আর্জেন্টিনার ক্রীড়াঙ্গনে ৬ অক্টোবর ২০২৬ যেন একই সঙ্গে আবেগ, স্মৃতি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার এক অনন্য সন্ধিক্ষণ। একদিকে বুয়েনস এইরেসের ঐতিহাসিক মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামে জাতীয় দলের জার্সিতে শেষবারের মতো মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন ফুটবল কিংবদন্তি লিওনেল মেসি। অন্যদিকে দক্ষিণ আমেরিকার চার দেশ—আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে, চিলি ও ব্রাজিল—২০৩৫ সালের পুরুষ রাগবি বিশ্বকাপ আয়োজনের জন্য যৌথ প্রস্তাব জমা দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে নতুন স্বপ্নের বার্তা দিয়েছে।
অর্থাৎ, আর্জেন্টিনার ক্রীড়াঙ্গনে একই দিনে যেন দুটি ভিন্ন গল্প পাশাপাশি এগিয়ে চলছে—একটি বিদায়ের, অন্যটি ভবিষ্যৎ নির্মাণের।
মেসির বিদায়কে ঘিরে আর্জেন্টিনায় যে আবেগ তৈরি হয়েছে, তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে অনলাইন অনুসন্ধানেও। গুগল ট্রেন্ডসে ‘আর্জেন্টিনা বনাম বেনিন’ এবং মেসির বিদায়সংক্রান্ত অনুসন্ধান ব্যাপকভাবে বেড়েছে। এর মধ্য দিয়ে বোঝা যায়, এটি নিছক একটি প্রীতি ম্যাচ নয়; বরং একটি প্রজন্মের কাছে এটি আবেগ ও স্মৃতির বিশেষ মুহূর্ত।
দুই দশকের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়
আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার প্রায় দুই দশকের। দীর্ঘ এই সময়ে তিনি শুধু দলের অধিনায়ক বা সর্বোচ্চ তারকাই হয়ে ওঠেননি; তিনি পরিণত হয়েছেন আর্জেন্টিনার ফুটবল-পরিচয়ের অন্যতম প্রতীকে।
ফিফার তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় দলের হয়ে মেসির আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান তাকে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সফল খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পর তার নেতৃত্বেই আর্জেন্টিনা আন্তর্জাতিক ফুটবলের সবচেয়ে বড় সাফল্যগুলো অর্জন করেছে।
২০২১ সালের কোপা আমেরিকা জয় ছিল মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে বড় বাঁকবদল। এরপর ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপ জয় করে আর্জেন্টিনা। ২০২৪ সালে আবার কোপা আমেরিকা জিতে দলটি নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখে। এই সাফল্যের ফলে মেসিকে ঘিরে যে দীর্ঘদিনের ‘জাতীয় দলের হয়ে বড় শিরোপা জিততে পারেননি’ বিতর্ক ছিল, সেটিও কার্যত শেষ হয়ে যায়।
ফলে তার বিদায় কেবল একজন খেলোয়াড়ের অবসর নয়। এটি আর্জেন্টিনার ফুটবলের একটি স্বর্ণযুগের সমাপ্তির প্রতীক।
কেন ৬ অক্টোবরের ম্যাচটি এত গুরুত্বপূর্ণ?
আর্জেন্টিনা ও বেনিনের মধ্যকার ম্যাচটি প্রতিযোগিতামূলক কোনো টুর্নামেন্টের ম্যাচ নয়। কিন্তু মেসিকে ঘিরে এর গুরুত্ব সম্পূর্ণ ভিন্ন।
আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন মেসিকে জাতীয় দলের হয়ে আনুষ্ঠানিক বিদায় জানানোর জন্য এই ম্যাচকে বিশেষ উপলক্ষ হিসেবে তৈরি করেছে। বুয়েনস এইরেসের মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামও এ ধরনের মুহূর্তের জন্য যথার্থ মঞ্চ। এখানেই অসংখ্যবার আর্জেন্টিনার হয়ে খেলেছেন মেসি এবং এখানেই তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের বহু স্মরণীয় মুহূর্ত তৈরি হয়েছে।
মাঠে তার উপস্থিতিই তাই ম্যাচটির প্রধান আকর্ষণ। ফলাফল এখানে গৌণ; গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে বিদায়ের মুহূর্তটি।
মেসির জাতীয় দল ছাড়ার মধ্য দিয়ে আর্জেন্টিনার সামনে এখন একটি বড় প্রশ্ন—তার পরবর্তী যুগ কেমন হবে?
