রোনাল্ডো না মদ্রিচ, কার শেষ হাসি?

বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে আজ মুখোমুখি পর্তুগাল ও ক্রোয়েশিয়া। শুধু শেষ বত্রিশের লড়াই নয়, এটি সময়ের সঙ্গেও দুই কিংবদন্তির যুদ্ধ। এক পাশে ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো, অন্য পাশে লুকা মদ্রিচ। দুজনেরই এটি হতে পারে শেষ বিশ্বকাপ, তাই ম্যাচটি ঘিরে বাড়তি উত্তেজনা ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে।

কানাডার টরন্টো স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে এই বহুল প্রতীক্ষিত ম্যাচ। ৪৩ হাজার ৩৬ দর্শক ধারণক্ষমতার এই ভেন্যু চলতি বিশ্বকাপের সবচেয়ে ছোট মাঠ হলেও পাঁচটি গ্রুপ ম্যাচেই ছিল কানায় কানায় পূর্ণ। প্রায় ১৫৮ মিলিয়ন কানাডিয়ান ডলার ব্যয়ে সংস্কার করা স্টেডিয়ামটি এখন প্রস্তুত নকআউট পর্বের সবচেয়ে আকর্ষণীয় লড়াইয়ের জন্য।

একসময় রিয়াল মাদ্রিদের ড্রেসিংরুম ভাগ করা দুই কিংবদন্তি এবার থাকবেন প্রতিপক্ষের জার্সিতে। একজন গোলের পর গোল করে ইতিহাস লিখেছেন, অন্যজন মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণ করে ফুটবলকে শিল্পে রূপ দিয়েছেন।

গ্রুপ ‘কে’ থেকে পাঁচ পয়েন্ট নিয়ে রানার্সআপ হয়ে নকআউটে উঠেছে পর্তুগাল। ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে ১-১ গোলের ড্র দিয়ে শুরু করা দলটি পরে উজবেকিস্তানকে ৫-০ গোলে উড়িয়ে দেয়। শেষ ম্যাচে কলম্বিয়ার সঙ্গে গোলশূন্য ড্র করে তারা। তিন ম্যাচে ৬ গোল করলেও হজম করেছে মাত্র ১টি। বলের নিয়ন্ত্রণে ধারাবাহিক থাকলেও আক্রমণে এখনও নিজেদের সেরা ছন্দ পুরোপুরি দেখাতে পারেনি রবার্তো মার্তিনেজের দল।

তবে দলের সবচেয়ে বড় ভরসা এখনও রোনাল্ডো। ৪১ বছর বয়সেও তিনি বিশ্বকাপে নিজের ছাপ রেখে চলেছেন। উজবেকিস্তানের বিপক্ষে জোড়া গোল করে বিশ্বকাপের ছয়টি ভিন্ন আসরে গোল করা প্রথম ফুটবলার হিসেবে নতুন ইতিহাস গড়েছেন। বিশ্বকাপে তার গোলসংখ্যা এখন ১০, যা দেশের হয়ে বিশ্বকাপে ইউসেবিওর রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে গেছে।

অবশ্য পর্তুগাল শুধু রোনাল্ডোনির্ভর নয়। ব্রুনো ফার্নান্দেজ, বার্নার্দো সিলভা, ভিতিনিয়া ও জোয়াও নেভেসকে নিয়ে গড়া মাঝমাঠ ও আক্রমণভাগ দলটিকে দিয়েছে বাড়তি শক্তি। ম্যাচের আগে কোচ রবার্তো মার্তিনেজ বলেছেন, নকআউট পর্ব মানেই নতুন এক বিশ্বকাপের শুরু। ক্রোয়েশিয়ার মতো অভিজ্ঞ দলের বিপক্ষে সামান্য ভুলেরও সুযোগ নেই।

অন্যদিকে গ্রুপ ‘এল’ থেকে ছয় পয়েন্ট নিয়ে রানার্সআপ হয়ে শেষ বত্রিশে উঠেছে ক্রোয়েশিয়া। শুরুতে ইংল্যান্ডের কাছে ৪-২ গোলে হারলেও পরে পানামাকে ১-০ এবং ঘানাকে ২-১ গোলে হারিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে তারা। তিন ম্যাচে ৫ গোল করার পাশাপাশি সমানসংখ্যক গোলও হজম করেছে দলটি।

ক্রোয়েশিয়ার প্রাণভোমরা লুকা মদ্রিচ। ৪০ বছর বয়সী এই মিডফিল্ডার আন্তর্জাতিক ফুটবলে ২০০ ম্যাচের মাইলফলক স্পর্শ করেছেন। চলতি বিশ্বকাপে এখনও গোল না পেলেও তার পায়ের ছোঁয়াতেই বদলে যায় ম্যাচের গতি। পানামার বিপক্ষে জয়ের পর টরন্টোর গ্যালারিতে তাকে ঘিরে সমর্থকদের উচ্ছ্বাসই তার প্রভাবের প্রমাণ।

ম্যাচের আগে ক্রোয়েশিয়া কোচ জ্লাতকো দালিচ বলেছেন, এটি শুধু রোনাল্ডো বনাম মদ্রিচের লড়াই নয়। আসল যুদ্ধ হবে মাঝমাঠে। যে দল কম ভুল করবে, তারাই এগিয়ে থাকবে। পর্তুগালের বল নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা নিয়েও সতর্ক তিনি।

চলতি বিশ্বকাপে রোনাল্ডো তিন ম্যাচে দুই গোল করে পর্তুগালের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ব্রুনো ফার্নান্দেজ আক্রমণ তৈরির মূল কারিগর, আর ভিতিনিয়া ও জোয়াও নেভেস মাঝমাঠে নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখছেন। অন্যদিকে গোল না পেলেও মদ্রিচের নেতৃত্বে মার্টিন বাতুরিনা ও পেতার সুচিচ ক্রোয়েশিয়ার মাঝমাঠকে শক্তিশালী করে তুলেছেন।

সাম্প্রতিক হেড-টু-হেডে পর্তুগাল কিছুটা এগিয়ে থাকলেও বিশ্বকাপে এবারই প্রথম মুখোমুখি হচ্ছে দুই দল। নকআউট পর্বে অবশ্য অতীতের পরিসংখ্যানের চেয়ে বর্তমান পারফরম্যান্সই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

কৌশলগতভাবে ম্যাচের সবচেয়ে বড় লড়াই হবে মাঝমাঠে। পর্তুগাল চাইবে বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে সুযোগ তৈরি করতে, আর ক্রোয়েশিয়া মদ্রিচের অভিজ্ঞতায় ম্যাচের ছন্দ বদলে দিতে চাইবে।

দুই দলের শেষ নকআউট লড়াই হয়েছিল ইউরো ২০১৬-এর শেষ ষোলোতে। অতিরিক্ত সময়ে রিকার্দো কোয়ারেসমার গোলে জয় পেয়েছিল পর্তুগাল। পরে সেই টুর্নামেন্টেই শিরোপা জিতেছিল তারা।

আজকের ম্যাচের জয়ী দল কোয়ার্টার ফাইনালে খেলবে স্পেন অথবা অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে। লেক অন্টারিওর তীরে টরন্টো স্টেডিয়াম এখন অপেক্ষায়-রাতটি কি হবে রোনাল্ডোর ইতিহাস গড়ার, নাকি মদ্রিচের আরেকটি অবিস্মরণীয় অধ্যায়ের?