চাঁদে নাসার ৯৩ বিলিয়ন ডলারের মিশনে যা জানা যাবে

একসময় মানুষ চাঁদে গিয়েছিল শুধু প্রমাণ করার জন্য যে তারা পারে এটাই ছিল অ্যাপোলো যুগের বড় চালিকা শক্তি। কিন্তু সেই অভিযানের সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল বিজ্ঞান। সেই সময়েই মানুষ প্রথম বুঝতে পারে, চাঁদ কোনো আলাদা জগত নয়; বরং পৃথিবীর সঙ্গেই তার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। চাঁদের পাথর বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সেগুলো পৃথিবীর অভ্যন্তরের উপাদানের সঙ্গে আশ্চর্য রকম মিল রাখে। এখান থেকেই জন্ম নেয় সেই বিখ্যাত তত্ত্ব, এক ভয়ংকর সংঘর্ষের ফলে চাঁদের সৃষ্টি।

প্রায় সাড়ে চার বিলিয়ন বছর আগে, পৃথিবীর মতো একটি বৃহৎ প্রোটোপ্ল্যানেটের সঙ্গে মঙ্গলগ্রহের আকারের আরেকটি বস্তু, যাকে থিয়া বলা হয়, ধাক্কা খায়। সেই সংঘর্ষ এতটাই শক্তিশালী ছিল যে গলিত পাথরের বিশাল অংশ মহাকাশে ছিটকে গিয়ে পরে জমাট বেঁধে চাঁদ তৈরি করে। এই ধারণা আজও বিজ্ঞানীদের মধ্যে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য, যদিও এর খুঁটিনাটি নিয়ে এখনও বিতর্ক চলছে।

নতুন অভিযানের শুরু

দীর্ঘ বিরতির পর মানুষ আবার চাঁদের পথে ফিরছে। নাসার আর্টেমিস কর্মসূচি সেই প্রত্যাবর্তনের প্রতীক। প্রথমদিকে মিশনগুলো মূলত মানুষের নিরাপদ যাতায়াত এবং মহাকাশযানের সক্ষমতা যাচাইয়ের জন্য, তবে আসল বৈজ্ঞানিক কাজ শুরু হবে যখন নভোচারীরা আবার চাঁদের মাটিতে নামবে।

এই নতুন অভিযানের পেছনে কেবল বিজ্ঞান নয়, ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতাও কাজ করছে। বিশেষ করে চীনও চাঁদে মানুষ পাঠানোর পরিকল্পনা করছে বলে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এটি মর্যাদার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন তার কার্যকাল শেষের দিকে পৌঁছানোয় নতুন বড় প্রকল্পের প্রয়োজনও তৈরি হয়েছে।

দক্ষিণ মেরু: সম্ভাবনার কেন্দ্র

এইবারের লক্ষ্য চাঁদের দক্ষিণ মেরু, যা আগে কখনো সরাসরি অনুসন্ধান করা হয়নি। এখানে এমন কিছু গহ্বর আছে যেখানে সূর্যের আলো কখনো পৌঁছায় না। এই চিরঅন্ধকার জায়গাগুলোতে তাপমাত্রা অত্যন্ত কম, ফলে সেখানে পানি বরফ আকারে জমে থাকতে পারে। শুধু পানি নয়, মিথেন, অ্যামোনিয়া বা কার্বন ডাই-অক্সাইডের মতো অন্যান্য ভোলাটাইল পদার্থও জমা থাকতে পারে।

এই বরফ শুধু বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকেই গুরুত্বপূর্ণ নয়, ভবিষ্যতে মানুষের বসবাসের জন্যও অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। পানি থেকে অক্সিজেন তৈরি করা যাবে, যা শ্বাস নেওয়া ও রকেট জ্বালানির জন্য কাজে লাগবে। ফলে পৃথিবী থেকে সবকিছু বহন করে নেওয়ার প্রয়োজন অনেক কমে যাবে।

অতীতের রেকর্ড: বিশাল গহ্বরের ভেতরে

দক্ষিণ মেরুর কাছেই রয়েছে সৌরজগতের অন্যতম বৃহৎ গহ্বর, সাউথ পোল আইটকেন বেসিন। এটি চাঁদের প্রাচীনতম গঠনগুলোর একটি। এই অঞ্চলের পাথর বিশ্লেষণ করলে জানা যেতে পারে, কখন এবং কীভাবে চাঁদ ও অন্যান্য গ্রহ বারবার মহাজাগতিক আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়েছে।

এটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ, এই তথ্য থেকে বোঝা যাবে সৌরজগতের শুরুর দিকে গ্রহগুলো কতটা সহিংস পরিবেশে তৈরি হয়েছিল। একই সঙ্গে, পৃথিবী কখন বসবাসযোগ্য হয়ে উঠেছিল সেই প্রশ্নের উত্তরও এর মাধ্যমে পরিষ্কার হতে পারে।

চাঁদে লুকানো পৃথিবীর গল্প

সবচেয়ে আকর্ষণীয় সম্ভাবনাগুলোর একটি হলো, চাঁদে হয়তো পৃথিবীর প্রাচীন ইতিহাসের চিহ্ন লুকিয়ে আছে। প্রাচীন পৃথিবীতে যখন বারবার উল্কাপিণ্ডের আঘাত লাগত, তখন সেই আঘাতে কিছু পাথর মহাকাশে ছিটকে বেরিয়ে যেত। এর কিছু অংশ গিয়ে পড়তে পারে চাঁদের ওপর।

পৃথিবীতে যেখানে বাতাস, পানি ও টেকটোনিক গতিবিধির কারণে প্রাচীন পাথর প্রায় মুছে গেছে, সেখানে চাঁদের নির্জীব পরিবেশে সেগুলো অক্ষত থাকতে পারে। ফলে চাঁদ থেকে পাওয়া সেই পাথর হয়তো পৃথিবীর এমন এক সময়ের গল্প বলবে, যার কোনো রেকর্ড আজ আর আমাদের গ্রহে নেই, যে সময়টাতে হয়তো জীবনের সূচনা হয়েছিল।

বিজ্ঞান, প্রতিযোগিতা ও ভবিষ্যৎ

চাঁদে ফেরার এই উদ্যোগের পেছনে একাধিক উদ্দেশ্য কাজ করছে, বিজ্ঞান, জাতীয় গর্ব, এবং ভবিষ্যতের সম্পদের দখল। তবে এর মাঝেও একটি বিষয় স্পষ্ট: মানুষ আবার অজানার দিকে এগোচ্ছে।

অ্যাপোলো যুগে যেমন বিজ্ঞান ছিল এক ধরনের ‘সাইড ইফেক্ট’, তেমনি এবারও হতে পারে। কিন্তু সেই সাইড ইফেক্টই হয়তো আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন হয়ে উঠবে, চাঁদের বরফের স্তরে, প্রাচীন গহ্বরের পাথরে, কিংবা অন্য কোনো অজানা আবিষ্কারে লুকিয়ে থাকা নতুন সত্যের মাধ্যমে। সূত্র: দ্য টেলিগ্রাফ