‘মেসি-পরবর্তী’ আর্জেন্টিনা
লিওনেল স্কালোনির অধীনে আর্জেন্টিনা গত কয়েক বছরে যে দলগত কাঠামো তৈরি করেছে, সেটিই মেসি-পরবর্তী সময়ের সবচেয়ে বড় আশাবাদ।
জুলিয়ান আলভারেজ, লাউতারো মার্তিনেজ, নিকো পাজসহ একাধিক তরুণ ও উদীয়মান খেলোয়াড় ইতোমধ্যে নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন। ফলে আর্জেন্টিনার সামনে প্রতিভার সংকট নেই।
সমস্যা অন্য জায়গায়
মেসির মতো একজন খেলোয়াড় শুধু গোল করেন না; তিনি ম্যাচের গতি পরিবর্তন করতে পারেন, সতীর্থদের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে পারেন এবং প্রতিপক্ষের কৌশলও বদলে দিতে বাধ্য করেন। তার সৃষ্টিশীলতা, নেতৃত্ব ও মাঠের উপস্থিতির সরাসরি বিকল্প তৈরি করা প্রায় অসম্ভব।
তাই মেসির বিকল্প হিসেবে একজন খেলোয়াড়কে দাঁড় করানোর চেয়ে আর্জেন্টিনার সামনে বাস্তবসম্মত পথ হলো দলগত শক্তি আরও বাড়ানো। অর্থাৎ, একজন মহাতারকার ওপর নির্ভরশীলতার পরিবর্তে সম্মিলিত সক্ষমতাকে সামনে নিয়ে আসা।
এ ক্ষেত্রে স্কালোনির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে মেসিকে ছাড়া একই ধরনের প্রতিযোগিতামূলক মানসিকতা ও ধারাবাহিকতা ধরে রাখা।
ফুটবলের বাইরে নতুন উচ্চাকাঙ্ক্ষা
মেসির বিদায়ের আবেগের মধ্যেই আর্জেন্টিনা আরেকটি বড় আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রকল্প নিয়ে সামনে এসেছে। আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে, চিলি ও ব্রাজিল মিলে ২০৩৫ সালের পুরুষ রাগবি বিশ্বকাপ আয়োজনের জন্য যৌথ প্রস্তাব দিয়েছে।
আর্জেন্টিনার নেতৃত্বে তৈরি এই প্রস্তাবে চার দেশই ম্যাচ আয়োজন করবে। পরিকল্পনাটি সফল হলে দক্ষিণ আমেরিকায় প্রথমবারের মতো পুরুষদের রাগবি বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হবে।
প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় ১০টি শহরের ১১টি স্টেডিয়াম ব্যবহারের কথা রয়েছে। এর মধ্যে আটটি ভেন্যু আর্জেন্টিনায় এবং উরুগুয়ে, চিলি ও ব্রাজিলে একটি করে ভেন্যু রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
আর্জেন্টিনার প্রস্তাবিত ভেন্যুগুলোর মধ্যে রয়েছে বুয়েনস এইরেসের মনুমেন্টাল ও হোসে আমালফিতানি স্টেডিয়াম, লা প্লাতার স্টেডিয়াম, কর্দোবার মারিও আলবের্তো কেম্পেস, মেন্ডোজার মালভিনাস আর্জেন্টিনাস এবং রোসারিওর গিগান্তে দে আরোয়িতো। এর সঙ্গে থাকছে ব্রাজিলের ঐতিহাসিক মারাকানা, চিলির ন্যাশনাল স্টেডিয়াম এবং উরুগুয়ের সেন্টেনারিও।
কেন ২০৩৫ রাগবি বিশ্বকাপ এত গুরুত্বপূর্ণ?
রাগবি বিশ্বকাপ আয়োজনের আকাঙ্ক্ষার পেছনে কেবল খেলাটির জনপ্রিয়তা নয়, রয়েছে বড় অর্থনৈতিক ও কৌশলগত হিসাবও।
একটি বড় আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আয়োজন পর্যটন, হোটেল-রেস্তোরাঁ, পরিবহন, অবকাঠামো, সম্প্রচার, বিজ্ঞাপন এবং স্থানীয় ব্যবসার জন্য বড় বাজার তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে আয়োজক দেশগুলোর আন্তর্জাতিক পরিচিতিও শক্তিশালী হয়।
দক্ষিণ আমেরিকার চার দেশ একসঙ্গে প্রস্তাব দেওয়ায় এই উদ্যোগের আরেকটি বিশেষ দিক তৈরি হয়েছে। চারটি দেশের সম্মিলিত জনসংখ্যা প্রায় ২৮৩ মিলিয়ন। অর্থাৎ সম্ভাব্য দর্শক, পর্যটক ও বাণিজ্যিক বাজারের আকারও বড়।
