প্রধানমন্ত্রীর শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত পিয়ন জাহাঙ্গীর আলম ওরফে পানি জাহাঙ্গীর। তার গ্রামের বাড়ি নোয়াখালীর চাটখিল উপজেলার খিলপাড়া ইউনিয়নে। তার বাবা মৃত রহমত উল্ল্যা কেরানি। জাহাঙ্গীর আলম ৫ ভাই ও এক বোনের মধ্যে দ্বিতীয়।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, জাহাঙ্গীর আলমের স্ত্রী কামরুন নাহারের নামে নোয়াখালী পৌরসভার হরিনারায়নপুর গ্রামে রয়েছে বিলাস বহুল ভবন ‘যারিয়াত ভিলা’। ৮তলা ভবনটি প্রায় ১০ শতাংশ জায়গার উপর অবস্থিত। ভবনটির দাম প্রায় ৬ কোটি টাকা। একসময় তার শ্বশুর এ ভবনের দেখাশোনা করতেন। বর্তমানে আমিনুল নামে একজন কেয়ার টেকার দেখাশোনা করেন।
হরিনারায়ন পুরের বাসিন্দা শাকিল জানান, গত ৬ বছর আগে জাহাঙ্গীর আলম ১০ শতাংশ জায়গা ক্রয় করে তার স্ত্রী কামরুন নাহারের নামে। পরে খালি জায়গা ভরাট করে ৮তলা ভবনটি তৈরি করেন। নাম রাখেন যারিয়াত ভিলা।
যারিয়াত ভিলার কেয়ার টেকার আমিনুল ইসলাম বলেন, আমি এ ভবনে কেয়ার টেকার হিসেবে আছি। প্রতিমাসের ভাড়া ভাড়াটিয়াদের কাছ থেকে তুলে জাহাঙ্গীর ভাইয়ের বাগিনা শিপনের কাছে পাঠাই। জাহাঙ্গীর ভাই মাঝে মধ্যে এসে এ ভবনের একটি রুমে থাকেন। সেখানে দুই-একদিন থেকে আবার চলে যান।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চাটখিলের সেই জাহাঙ্গীর প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত কর্মচারী হিসেবে কাজ করলেও ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে পরিচয় দিতেন। প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সহকারী পরিচয় দিয়ে নানা তদবির করে কোটি কোটি টাকা কামিয়েছেন। তিনি নোয়াখালী ও ঢাকায় বিপুলসম্পদ গড়ে তুলেছেন। সঙ্গে নিয়ে ঘুরতেন লাইসেন্সকৃত পিস্তল।
প্রধানমন্ত্রী ব্যক্তিগত সহকারী পরিচয় দিয়ে জাহাঙ্গীর আলম বিভিন্ন অনৈতিক কাজ করছেন এমন অভিযোগের আলোকে গত বছরের ৬ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। ওই প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কোনো সম্পর্ক নেই।
জানা যায়, কোটি কোটি টাকার সম্পদ কামানোর পর রীতিমতো রাজনৈতিক মাঠে নেমে পড়েন পিয়ন জাহাঙ্গীর। চাটখিল উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতির পদও বাগিয়ে নেন। একই সঙ্গে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নৌকা প্রতীক পাওয়ার জন্য নমিনেশন তুলেছিলেন। পরে নৌকা প্রতীক না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। তবে পরবর্তীতে তিনি নির্বাচন থেকে সড়ে দাঁড়ান। এ ছাড়াও তার ছোট ভাই আলমগীর হোসেনকে খিলপাড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নির্বাচিত করান। বোনের ছেলে শিপনকে বানিয়েছেন জেলা পরিষদের সদস্য।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানী ঢাকায় একাধিক প্লট-ফ্ল্যাটের মালিক হয়েছেন জাহাঙ্গীর। ধানমন্ডিতে স্ত্রীর নামে আড়াই হাজার বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট কিনেছেন। এ ছাড়াও নোয়াখালীর মাইজদী শহরের হরিনারায়ণপুরে তার আট তলা একটি বাড়ি রয়েছে। সেটিও তার স্ত্রীর নামে।
