স্কুলশিক্ষকের ছেলে এখন কাশ্মীরের প্রথম টেস্ট ক্রিকেটার

ছোটবেলায় এক কাজিনের প্রশ্ন ছিল, এত ক্রিকেট তারকার সঙ্গে খেলেও কেন তাদের সঙ্গে ছবি তোলা হয় না? উত্তরে আকিব নবী বলেছিলেন, একদিন এমন জায়গায় পৌঁছাবেন, যেখানে তার সঙ্গেই ছবি তুলতে চাইবে সবাই। প্রায় এক যুগ পর সেই কথাই যেন সত্যি হলো। জম্মু-কাশ্মীরের ছোট্ট গ্রাম থেকে উঠে এসে ভারতের টেস্ট দলে ডাক পেয়েছেন ২৯ বছর বয়সী এই অলরাউন্ডার।

আগামী ১৫ আগস্ট থেকে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে শুরু হতে যাওয়া দুই টেস্টের সিরিজের দলে জাসপ্রিত বুমরাহর জায়গায় নেওয়া হয়েছে আকিবকে। এর মধ্য দিয়ে ভারতের টেস্ট দলে ডাক পাওয়া জম্মু-কাশ্মীরের প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে ইতিহাস গড়েছেন তিনি।

বারামুল্লা জেলার একটি ছোট গ্রামে বেড়ে ওঠা আকিবের ক্রিকেটযাত্রা ছিল মোটেও সহজ নয়। সংঘাত, দীর্ঘ শীত, তুষারপাত এবং সীমিত অবকাঠামোর কারণে কাশ্মীরে ক্রিকেটারদের জন্য সুযোগ বরাবরই কম। তার বাবা গুলাম নবী দার ছিলেন স্কুলশিক্ষক। শুরুতে ছেলের ক্রিকেট খেলার স্বপ্নকে সমর্থন করেননি তিনি। পড়াশোনা করে চিকিৎসক হওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন ছেলেকে।

গুলাম নবী বলেন, তাদের সময়ে ক্রিকেটে ভবিষ্যৎ দেখার মতো কোনো সুযোগ ছিল না। খেলাধুলাকে সময়ের অপচয় মনে করে তিনি আকিবকে পড়াশোনায় মনোযোগী হতে বলতেন। তবে ক্রিকেটের প্রতি ছেলের গভীর আগ্রহ ও নিষ্ঠা দেখে শেষ পর্যন্ত নিজের সিদ্ধান্ত বদলান তিনি।

ক্রিকেটের উন্নত অনুশীলনের সুযোগ পেতে আকিবকে নিয়মিত প্রায় ৭০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে শ্রীনগরে যেতে হতো। এমনকি প্রথমবার ক্রিকেটের ট্রায়ালে অংশ নেওয়ার সময় তার নিজের স্পাইক জুতাও ছিল না। কিন্তু এসব কোনো কিছুই তাকে থামাতে পারেনি।

তার কাজিন বিলাল আহমেদের ভাষ্য, আকিব অত্যন্ত পরিশ্রমী ও ধারাবাহিক ছিলেন। প্রায় ১০ বছর ধরে নিয়মিত ভোরে জিমে যাওয়া এবং এরপর দিনের বড় অংশ ক্রিকেট অনুশীলনে কাটানো ছিল তার রুটিন।

২০২০ সালে জম্মু-কাশ্মীরের হয়ে রঞ্জি ট্রফিতে অভিষেক হয় আকিবের। অভিষেকেই ঝাড়খণ্ডের বিপক্ষে পাঁচ উইকেট নিয়ে নিজের সামর্থ্যের জানান দেন তিনি। এরপর ধীরে ধীরে ঘরোয়া ক্রিকেটে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।

২০২৪-২৫ মৌসুমের রঞ্জি ট্রফিতে ৪৪ উইকেট নিয়ে আসরের সেরা পেসার হন আকিব। কিন্তু অসাধারণ পারফরম্যান্সের পরও জাতীয় পর্যায়ে তার পরিচিতি তখনও সীমিত ছিল। তার বাবা বলেন, ভালো খেলেও স্বীকৃতি না পাওয়া কষ্টের হলেও তারা কখনো আশা হারাননি।

পরের মৌসুমেই বদলে যায় সবকিছু। মাত্র ১০ ম্যাচে ৬০ উইকেট নিয়ে রঞ্জি ট্রফির সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি হন আকিব। তার দুর্দান্ত বোলিংয়ে জম্মু-কাশ্মীর প্রথমবারের মতো রঞ্জি ট্রফির শিরোপা জেতে। দীর্ঘ ৬৭ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটে তাদের।

এই পারফরম্যান্সের পুরস্কার হিসেবে আইপিএলে দিল্লি ক্যাপিটালসের সঙ্গে ৮৪ কোটি রুপির চুক্তি পান আকিব। আইপিএলে খুব বেশি সুযোগ না পেলেও লাল বলের ক্রিকেটে তার ধারাবাহিক পারফরম্যান্স ভারতের নির্বাচকদের নজরে পড়ে।

জম্মু-কাশ্মীরের প্রথম আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার ও আকিবের দীর্ঘদিনের অধিনায়ক পারভেজ রসুল মনে করেন, তার সবচেয়ে বড় শক্তি পরিশ্রম ও শৃঙ্খলা। রসুলের মতে, ভারতের টেস্ট দলে জায়গা পাওয়া যেকোনো ক্রিকেটারের জন্যই বিশাল অর্জন, তবে জম্মু-কাশ্মীরের মতো অঞ্চল থেকে উঠে এসে এই পর্যায়ে পৌঁছানো আরও কঠিন।

১৯৫৭ সালে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের সঙ্গে যুক্ত হলেও জম্মু-কাশ্মীরে এখনো বড় ক্রিকেট স্টেডিয়ামের সংখ্যা মাত্র দুটি এবং অবকাঠামোগত সুযোগ সীমিত। দীর্ঘ শীত, তুষারপাত ও কয়েক দশকের সংঘাতও সেখানে ক্রিকেটের বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করেছে।

রসুল বলেন, একসময় জম্মু-কাশ্মীর থেকে কেউ ভারতের টেস্ট দলে খেলতে পারবেন কি না, তা নিয়েই প্রশ্ন ছিল। আকিব সেই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। তার সাফল্য শুধু নিজের পরিবার কিংবা অঞ্চলের জন্য নয়, পুরো কাশ্মীরের ক্রিকেটের জন্যই একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত।

তার মতে, আকিবের সাফল্য কাশ্মীরের নতুন প্রজন্মের ক্রিকেটারদেরও বড় স্বপ্ন দেখাবে। কারণ, একসময় এই অঞ্চলের তরুণদের সামনে জাতীয় পর্যায়ের ক্রিকেটার হওয়ার মতো স্থানীয় আদর্শ খুব বেশি ছিল না। আকিবের পথচলা সেই বাস্তবতাই বদলে দিতে পারে।

আর বারামুল্লায় আকিবের বাবা এখন যেখানে যান, সেখানেই মানুষ তাকে চিনে ফেলেন। কেউ এসে জড়িয়ে ধরে বলেন, আপনি আকিবের বাবা।

ছেলের সাফল্যে গর্বিত গুলাম নবীর সংক্ষিপ্ত উত্তর, এটাই তার জন্য সবচেয়ে বড় আনন্দ। সূত্র: বিবিসি