বাংলাদেশের দলটি চেনা দল নয়? এই প্রজন্মের ছেলেরা লড়াই করতে জানে, ভয় পায় না, মাথা নিচু করে মাঠ থেকে বেরিয়ে আসার দল তারা নয়। তৃতীয় কোয়ার্টারে এসে তারই প্রমাণ মিলল। মাঠে ফিরেই ছন্দ খুঁজে পায় লাল-সবুজ জার্সিধারীরা। গতি বাড়তে থাকে, আক্রমণ বেশি জমাট বাঁধতে থাকে। আর তাতেই আসে প্রতিক্ষীত গোল।
এ এক ঐতিহাসিক ম্যাচ। অস্ট্রেলিয়ার কাছে ৫-৩ ব্যবধানে লড়াই করে প্রশংসা কুড়ানো বাংলাদেশের ছেলেরা আরো বড় কিছু করে দেখালো দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে। শুধু এক পয়েন্ট বাঁচাল না, একটা বার্তা দিল বিশ্বকে: বাংলাদেশ এখন প্রতিযোগিতার দল, লড়াইয়ের দল।
ফ্রান্সের বিপক্ষে মাঠে নামবে বাংলাদেশ। আজকের ম্যাচের পর আত্মবিশ্বাস আকাশচুম্বী। গ্যালারি, বিশেষজ্ঞ, প্রতিপক্ষ সবাই এখন দেখছে, ‘চমক’ শব্দটিকে নতুন অর্থ দিতে পারে এই বাংলাদেশ দল। আর আমিরুল? তিনিই এখন দলের সেই আলো, যে আলো শুধু গোল করে বাংলাদেশ আলোতে ভাসায়। রূপকথা শুরু হয়েছে, শেষ কোথায়—তা দেখার অপেক্ষায় এখন পুরো বিশ্ব হকি।
দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচটি যেন দুই অর্ধে দুই দলের দুই রূপ। প্রথমার্ধ ছিল পুরোপুরি দক্ষিণ কোরিয়ার দখলে, আর দ্বিতীয়ার্ধ? সেটি এককভাবে বাংলাদেশের। মাঠে লড়াই হয়েছে, পরিশ্রম হয়েছে, গ্যালারিতে উত্তেজনা ঝড় তুলেছে, শেষের পাঁচ মিনিটে যা ঘটলো, তা নিছক কোনো ম্যাচ নয়, রূপকথার মতো এক ঐতিহাসিক কাব্যরচনা।
ম্যাচের প্রথম কোয়ার্টারেই কোরিয়া ২-০ গোলের লিড নেয়। আক্রমণে গতি, সপ্রতিভ পাসিং, বৃত্তে ঢোকার ধার, সব মিলিয়ে বাংলাদেশের ডিফেন্স ছিল বেশ চাপে। দ্বিতীয় কোয়ার্টারে সেই চাপ আরও বাড়িয়ে তিন নম্বর গোলটি করে কোরিয়ানরা। দুই কোয়ার্টার শেষে স্কোরবোর্ডে কোরিয়া ৩, বাংলাদেশ ০, চিত্রটি ছিল মোটেও আশাব্যঞ্জক ছিল না। তৃতীয় কোয়ার্টারে ফিনিশিংয়ে ব্যবধান কমান আমিরুল ইসলাম। স্কোর ৩-১। বাংলাদেশের আত্মবিশ্বাস ততক্ষণে ফিরে এসেছে।
তবে নাটকের প্রকৃত শুরু চতুর্থ কোয়ার্টারে। ম্যাচের শেষভাগে এসে যেন নতুন দল হয়ে মাঠে নামে বাংলাদেশ। শেষ পাঁচ মিনিট পুরোপুরি বাংলাদেশের কব্জায়। কোরিয়ার ডিফেন্ডাররা রীতিমতো ব্যতিব্যস্ত। আলোকিত এক নায়ক আমিরুল ইসলাম। আবারও হ্যাটট্রিক, আবারও ম্যাচসেরা। টানা দুই ম্যাচে ‘ম্যাচসেরা’ এই বিশ্বকাপে যা এখন পর্যন্ত দ্বিতীয় রেকর্ড। প্রথম রেকর্ডটি নিউজিল্যান্ডের। তিন গোল পিছিয়ে থেকেও দলকে সমতায় ফিরিয়ে আনার পেছনে আমিরুলের অবদান কিংবদন্তির মতোই। তবে তাকে যে পিসিগুলো এনে দিতে সাহায্য করেছেন, সেই সতীর্থদের অবদানও কম নয়।
শেষ বাঁশি বাজতেই গ্যালারি ফেটে পড়ে উচ্ছ্বাসে। দর্শকেরা দাঁড়িয়ে ‘আমিরুল আমিরুল, বাংলাদেশ বাংলাদেশ’ স্লোগানে মুখরিত করে তোলেন। পরবর্তী ম্যাচে মাঠে নামার অপেক্ষায় গ্যালারিতে বসে থাকা একই গ্রুপের অস্ট্রেলিয়া ও ফ্রান্স দলের খেলোয়াড়রাও বিস্মিত চোখে দেখেন লাল-সবুজদের এই লড়াই। ম্যাচ শেষে ফ্রান্স দলের অধিনায়ক গাসপার্ডকে ‘হাউ বাংলাদেশ’ জিজ্ঞেস করলে কোনো মন্তব্য করেননি, তবে টিম ম্যানেজার পিলনস ফ্রেডরিখ প্রশংসা লুকাতে পারেননি, বলেছেন ‘ব্রাভো বাংলাদেশ!’
ম্যাচ শেষে আমিরুল জানালেন পেনাল্টি কর্নারের রহস্য। ‘প্রতিদিন দুইবেলা প্রায় ১৫০ বল প্রাকটিস করি। তারিকুজ্জামান নান্নু ভাই সেই ছোট থাকতে আমার উপর বিশ্বাস রেখেছেন। আমাকে দিয়ে পেনাল্টি কর্নার করিয়ে ভরসা যুগিয়েছেন।’
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের তিন গোল, কোরিয়ার বিপক্ষে তিন গোল। মোট ছয় গোল। অথচ কোন ফিল্ড গোল নেই। কারণ জানান আমিরুল, ‘ফিল্ড গোলটা মুলত কঠিন। তাই আমাদের পরিকল্পনা ছিল পিসি আদায় করা। আমরা সেটিতে সাকসেস। যখন একটা দিতে সাকসেস আসতে থাকে, তখন অন্য দিকে চিন্তা করলে সুফল আসে না।’
৩৬, ৪৬ ও ৫৬ মিনিটে পিসি থেকে গোল করেন আমিরুল ইসলাম। ৮ ও ১৭ মিনিটে কোরিয়ার লিন মিনহিউক পিসি ও স্ট্রোক থেকে দুটি এবং ১৩ মিনিট সং সিউংঘান পিসি থেকে একটি গোল করেন।