ধানমন্ডিতে আলিশান ফ্ল্যাট ছাড়াও রাজধানীর মোহাম্মদপুর ও নিউমার্কেটে দুটি দোকান রয়েছে তার। ঢাকার মিরপুরে একটি সাত তলা ভবন ও দুটি ফ্ল্যাট রয়েছে। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের হলফনামায় জাহাঙ্গীর কৃষিখাত থেকে তার প্রতি বছর আয় ৪ লাখ টাকা, বাড়ি ও দোকান ভাড়া থেকে সাড়ে ১১ লাখ, শেয়ার, সঞ্চয়পত্র ও ব্যাংক আমানত থেকে ৯ লাখ, চাকরি থেকে ৬ লাখ ও অন্যান্য উৎস থেকে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা আয়ের তথ্য জানান। হলফনামার হিসাব অনুযায়ী বছরে প্রায় ৫০ লাখ টাকার আয়ের কথা জানিয়েছেন।
স্থানীয় সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পিয়ন হিসেবে কাজ করার সময় ব্যক্তিগত পরিচয় দিয়ে তদবির, টেন্ডারবাজি, নিয়োগ বাণিজ্যসহ নানা অপকর্ম করে বেড়িয়েছেন জাহাঙ্গীর। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচয় ব্যবহার করে গাজীপুরের ইপিজেড এলাকার ঝুট ব্যবসাও নিয়ন্ত্রণ করতেন তিনি।
হলফনামার তথ্য অনুযায়ী, জাহাঙ্গীরের নিজের নামে আড়াই কোটি টাকা ও স্ত্রীর নামে ব্যাংকে প্রায় সোয়া এক কোটি টাকা, ডিপিএস পৌনে তিন লাখ টাকা, এফিডিআর সোয়া এক কোটি টাকা। স্ত্রীর নামে কিনেছেন গাড়ি। বিভিন্ন কোম্পানিতে কোটি টাকার শেয়ারও রয়েছে। এ ছাড়া একটি অংশীদারি প্রতিষ্ঠানে তার ছয় কোটি টাকার বিনিয়োগও রয়েছে।
এদিকে জাহাঙ্গীর আলম, তার স্ত্রী কামরুন নাহার ও তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সব ব্যাংক হিসাব জব্দ করার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। রোববার (১৪ জুলাই) বিএফআইইউ থেকে দেশের সব ব্যাংকে এ-সংক্রান্ত নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে। বিএফআইইউর নির্দেশনায় জাহাঙ্গীরসহ তাদের হিসাব খোলার ফরমসহ যাবতীয় তথ্য আগামী পাঁচ দিনের মধ্যে পাঠাতে বলা হয়েছে।
নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়েছে, ব্যাংক/আর্থিক প্রতিষ্ঠানে উল্লিখিত ব্যক্তিবর্গ ও তাদের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের নামে কোনও হিসাব থাকলে সেসব হিসাবের লেনদেন মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২–এর ২৩ (১) (গ) ধারার আওতায় ৩০ দিনের জন্য স্থগিত রাখার নির্দেশনা দেওয়া হলো।
সম্প্রতি চীন সফর নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রোববার (১৪ জুলাই) সংবাদ সম্মেলন করেন। সেখানে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রসঙ্গে তিনি নিজের বাসার সাবেক এক কর্মীর অর্থসম্পদের বিষয়টি সামনে আনেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমার বাসায় কাজ করেছে, পিয়ন ছিল সে, এখন ৪০০ কোটি টাকার মালিক। হেলিকপ্টার ছাড়া চলে না। বাস্তব কথা। কী করে বানাল এত টাকা? জানতে পেরেছি, পরেই ব্যবস্থা নিয়েছি। তবে প্রধানমন্ত্রী কারও নাম উল্লেখ করেননি। তবে দ্রুতই জানা যায় তিনি তার ব্যক্তিগত সহকারী জাহাঙ্গীর।
এ বিষয়ে জানতে একাধিকবার জাহাঙ্গীর আলমের ব্যক্তিগত মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তা বন্ধ পাওয়া যায়।