কেনাকাটার নেশা মেটাতে টাকা ছাড়াই ভার্চ্যুয়াল শপিং

ক্ষুধা না থাকলেও খাবারের ওয়েবসাইটে ঢুকে পছন্দের খাবার কার্টে যোগ করা, বিল দেখা, অর্ডার নিশ্চিত করা সবই হচ্ছে। এমনকি অর্ডারের পর ডেলিভারি ট্র্যাকারও জানাচ্ছে, খাবার নিয়ে একজন কর্মী আপনার ঠিকানার দিকে রওনা হয়েছেন। কিছুক্ষণ পর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি ফোনকলও আসছে—ডেলিভারি কর্মী ভবনের সামনে পৌঁছেছেন, কিন্তু রাস্তা বা দরজা খুঁজে পাচ্ছেন না।

তবে বাস্তবে কোনো খাবারই আসবে না। কারণ পুরো প্রক্রিয়াটিই একটি ওয়েবসাইটে তৈরি করা কাল্পনিক অভিজ্ঞতা।

ভারতের রাজস্থানের উদয়পুরের দুই সফটওয়্যার ডেভেলপার পূর্বাংশ পারমার ও অংশুল শর্মা তৈরি করেছেন ‘ফুড নেভার কামস’ নামের এই ওয়েবসাইট। তাঁদের ভাষায়, এখানে খাবার অর্ডার করা যায়, কিন্তু বিল দিতে হয় না; কারণ খাবারও কখনো পৌঁছায় না। বরং অর্ডার করার পুরো প্রক্রিয়ার মধ্যেই ব্যবহারকারীরা একধরনের আনন্দ খুঁজে পান।

২৬ বছর বয়সী এই দুই উদ্যোক্তার দাবি, জুনে চালুর পর ওয়েবসাইটটিতে ২৭ লাখের বেশি মানুষ ভিজিট করেছেন। বর্তমানে সেখানে ২২টি রান্নাঘরের আদলে সাজানো বিভাগ, ৩২৭টি খাবার এবং ৩১৯টি বাস্তব রেসিপি রয়েছে। প্রতিটি খাবারের সঙ্গে রাখা হয়েছে কাল্পনিক দাম, কার্টে যোগ করার সুযোগ, চেকআউট ব্যবস্থা এবং ডেলিভারির অভিজ্ঞতা।

‘ফুড নেভার কামস’ ইন্টারনেটে গড়ে ওঠা নতুন একটি প্রবণতার অংশ, যাকে বলা হচ্ছে ‘ডোপামিন সাইট’। এসব ওয়েবসাইটে অর্থ খরচ না করেই কেনাকাটা বা অন্য কোনো সেবার অভিজ্ঞতা নেওয়া যায়। কোথাও ভুয়া কেনাকাটা, কোথাও কাল্পনিক ডেলিভারি, আবার কোথাও তৈরি করা হয়েছে ভার্চ্যুয়াল ভ্রমণের অভিজ্ঞতা। এ ধরনের ওয়েবসাইটের প্রবণতা দক্ষিণ কোরিয়ায় শুরু হয়ে পরে অন্য দেশেও ছড়িয়ে পড়ে। ‘ডোপামিন শপ’ ও ‘ফেকহল’-এর মতো প্ল্যাটফর্মও এই ধারার অংশ।

ডোপামিনকে সাধারণভাবে ‘আনন্দের রাসায়নিক’ বলা হলেও বিজ্ঞানীদের ব্যাখ্যা আরও বিস্তৃত। আনন্দের সঙ্গে এর সম্পর্ক থাকলেও কোনো পুরস্কার পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা, প্রত্যাশা এবং কোনো আচরণ বারবার করার প্রবণতার সঙ্গেও ডোপামিন জড়িত।

এই ধারণার পেছনে উদ্যোক্তাদের নিজেদের অভিজ্ঞতাও কাজ করেছে। কম্পিউটার সায়েন্সের ডিপ্লোমা কোর্সে তাঁদের পরিচয়। পরে তাঁরা ‘নিউরোএক্স এআই’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। অনলাইন কেনাকাটার অভ্যাস পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে তাঁরা দেখতে পান, পছন্দের অনেক পণ্য মানুষ কার্টে জমা করলেও শেষ পর্যন্ত সেগুলোর সব কেনে না।

অংশুল শর্মা নিজেও ইলেকট্রনিক পণ্যের ওয়েবসাইটে গিয়ে বিভিন্ন পণ্য কার্টে যোগ করতেন। পরে আর অর্ডার করতেন না। একই অভ্যাস ছিল পূর্বাংশ পারমারের মায়েরও। পারমারের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর মা কার্টে পণ্য জমিয়ে রেখে বলতেন, পরে অর্ডার করবেন।

পূর্বাংশের নিজের অভিজ্ঞতা আরও একধাপ এগোয় খাবারের ক্ষেত্রে। মুম্বাইয়ে একটি প্রকল্পে কাজ করার সময় তিনি সপ্তাহে ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার রুপি খাবারের পেছনে ব্যয় করতেন। অনেক সময় এমন খাবারও অর্ডার করতেন, যেগুলোর তেমন প্রয়োজন ছিল না। পরে তাঁর মনে হয়, আকর্ষণটা হয়তো সব সময় খাবারের প্রতি ছিল না; বরং খাবার বেছে নেওয়া, কার্টে যোগ করা এবং অর্ডার করার পুরো প্রক্রিয়াটিও আনন্দের উৎস হতে পারে।

তাঁদের ধারণা, ক্ষুধা থেকে শুরু হওয়া একটি অভ্যাস একপর্যায়ে খাবার অর্ডারের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যেতে পারে। তখন ক্ষুধা না থাকলেও একঘেয়েমি, উদ্বেগ কিংবা অভ্যাসের কারণে কেউ খাবারের তালিকা ঘাঁটতে এবং অর্ডার করতে চাইতে পারেন।

