মানুষের পর প্রথম ‘কাল্পনিক খেলায়’ পারদর্শী প্রাণীর সন্ধান

মানুষের বাইরে এই প্রথমবারের মতো কোনো প্রাণীর মধ্যে ‘কাল্পনিক বা রূপক খেলা’র (Pretend Play) প্রমাণ পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। মানুষের নিকটাত্মীয় হিসেবে পরিচিত ‘বোনোবো’ শিম্পাঞ্জির মধ্যে এই বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য দেখা গেছে, যা এতদিন শুধু মানুষের একচেটিয়া ক্ষমতা বলে ধারণা করা হতো। গত ৫ ফেব্রুয়ারি বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী ‘সায়েন্স’-এ এই গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়।

গবেষণার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ‘কাঞ্জি’ নামের একটি বিশেষ বোনোবো, যে ইংরেজি ভাষা বুঝতে পারার জন্য আগে থেকেই পরিচিত ছিল। পরীক্ষায় দেখা যায়, দুই বছর বয়সী মানব শিশুদের মতোই কাঞ্জি কাল্পনিক চা-চক্রের সময় অদৃশ্য জুস ও আঙুরের হিসাব রাখতে সক্ষম। 

জন্স হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ক্রিস্টোফার ক্রুপেনিয়ে বলেন, ‘আমরা যা দেখতে পাচ্ছি তা মৌলিকভাবে মানুষের বৈশিষ্ট্য, যা আমাদের নিকটতম প্রাণীদের মধ্যেও বিদ্যমান।

গবেষকদের মতে, বাস্তবে নেই এমন বস্তু কল্পনা করার এই ক্ষমতা সম্ভবত ৬০ লাখ বছর আগে বিবর্তিত হয়েছে। অর্থাৎ, মানুষ ও বোনোবোদের আদি পুরুষরা একে অপরের থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ার আগেই এই মানসিক সক্ষমতা তৈরি হয়েছিল।

গবেষক ক্রুপেনিয়ে এবং আমালিয়া বাস্তোস কাঞ্জিকে নিয়ে একাধিক পরীক্ষা চালান। প্রথমে তাকে একটি খালি কাপে অদৃশ্য জুস ঢালার অভিনয় করে দেখানো হয়। এরপর সেই অদৃশ্য জুস আবার অন্য পাত্রে সরিয়ে ফেলা হয়। দেখা যায়, কাঞ্জি ৬৮ শতাংশ ক্ষেত্রেই কাল্পনিক জুসের সঠিক অবস্থান শনাক্ত করতে পেরেছে।

সে কি ভুল করে খালি কাপকে পূর্ণ ভেবেছিল? এটি নিশ্চিত করতে গবেষকরা টেবিলের ওপর একপাশে আসল জুস এবং অন্যপাশে কাল্পনিক জুসের কাপ রাখেন। কাঞ্জি ৭৭.৮ শতাংশ বারই আসল জুসের কাপটি বেছে নেয়। এতে প্রমাণিত হয় যে, সে বাস্তব এবং কল্পনার মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য করতে পারে। পরবর্তীতে কাল্পনিক আঙুর দিয়ে করা পরীক্ষাতেও সে সফল হয়।

যদিও কাঞ্জি নিজে থেকে এই খেলা শুরু করেনি বরং মানুষের দেওয়া পরিস্থিতিতে সাড়া দিয়েছে, তবুও তার এই অংশগ্রহণ বিজ্ঞানীদের চমকে দিয়েছে। 

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী পল হ্যারিস মনে করেন, এটি দুই বছর বয়সী শিশুদের মতো স্বতঃস্ফূর্ত না হলেও প্রাণিরাজ্যে কল্পনাশক্তির অস্তিত্বের এক বিশাল প্রমাণ।

ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার নৃতত্ত্ববিদ লরা সিমোন লুইস এই আবিষ্কারকে একটি ‘বিশাল অগ্রগতি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, এই গবেষণার সূত্র ধরে ভবিষ্যতে অন্যান্য বৃহৎ বানরজাতীয় প্রাণীদের মধ্যেও কল্পনাশক্তির গভীরতা উন্মোচিত হবে।