২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি বা ভিএআর নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। টুর্নামেন্টের শুরুতে প্রশ্ন উঠেছিল, বিশ্বকাপে কি ভিএআর অন্যভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে? তবে এক সপ্তাহের ধারাবাহিক বিতর্কিত সিদ্ধান্তের পর এখন সমর্থক, খেলোয়াড় ও বিশ্লেষকদের বড় প্রশ্ন, ঠিক কোন পরিস্থিতিতে ভিএআর হস্তক্ষেপ করবে?
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ঘানার পেনাল্টির আবেদন, স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ব্রাজিলের বাতিল হওয়া গোল কিংবা ইকুয়েডরের বিপক্ষে জার্মানির বিতর্কিত গোল, প্রতিটি ঘটনাই ভিএআরের ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
পরিসংখ্যান বলছে, হস্তক্ষেপের সংখ্যায় বিশ্বকাপ ও ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের মধ্যে খুব বেশি পার্থক্য নেই। গত মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগে প্রতি ম্যাচে গড়ে ভিএআর হস্তক্ষেপ ছিল শূন্য দশমিক দুই নয় বার। বিশ্বকাপে সেটি শূন্য দশমিক দুই আট। রেফারিকে মনিটর দেখতে পাঠানোর ক্ষেত্রেও দুই প্রতিযোগিতার গড় প্রায় একই।
তবে সময় যত গড়াচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে, একই ধরনের ঘটনায় ভিএআরের সিদ্ধান্ত একরকম থাকছে না।
ফিফার রেফারিং প্রধান পিয়েরলুইজি কলিনা মনে করেন, ফুটবল একটি শারীরিক সংস্পর্শের খেলা এবং সব ধরনের সংস্পর্শ ফাউল নয়। তাঁর লক্ষ্য, বিশ্বকাপে খেলার গতি অব্যাহত রাখা এবং অপ্রয়োজনীয় বাঁশি কমানো। কিন্তু মাঠে বেশি শারীরিক চ্যালেঞ্জ চলতে দিলে ভিএআরের জন্যও ‘স্পষ্ট ও সুস্পষ্ট ভুল’ নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এই সমস্যারই প্রতিফলন দেখা গেছে সাম্প্রতিক কয়েকটি ম্যাচে।
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ঘানার ম্যাচে প্রিন্স ক্বাবেনা আদুকে বক্সের ভেতর এজরি কনসার চ্যালেঞ্জের পরও পেনাল্টি দেওয়া হয়নি। ঘানার কোচ কার্লোস কুইরোজ ক্ষোভ প্রকাশ করে মন্তব্য করেন, ভিএআর যেন তখন ‘কফি খেতে গিয়েছিল’।
এরপর স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ব্রাজিলের ম্যাচে ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের করা একটি গোল বাতিল করা হয়। রিপ্লেতে দেখা যায়, স্কটিশ ডিফেন্ডারই বরং আগে ভিনিসিয়ুসকে আঘাত করেছিলেন। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এটি স্পষ্ট ফাউল ছিল না এবং ভিএআরের হস্তক্ষেপ অপ্রয়োজনীয় ছিল।
সবচেয়ে বেশি বিতর্ক হয় জার্মানি-ইকুয়েডর ম্যাচে। জার্মানির প্রথম গোলের আগে আলেক্সান্ডার পাভলোভিচের উঁচু পা ইকুয়েডরের পেদ্রো ভিতের মাথায় লাগলেও গোল বহাল রাখেন রেফারি, ভিএআরও হস্তক্ষেপ করেনি।
সাবেক ইংল্যান্ড গোলরক্ষক জো হার্ট বলেন, বিশ্বকাপে থাকা প্রতিটি খেলোয়াড়ই এই ঘটনাকে বিপজ্জনক খেলা এবং স্পষ্ট ফাউল হিসেবে দেখবে। তাঁর মতে, এটি ভুল সিদ্ধান্ত।
সাবেক ইংল্যান্ড নারী তারকা এলেন হোয়াইটও বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, ঘটনাটি ভিএআরে পর্যালোচনা না হওয়াই তাঁকে সবচেয়ে বেশি অবাক করেছে।
তবে একই ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে কাই হাভার্টজকে ফাউল করে দেওয়া পেনাল্টির সিদ্ধান্ত ভিএআরের পরামর্শে বাতিল করা হয়। কারণ, আক্রমণের শুরুতে লেরয় সানের একটি ফাউল ধরা হয়।
অনেকের মতে, একটি ফাউলে ভিএআরের হস্তক্ষেপ এবং একই ম্যাচে আরও স্পষ্ট একটি ফাউলে নীরব থাকা, এই দ্বৈত মানদণ্ডই বিতর্ককে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত বড় দলগুলোর বেশির ভাগ সিদ্ধান্তই ভিএআরের মাধ্যমে তাদের পক্ষে গেছে। ব্রাজিলের বাতিল হওয়া গোল এবং জার্মানির বাতিল হওয়া পেনাল্টিই মূলত শিরোপাপ্রত্যাশী দলগুলোর বিপক্ষে যাওয়া উল্লেখযোগ্য সিদ্ধান্ত।
ফ্রান্সের বিপক্ষে সেনেগালের ম্যাচেও কিলিয়ান এমবাপ্পেকে পেনাল্টি না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনা হয়েছে। যদিও ভিএআর রেফারিকে বিষয়টি পর্যালোচনার পরামর্শ দিয়েছিল, শেষ পর্যন্ত অন-ফিল্ড সিদ্ধান্তই বহাল থাকে।
ফলে প্রশ্ন উঠছে, ভিএআরের মূল দর্শন ‘সর্বনিম্ন হস্তক্ষেপে সর্বোচ্চ সুফল’ বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই দর্শন তখনই সফল হতে পারে, যখন মাঠের রেফারিরা শুরুতেই অধিকাংশ সিদ্ধান্ত সঠিকভাবে নিতে পারবেন। কিন্তু চলমান বিশ্বকাপে একের পর এক বিতর্কিত সিদ্ধান্ত প্রমাণ করছে, সেই ধারাবাহিকতা এখনো নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। সূত্র: বিবিসি