আর্জেন্টিনার দৃষ্টিতে এটি আরও গুরুত্বপূর্ণ। ফুটবলনির্ভর ক্রীড়া-পরিচয়ের বাইরে দেশটি রাগবিসহ অন্যান্য খেলাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও শক্তিশালী করতে চাইছে।
আর্জেন্টিনার রাগবি শক্তির ভিত্তি
এই যৌথ প্রস্তাবের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া শক্তি নিঃসন্দেহে আর্জেন্টিনা।
‘লস পুমাস’ নামে পরিচিত আর্জেন্টিনা জাতীয় রাগবি দল বহু বছর ধরে আন্তর্জাতিক রাগবিতে নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। ২০০৭, ২০১৫ ও ২০২৩ সালের রাগবি বিশ্বকাপে দলটি সেমিফাইনালে উঠেছে।
এখানেই আর্জেন্টিনার সঙ্গে অন্য তিন অংশীদারের পার্থক্য।
ব্রাজিল এখনো পুরুষদের রাগবি বিশ্বকাপে অংশ নিতে পারেনি। চিলি ২০২৩ সালে প্রথমবার বিশ্বকাপে জায়গা করে নেয়। অন্যদিকে উরুগুয়ের রয়েছে একাধিক বিশ্বকাপ খেলার অভিজ্ঞতা।
তবে যৌথ প্রস্তাবের মূল যুক্তিই হলো—চার দেশ একসঙ্গে তাদের ভেন্যু, বাজার, দর্শক, অবকাঠামো ও সাংগঠনিক সক্ষমতা ব্যবহার করবে। অর্থাৎ, কোনো একটি দেশের রাগবি শক্তির ওপর পুরো আয়োজন নির্ভর করবে না।
প্রতিদ্বন্দ্বিতাও কঠিন
তবে দক্ষিণ আমেরিকার এই প্রস্তাবকে এখনই বিজয়ী বলা যাবে না। ২০৩৫ রাগবি বিশ্বকাপ আয়োজনের দৌড়ে স্পেন ও জাপানের মতো দেশও আগ্রহ দেখিয়েছে।
বিশ্ব রাগবি সংস্থার আয়োজক নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় আরও কয়েকটি ধাপ রয়েছে। ফলে দক্ষিণ আমেরিকার চার দেশকে শুধু একটি আকর্ষণীয় প্রস্তাব দিলেই হবে না; তাদের আর্থিক সক্ষমতা, অবকাঠামো, যাতায়াত ব্যবস্থা, নিরাপত্তা, দর্শক ব্যবস্থাপনা এবং বাণিজ্যিক সম্ভাবনাও প্রমাণ করতে হবে।
অর্থাৎ ৬ অক্টোবর জমা দেওয়া প্রস্তাবটি কোনো শেষবিন্দু নয়; বরং দীর্ঘ প্রতিযোগিতার সূচনা।
একই দিনে দুটি প্রতীকী বার্তা
আর্জেন্টিনার ক্রীড়াঙ্গনের ৬ অক্টোবরের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক সম্ভবত এখানেই।
একদিকে লিওনেল মেসি জাতীয় দলের জার্সিতে শেষবারের মতো মাঠে নামছেন। তার সঙ্গে শেষ হচ্ছে এমন একটি অধ্যায়, যে অধ্যায়ে আর্জেন্টিনা দীর্ঘ অপেক্ষার পর আবার বিশ্ব ফুটবলের শীর্ষে উঠেছে।
অন্যদিকে একই সময়ে আর্জেন্টিনা দক্ষিণ আমেরিকার আরও তিন দেশের সঙ্গে মিলে ২০৩৫ সালের রাগবি বিশ্বকাপ আয়োজনের স্বপ্ন সামনে আনছে।
অর্থাৎ একটি ঘটনা অতীতের দিকে তাকাতে বাধ্য করছে, অন্যটি তাকাচ্ছে ভবিষ্যতের দিকে।
মেসি আর্জেন্টিনার ফুটবলের একটি প্রজন্মকে প্রতিনিধিত্ব করেন। তার বিদায় সেই প্রজন্মের আবেগের সমাপ্তি। আর রাগবি বিশ্বকাপের প্রস্তাব নতুন প্রজন্মের জন্য দক্ষিণ আমেরিকার ক্রীড়া-পরিচয়কে আরও বিস্তৃত করার আকাঙ্ক্ষার প্রতীক।
৬ অক্টোবর ২০২৬ আর্জেন্টিনার ক্রীড়াঙ্গনে একটি যুগের সমাপ্তি এবং নতুন উচ্চাকাঙ্ক্ষার সূচনার দিন।
মেসির বিদায় আর্জেন্টিনাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে, ইতিহাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়ও একসময় শেষ হয়। কিন্তু একই সঙ্গে ২০৩৫ রাগবি বিশ্বকাপের পরিকল্পনা জানিয়ে দিচ্ছে—একটি অধ্যায় শেষ হওয়া মানেই গল্প শেষ হয়ে যাওয়া নয়।
আর্জেন্টিনা এখন মেসি-পরবর্তী ফুটবল যুগের দিকে এগোচ্ছে। পাশাপাশি ফুটবলের বাইরে রাগবিকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ আমেরিকার বৃহত্তর ক্রীড়া-পরিচয় নির্মাণের স্বপ্নও দেখছে।