ডারউইন থেকে নতুন বাংলাদেশের গল্প, পথ দেখাচ্ছেন অধিনায়ক শান্ত

অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ২৩ বছর পর টেস্ট খেলতে নেমেছিল বাংলাদেশ। প্রতিপক্ষ টেস্ট র‍্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ সারির দল, যাদের ঘরের মাঠে হারানো তো দূরের কথা, তাদের বিপক্ষে লড়াই করাটাও বাংলাদেশের জন্য একসময় বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। কিন্তু ডারউইনের মারারা স্টেডিয়ামে সেই হিসাব বদলে দিল নাজমুল হোসেন শান্তর দল। সাড়ে তিন দিনের মধ্যেই অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারিয়ে ইতিহাস গড়ল বাংলাদেশ।

 

এটি শুধু অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট জয় নয়, শান্তর নেতৃত্বে বদলে যাওয়া বাংলাদেশের আরেকটি বড় প্রমাণ। পাকিস্তানের মাটিতে ঐতিহাসিক সিরিজ জয়, ঘরের মাঠে পাকিস্তানকে ২-০ ব্যবধানে হারানো এবং এবার অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে জয়—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটে নেতৃত্বের একটি নতুন অধ্যায় লিখছেন শান্ত।

 

অধিনায়ক হিসেবে ইতোমধ্যে বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি টেস্ট জয়ের রেকর্ড নিজের করে নিয়েছেন শান্ত। ২০২৬ সালের মে মাসে পাকিস্তানের বিপক্ষে সিলেট টেস্ট জিতে অধিনায়ক হিসেবে তার জয় দাঁড়ায় আটটিতে। ১৮ টেস্টে আট জয় নিয়ে তিনি ছাড়িয়ে যান মুশফিকুর রহিমকে, যার অধীনে বাংলাদেশ সাতটি টেস্ট জিতেছিল। এরপর ডারউইনে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে জয় শান্তর নেতৃত্বের ঝুলিতে যোগ করেছে আরও একটি ঐতিহাসিক সাফল্য।

 

শান্তর নেতৃত্বে বাংলাদেশের এই উত্থানের শুরুটা অবশ্য একদিনে হয়নি। ২০২৪ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে রাওয়ালপিন্ডিতে ১০ উইকেটের জয় দিয়ে যে পরিবর্তনের বড় বার্তা দিয়েছিল বাংলাদেশ, পরের টেস্টেই একই মাঠে ৬ উইকেটে জিতে সিরিজ নিশ্চিত করে তারা। পাকিস্তানের মাটিতে এর আগে কোনো ফরম্যাটে জয় না পাওয়া বাংলাদেশ সেবারই প্রথমবার তাদের ঘরের মাঠে সিরিজ জয়ের স্বাদ পায়।

 

এরপর ২০২৬ সালে ঘরের মাঠে পাকিস্তানকে ২-০ ব্যবধানে হারিয়ে আরো একটি ইতিহাস গড়ে বাংলাদেশ। দুই টেস্ট মিলিয়ে পাকিস্তানের বিপক্ষে টানা চার টেস্ট জয়ের কীর্তিও আসে শান্তর নেতৃত্বে। একসময় যে পাকিস্তানের বিপক্ষে ১৩ টেস্টে বাংলাদেশের জয় ছিল না, সেই দলের বিপক্ষেই পরপর চার টেস্টে জয়—বাংলাদেশের বদলে যাওয়ার বড় প্রমাণ এটি।

 

সেই ধারার পর এবার অস্ট্রেলিয়া। প্রস্তুতি ম্যাচে মাত্র ৫৪ রানে অলআউট হয়ে অস্ট্রেলিয়া সফরের শুরুতেই বড় ধাক্কা খেয়েছিল বাংলাদেশ। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে আগের টেস্টেও ইনিংস ব্যবধানে হারের স্মৃতি ছিল। ফলে ডারউইনে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে নামার আগে আত্মবিশ্বাসের চেয়ে প্রশ্নই ছিল বেশি।

 

