ইন্টারনেটের অন্ধকার জগতের কথা উঠলেই ‘আলেকজান্ডার ঝুকভ’-এর নাম এখন আতঙ্কের সমার্থক। বুলগেরিয়ার একটি সাধারণ অ্যাপার্টমেন্টে বসে তিনি এমন এক অদৃশ্য ডিজিটাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন, যা থেকে প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ মার্কিন ডলার (প্রায় ৬০ কোটি টাকা) অবৈধভাবে আয় হতো। গত কয়েক দশকের সবচেয়ে বড় ডিজিটাল বিজ্ঞাপন জালিয়াতির কারিগর হিসেবে ধরা হয় তাকে।
ঝুকভ ‘মিডিয়া মিথেন’ নামে একটি ডিজিটাল বিজ্ঞাপন সংস্থা গড়ে তোলেন। তার দাবি ছিল নেসলে, কমকাস্ট এবং নিউ ইয়র্ক টাইমসের মতো বিশ্ববিখ্যাত ব্র্যান্ডের বিজ্ঞাপনগুলো তিনি প্রকৃত দর্শকদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন। কিন্তু পর্দার আড়ালে বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
ঝুকভ ও তার ডেভেলপার টিম ইএসপিএন (ESPN), সিএনএন (CNN), ভোগ (Vogue) এবং ফক্স নিউজের মতো জনপ্রিয় ওয়েবসাইটগুলোর হুবহু নকল বা ‘ক্লোন’ ভার্সন তৈরি করেন। বিজ্ঞাপনদাতারা মনে করতেন তাদের বিজ্ঞাপন মূল সাইটে চলছে, কিন্তু আসলে সেগুলো দেখানো হতো ঝুকভের তৈরি হাজার হাজার ভুয়া সাইটে।
বিজ্ঞাপন জগতকে বোকা বানাতে ঝুকভ ব্যবহার করতেন কয়েক লক্ষ ভুয়া আইপি ঠিকানা এবং হাজার হাজার ভাড়া করা সার্ভার। এই ডিজিটাল ব্যবস্থায় কোনো প্রকৃত মানুষ ওয়েবসাইট ভিজিট করত না। বরং বিশেষ এক ধরণের সফটওয়্যার বা ‘বট’ (Bot) ব্যবহার করা হতো, যা মানুষের মতো আচরণ করতে পারত। এই রোবটগুলো নিজে নিজেই ওয়েবসাইট স্ক্রল করত, মাউস নড়াচড়া করত এবং বিজ্ঞাপনে ক্লিক করত। ফলে বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে মনে হতো তাদের বিজ্ঞাপনে ব্যাপক সাড়া মিলছে।
এক পর্যায়ে একজন ক্লায়েন্টের সঙ্গে ঝুকভের বিরোধ বাধে। প্রতিশোধ নিতে তিনি ওই ক্লায়েন্টের সাইটে অস্বাভাবিক পরিমাণ ভুয়া ট্রাফিক পাঠিয়ে দেন। এই অস্বাভাবিকতা সাইবার নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর নজরে আসে। শুরু হয় আন্তর্জাতিক তদন্ত, যার মাধ্যমে ঝুকভের পুরো নেটওয়ার্কের রহস্য উন্মোচিত হয়।
২০১৮ সালে ইন্টারপোলের সহায়তায় বুলগেরিয়া থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং পরে যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যর্পণ করা হয়। ২০২১ সালে জালিয়াতি ও মানি লন্ডারিংয়ের দায়ে আদালত তাকে ১০ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করেন।
আলেকজান্ডার ঝুকভের এই জালিয়াতি ডিজিটাল বিজ্ঞাপন ব্যবস্থার ভঙ্গুরতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভিউ, ক্লিক এবং ট্রাফিকের মতো তথ্যের সত্যতা যাচাই করার আধুনিক প্রযুক্তি না থাকলে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরণের সাইবার হামলার ঝুঁকি থেকেই যাবে।
সূত্র: মিডিয়াম।