মহান আল্লাহর অস্তিত্বের জানান দেয় যেসব সৃষ্টি তার অন্যতম ও বড় দুটি হলো সূর্য ও চন্দ্র। সূর্য ও চন্দ্রগ্রহণ আল্লাহ তাআলার নির্ধারিত প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। সূর্যগ্রহণ ঘটে যখন চাঁদ পৃথিবী ও সূর্যের মাঝখানে এসে পড়ে এবং সূর্য আংশিক বা সম্পূর্ণরূপে আড়াল হয়ে যায়। চন্দ্রগ্রহণ ঘটে যখন পৃথিবী সূর্য ও চাঁদের মাঝখানে এসে পড়ে এবং চাঁদ অদৃশ্য হয়ে যায়।
আরবিতে চন্দ্রগ্রহণকে বলা হয় খুসুফ এবং সূর্যগ্রহণকে বলা হয় কুসুফ। এ উপলক্ষে যে নামাজ আদায় করা হয় তাকে বলা হয় সালাতুল কুসুফ বা খুসুফ।
সূর্যগ্রহণ নিয়ে মাতামাতি করে সময় ব্যয় না করে নামাজ ও প্রার্থনায় নিয়োজিত থাকা জরুরি। সূর্যগ্রহণের সুন্নত আমল হচ্ছে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা, দোয়া করা, নামাজ পড়া এবং সাদকা করা।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এসব আমলগুলোর মাধ্যমে সূর্যগ্রহণ অতিবাহিত করেছেন।
মহান আল্লাহ তার বান্দাকে সতর্ক করার জন্য আকাশ-মহাকাশে বিভিন্ন নিদর্শন দিয়েছেন। সুরা বনি ইসরাঈলে আল্লাহ ঘোষণা করেন-
وَمَا نُرْسِلُ بِالاٌّيَاتِ إِلاَّ تَخْوِيفًا
অর্থাৎ আর আমি ভীতি প্রদর্শনের উদ্দেশ্যেই নিদর্শনাবলি প্রেরণ করি।' (সুরা বনি ইসরাঈল : আয়াত ৫৯)
সূর্যগ্রহণের সময়ের নামাজ
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সূর্যগ্রহণের সময় নামাজ পড়তেন। এ নামাজকে 'সালাতুল কুসুফ' বলা হয়। তাই সূর্যগ্রহণের সময় নামাজ পড়া সুন্নত। তা জামাআতের সঙ্গে আদায় করাও সুন্নত।
দশম হিজরিতে যখন মদিনায় সূর্যগ্রহণ হয়, তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘোষণা দিয়ে লোকদেরকে নামাজের জন্য সমবেত করেছিলেন। সম্ভবত সে সময় তিনি জীবনের সর্বাধিক দীর্ঘ নামাজের জামাআতের ইমামতি করেছিলেন।
সূর্যগ্রহণের সে নামাজের কিয়াম, রুকু, সেজদাহ মোটকথা, প্রত্যেকটি রুকন সাধারণ সময়ের (অভ্যাসের) চেয়ে অনেক দীর্ঘ (লম্বা) ছিল। হাদিসে এসেছে-
সূর্য ও চন্দ্রগ্রহণের নামাজের পদ্ধতি
রাকাত সংখ্যা: দুই রাকাত।
আজান/ইকামত: নেই।
জামাত: সূর্যগ্রহণের নামাজ মসজিদে জামাতে আদায় করা সুন্নত (মাকরুহ ওয়াক্ত ছাড়া)।
কেরাত: দিনের নামাজ হওয়ায় কেরাত আস্তে পড়তে হবে।
পদ্ধতি: দীর্ঘ কিয়াম, দীর্ঘ রুকু ও দীর্ঘ সেজদা আদায় করা এই নামাজের নিয়ম। প্রথম রাকাতে তেলাওয়াত ও রুকু দ্বিতীয়বারের চেয়ে দীর্ঘ হবে। দ্বিতীয় রাকাতেও একই নিয়ম, তবে সময় কিছুটা কমানো হবে। হানাফি মাজহাবের বিখ্যাত ফিকহগ্রন্থগুলোতে বলা হয়েছে, ‘সূর্যগ্রহণের নামাজ সুন্নত এবং জামাতে আদায় করা উত্তম। প্রতিটি রাকাতে এক রুকু ও দুই সেজদা থাকবে। নামাজশেষে সূর্য সম্পূর্ণ উদ্ভাসিত না হওয়া পর্যন্ত দোয়া করতে হবে।’ (হিন্দিয়া: ১/১৫৩; তাতারখানিয়া: ২/৬৫৭, নং ৩৫২২)
তবে প্রত্যেক রাকাআতে ২ রুকু, ৩ রুকু বা ৪ রুকু আদায়ের এক ব্যতিক্রমী নিয়মেও এই নামাজ পাড়ার কথা হদিসে বর্ণিত হয়েছে। (বুখারি: ১০৪৭; আল-মুগনি: ৩/৩২৩; ইমাম নববি, আল-মাজমু: ৫/৪৮)।
সুন্নত আমলসমূহ
সালাতুল কুসুফ আদায় করা।
আল্লাহর জিকির, দোয়া ও ইস্তেগফার করা।
তাওবা করা।
সদকা করা।
সূর্য গ্রহণ শেষ হওয়া পর্যন্ত এ নামাজ পড়া সুন্নত। তবে সূর্যগ্রহণ শেষ হওয়ার আগে নামাজ শেষ করলেও কোনো সমস্যা নেই। তবে সূর্যগ্রহণ চলাকালীন বাকি সময়টুকতে জিকির, দোয়া, তাওবা-ইসতেগফা, দান-সাদকার মাধ্যমে কাটানো উত্তম। তাই এ সময় আনন্দে নয়, বরং সালাত, জিকির, দোয়া, তাওবা ও সদকার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে ঝুঁকে পড়াই প্রকৃত সুন্নত আমল। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সে তাওফিক দিন। আমিন।