কিন্তু মাঠে নামার পর সেই বাংলাদেশকে আর চেনা গেল না। টস জিতে অস্ট্রেলিয়া ব্যাটিং নেওয়ার পর হাসান মাহমুদ, তাসকিন আহমেদ ও এবাদত হোসেনের পেস আক্রমণে শুরু থেকেই চাপে পড়ে স্বাগতিকরা। প্রথম ইনিংসে মাত্র ১৯৮ রানে অলআউট হয় অস্ট্রেলিয়া।

 

এরপর বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ে আসে আরও বড় চমক। তানজিদ হাসান তামিম করেন ক্যারিয়ারের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি। নাজমুল হোসেন শান্তর ৮৪ ও মেহেদী হাসান মিরাজের ৬৫ রানের ইনিংসে ভর করে বাংলাদেশ তুলে নেয় ৪২৬ রান। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ২২৮ রানের লিড পায় সফরকারীরা।

 

বাংলাদেশের এই ইনিংসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল লোয়ার অর্ডারের লড়াই। মিরাজের সঙ্গে লোয়ার অর্ডারের ব্যাটাররা মূল্যবান রান যোগ করে চাপ আরও বাড়িয়ে দেন। তাদের ছোট ছোট রান আর দারুণ সঙ্গ দলকে পার করায় চার শ রানের গণ্ডি।

 

যেখানে মনে হচ্ছিল অজি পেসারদের সামনে অসহায় আত্মসমর্পণ করবে বাংলাদেশ, সেখানে প্রথম ইনিংসে স্বাগতিকদের চেয়ে ২২৮ রান বেশি করে বসে! এবারই প্রথম বিদেশের মাটিতে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করে দুই শর বেশি রানের লিড পেল বাংলাদেশ।

 

দ্বিতীয় ইনিংসে ক্যামেরন গ্রিনের সেঞ্চুরি অস্ট্রেলিয়াকে লড়াইয়ে ফেরানোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু হাসান মাহমুদ ও মিরাজদের সামনে শেষ পর্যন্ত ২৮৪ রানে থেমে যায় অস্ট্রেলিয়ার ইনিংস। বাংলাদেশের সামনে জয়ের জন্য লক্ষ্য দাঁড়ায় মাত্র ৫৭ রান।

 

তানজিদ তামিম দ্রুত ফিরে গেলেও মুমিনুল হক ও সাদমান ইসলাম মিলে অনায়াসেই সেই রান তুলে নেন। নিশ্চিত হয় অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট জয়—৯ উইকেটে। লেখা হয় নতুন ইতিহাস। পেরিয়ে যায় আগের সব অর্জনকে।

 

এই জয়ের আরেকটি বড় দিক বাংলাদেশের পেস আক্রমণ। কয়েক বছর আগেও টেস্টে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ভরসা ছিল স্পিন। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই চিত্র বদলেছে। পেসারদের নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, বিদেশি কন্ডিশনে খেলার অভিজ্ঞতা এবং টেস্ট ক্রিকেটকে গুরুত্ব দেওয়ার ফল এখন দেখা যাচ্ছে।

 

ডারউইনে হাসান মাহমুদের নয় উইকেট সেই পরিবর্তনের সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ। এর আগে ইংল্যান্ডের কাউন্টি ক্রিকেটে কেন্টের হয়ে খেলার অভিজ্ঞতাও কাজে লাগিয়েছেন তিনি। অস্ট্রেলিয়ার গতিময় ও বাউন্সি কন্ডিশনে নতুন বলে তার সুইং বাংলাদেশের জন্য ম্যাচের শুরুতেই বড় সুবিধা এনে দেয়।

 

অস্ট্রেলিয়ার পেসার জশ হ্যাজেলউড ম্যাচ চলাকালে স্বীকার করেছিলেন, বাংলাদেশের বেশ কয়েকজন ক্রিকেটারের ভিডিও তাদের কাছে ছিল না। কথাটি অস্ট্রেলিয়ার প্রস্তৃতির ঘাটতির দিকটি যেমন সামনে এনেছে, তেমনি বাংলাদেশের নতুন মুখগুলোর উত্থানও স্পষ্ট করেছে।

 