ইয়েল সেন্টার ফর কাস্টমার ইনসাইটসের পরিচালক রবি ধর এ ধরনের অনুভূতিকে ‘অ্যান্টিসিপেটারি ইউটিলিটি’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। অর্থাৎ কোনো কিছু পাওয়ার আগেই সেটি পাওয়ার প্রত্যাশা থেকে যে আনন্দ তৈরি হয়। নতুন জুতা কেনা, ভ্রমণে যাওয়া কিংবা রেস্তোরাঁয় খেতে যাওয়ার ক্ষেত্রেও এমন অনুভূতি কাজ করতে পারে। অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত বিষয়টি পাওয়ার অপেক্ষাই অভিজ্ঞতাটিকে বেশি রোমাঞ্চকর করে তোলে।

মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নায়ুবিজ্ঞানী কেন্ট বেরিজ ‘চাওয়া’ এবং ‘ভালো লাগা’কে দুটি আলাদা প্রক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, ডোপামিন মূলত কোনো কিছু পাওয়ার ‘চাওয়া’ বা তাগিদের সঙ্গে বেশি সম্পর্কিত। ফলে কোনো জিনিস পাওয়ার পর যতটা ভালো লাগতে পারে, তার চেয়েও বেশি তীব্রভাবে সেটি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা তৈরি হতে পারে।

স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগ চিকিৎসক আনা লেম্বকও ডোপামিনকে কেবল আনন্দের রাসায়নিক হিসেবে দেখার বিষয়ে সতর্ক করেছেন। তাঁর মতে, পুরস্কার পাওয়ার প্রত্যাশা এবং সেই প্রত্যাশার সঙ্গে তৈরি হওয়া অভ্যাস মানুষের আচরণকে প্রভাবিত করতে পারে।

তাহলে কাল্পনিক কেনাকাটা কি সত্যিই মানুষের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারে? কেন্ট বেরিজের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এ ধরনের অভিজ্ঞতা সাময়িকভাবে ‘চাওয়া’র অনুভূতি তৈরি করতে পারে। তবে নতুনত্বের আকর্ষণ সময়ের সঙ্গে কমে যেতে পারে।

রবি ধর মনে করেন, কৃত্রিম কেনাকাটা কারও জন্য সাময়িক চাপমুক্তির একটি উপায় হতে পারে। তবে এতে মানুষের প্রকৃত আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয় কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলার মতো গবেষণা এখনো পর্যাপ্ত নয়।

আনা লেম্বক এ ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকার কথা বলেছেন। যে আচরণ কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে, ভুয়া কেনাকাটা কখনো কখনো সেটিই পুনরাবৃত্তি করার অভ্যাস তৈরি করতে পারে। তবে এ বিষয়ে এখনো পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক গবেষণা হয়নি।

অংশুল শর্মার নিজের অভিজ্ঞতাতেও বিষয়টির একটি দিক ফুটে ওঠে। তাঁর ফোনের পর্দা নষ্ট হওয়ার পর এক সপ্তাহ ধরে তিনি অনলাইনে ছয়-সাতটি ফোনের তুলনা করেন। একের পর এক ফোন কার্টে যোগ করলেও শেষ পর্যন্ত নতুন ফোন কেনেননি; বরং পুরোনো ফোনটিই মেরামত করেন। তাঁর কাছে ফোন নিয়ে তথ্য খোঁজা এবং কার্টে যোগ করার প্রক্রিয়াটিই উপভোগ্য হয়ে উঠেছিল।

উদ্যোক্তারা খাবারের বাইরেও এই ধারণা নিয়ে কাজ শুরু করেছেন। তাঁদের আরেকটি ওয়েবসাইট ‘ট্রিপ নেভার লিভ্‌জ’। সেখানে ব্যবহারকারীরা গন্তব্য, ফ্লাইট, আসন, হোটেল ও বিভিন্ন কার্যক্রম বেছে নিয়ে নিজেদের মতো একটি ছুটির পরিকল্পনা করতে পারেন। এরপর তাঁদের একটি ভার্চ্যুয়াল ফ্লাইটের অভিজ্ঞতা দেওয়া হয় যে ফ্লাইট বাস্তবে কখনো রানওয়ে ছাড়ে না। উদ্যোক্তাদের দাবি, এই ওয়েবসাইটেও এক লাখের বেশি মানুষ ভিজিট করেছেন।

এসব ওয়েবসাইটের ব্যবহারকারীদের সম্পর্কে নির্দিষ্টভাবে জানা কঠিন। তবে আনা লেম্বকের মতে, ডিজিটাল মাধ্যমে আনন্দ বা তৃপ্তি পাওয়ার অভ্যাসে তরুণদের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি হতে পারে।

উদ্যোক্তারা বলছেন, এসব ওয়েবসাইট থেকে অর্থ উপার্জন তাঁদের প্রধান লক্ষ্য নয়। বিনা মূল্যে সেবাগুলো চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে সংগৃহীত তথ্য স্নায়ুবিজ্ঞানী ও মনোবিজ্ঞানীদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে তাঁদের।

খাবার অর্ডার করার অভ্যাস নিয়ে একধরনের মজা থেকেই শুরু হয়েছিল উদ্যোগটি। কিন্তু ধীরে ধীরে এটি আধুনিক ভোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে—কোনো কিছু পাওয়ার আগেই যদি তার প্রত্যাশার আনন্দ পাওয়া যায়, তাহলে শেষ পর্যন্ত সেই জিনিসটি আমাদের কতটা প্রয়োজন?

সূত্র: বিবিসি