চাচা-মামা, ফুফু-খালা, ভাতিজা-ভাগনে, শ্বশুর-শাশুড়ি। (বাদায়েউস সানায়ে : ২/১৬২)

অমুসলিমকে ফিতরা দেওয়া যাবে কি?

সাদাকাতুল ফিতর শুধু দরিদ্র মুসলমানদের জন্য নির্ধারিত। তাই অমুসলিমকে ফিতরা দেওয়া যাবে না। তবে নফল সদকা দেওয়া জায়েজ। (মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা ১০৫১২, রদ্দুল মুহতার ২/৩৬৯)