তানজিদ তামিমের সেঞ্চুরি, হাসান মাহমুদের নয় উইকেট এবং মেহেদী মিরাজের অলরাউন্ড পারফরম্যান্স দেখিয়েছে, বাংলাদেশ এখন শুধু মুশফিক-তাসকিনদের ওপর নির্ভরশীল নয়। আর এখানেই অধিনায়ক শান্তর নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় সাফল্য।

 

তিনি এমন একটি দল তৈরি করছেন, যেখানে সিনিয়রদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে তরুণদের সামর্থ্যও সমান গুরুত্ব পাচ্ছে। মুশফিকুর রহিম ও মুমিনুল হকের মতো অভিজ্ঞ ক্রিকেটাররা যেমন দলের ভিত শক্ত করছেন, তেমনি তানজিদ তামিম, হাসান মাহমুদ, নাহিদ রানা, শরীফুল ইসলামদের মতো ক্রিকেটাররা নিজেদের জায়গা তৈরি করছেন।

 

শান্ত নিজেও শুধু অধিনায়ক হিসেবে নয়, ব্যাটার হিসেবেও দলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজে সেঞ্চুরি থেকে শুরু করে ডারউইনে ৮৪ রানের ইনিংস—চাপের ম্যাচে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়ার চেষ্টা করেছেন তিনি। তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ এখন ফলের পাশাপাশি প্রক্রিয়া নিয়েও বেশি সচেতন।

 

ম্যাচ শেষে শান্তর কথাতেও বারবার এসেছে সেশন ধরে খেলা, পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং দলীয় অবদানের বিষয়টি। এতদিন বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের সাফল্যকে অনেক সময় নির্দিষ্ট কন্ডিশন বা প্রতিপক্ষের দুর্বলতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হতো। কিন্তু এবার সেই প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই মোটেও।

 

পেস-সহায়ক অস্ট্রেলিয়ান কন্ডিশনেই বাংলাদেশের পেসাররা ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন, ব্যাটাররা চার শতাধিক রান করেছেন এবং অধিনায়ক পুরো ম্যাচে দলকে পরিকল্পনা অনুযায়ী এগিয়ে নিয়েছেন। সেই সঙ্গে বলা যায় ডারউইনের জয় তাই হঠাৎ পাওয়া কোনো অঘটন নয়।

 

গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটে যে পরিবর্তন শুরু হয়েছে, এই জয় তারই সবচেয়ে বড় বহিঃপ্রকাশ। ২০২২ সালে নিউজিল্যান্ডের মাউন্ট মঙ্গানুইয়ে ঐতিহাসিক টেস্ট জয়, ২০২৪ সালে পাকিস্তানের মাটিতে সিরিজ জয়—সেসব সাফল্যের ধারাবাহিকতায় অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এবার আরও বড় একটি দেয়াল ভাঙল বাংলাদেশ।

 

২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ফিরে বাংলাদেশ পেল প্রথম টেস্ট জয়। আর সেই জয়ের মধ্য দিয়ে শান্তর নেতৃত্বের আরেকটি পরিসংখ্যানও আরও সমৃদ্ধ হলো। অধিনায়ক হিসেবে বাংলাদেশের হয়ে সবচেয়ে বেশি টেস্ট জয়ের রেকর্ড এখন তার দখলে।

 

পাকিস্তান থেকে অস্ট্রেলিয়া—পরপর কঠিন বিদেশি চ্যালেঞ্জে জয় এনে দিয়ে তিনি প্রমাণ করছেন, তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ শুধু ম্যাচ জেতার চেষ্টা করছে না, বড় দলের বিপক্ষে জেতার অভ্যাসও তৈরি করছে। তবে ডারউইনের জয়েই গল্প শেষ নয়। সামনে আরও ম্যাচ—সেখানেই অপেক্ষা করছে সিরিজের পরের পরীক্ষা।

 

ডারউইনে যে বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারিয়েছে, ম্যাকেতে সেই আত্মবিশ্বাস ধরে রাখতে পারলে এই সফর শুধু একটি ঐতিহাসিক জয়ের স্মৃতি হয়ে থাকবে না; হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের নতুন যুগের সূচনা।