দুই বছর আগে বার্লিনে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলো স্পেন। এবার নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ২০২৬ বিশ্বকাপ ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জিতে পূর্ণতা পেলো তাদের সাফল্যের গল্প।
২০১০ সালের মতো এবারও ইউরো জয়ের দুই বছরের মধ্যে বিশ্বকাপ জয়ের কীর্তি গড়ল ‘লা রোজা’। শুধু তাই নয়, ইতিহাসে প্রথম দেশ হিসেবে একই সময়ে পুরুষ ও নারী-উভয় বিভাগের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার বিরল গৌরবও অর্জন করেছে স্পেন।
ওখানেই শেষ নয়। তাদের পুরুষ দল ২০২৩ সালে নেশন্স লিগ জিতেছিল, ২০২৪ সালের অলিম্পিকসও। আর ২০২৪ ও ২০২৫ উভয় নেশন্স লিগে চ্যাম্পিয়ন হয় নারী দল। সাফল্যের পরিসংখ্যান আরও অবিশ্বাস্য। গত পাঁচ বছরে অনূর্ধ্ব-১৭ থেকে শুরু করে সিনিয়র পর্যায়ে এনিয়ে ১৬টি বিশ্ব ও ইউরোপিয়ান শিরোপা জিতল তারা।
স্প্যানিশ ফুটবল বিশেষজ্ঞ গুইলেম বালাগ বিবিসি স্পোর্ট-কে বলেন, ‘এটা আধিপত্য। এটা যেন এক নিখুঁত ঝড়। সাংস্কৃতিকভাবে আমরা নির্দিষ্ট উপায়ে কাজ করি। সবাই এটায় বিশ্বাস করে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আমরা যেন থেমে না যাই। এটা আরেকটা এভারেস্ট কারণ পুরুষ দল ইউরো জয়ের পর ২০১০ সালে বিশ্বকাপ জিতেছিল। এখন আমরা আবার এটা করলাম।’
স্পেন দলের সাফল্য
- নারী ফুটবল (১১টি শিরোপা, ২০২২–২০২৬)
- সিনিয়র দল: ১টি বিশ্বকাপ (২০২৩), ২টি নেশনস লিগ (২০২৪, ২০২৫)।
- অনূর্ধ্ব-২০ দল: ১টি বিশ্বকাপ (২০২২)।
- অনূর্ধ্ব-১৯ দল: ৫টি অনূর্ধ্ব-১৯ ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নশিপ (২০২২, ২০২৩, ২০২৪, ২০২৫, ২০২৬)।
- অনূর্ধ্ব-১৭ দল: ১টি বিশ্বকাপ (২০২২), ১টি ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নশিপ (২০২৪)।
- পুরুষ ফুটবল (৫টি শিরোপা, ২০২২–২০২৬)
- সিনিয়র দল: ১টি বিশ্বকাপ (২০২৬), ১টি ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নশিপ (২০২৪), ১টি নেশনস লিগ (২০২৩)।
- অনূর্ধ্ব-২৩ দল: ১টি অলিম্পিক স্বর্ণপদক (২০২৪)।
- অনূর্ধ্ব-১৯ দল: ১টি ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নশিপ (২০২৬)।
দে লা ফুয়েন্তের ওপর আস্থা বদলে দিলো ইতিহাস
২০২২ সালের ডিসেম্বরে যখন স্পেন প্রধান কোচ হিসেবে লুইস দে লা ফুয়েন্তেকে নিয়োগ দিলো, তখন খুব কম লোকই তার ওপর আস্থা রাখতে পেরেছিল। তারা ভাবতেও পারেনি যে এত অল্প সময়ে তিনি নেশন্স লিগ, ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ ও বিশ্বকাপ জিতবেন তিনি।
কাতারে শেষ ষোলোতে স্পেন মরক্কোর কাছে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিয়েছিল। লুইস এনরিকে চলে যাওয়ার পর তার একজন উত্তরসূরির প্রয়োজন ছিল স্পেনের। বালাগ বললেন, ‘তারা এমন একজনকে (দে লা ফুয়েন্তে) বেছে নিলো যিনি খেলার ধরন ও পদ্ধতি বুঝতেন। এটা ছিল খুবই ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত। আমি মনে করি না কেউ ভেবেছিল তিনি এতটা সফল হবেন।’
শেষ পাঁচটি ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপের (২০০৮, ২০১২, ২০২৪) মধ্যে তিনটি জেতা স্পেনের দায়িত্ব এমন একজন নেবেন, যিনি বড় ক্লাবের ডাগআউটে কখনো দাঁড়াননি এটা ছিল খুবই ঝুঁকিপূর্ণ।
১৯৯৪ সালে খেলোয়াড় হিসেবে অবসর নেওয়ার ১৫ বছর পর দে লা ফুয়েন্তে স্পেনের যুব দলের দায়িত্ব নেন। এই সময়ে তিনি নিচের স্তরের স্প্যানিশ লিগে, যুব দলে ও সহকারী কোচের ভূমিকায় ছিলেন।
স্পেনের সাবেক মিডফিল্ডার হুয়ান মাতা বিবিসি স্পোর্ট-কে বলেন, ‘দে লা ফুয়েন্তে জানতেন এই খেলোয়াড়দের অনেকে অ্যাকাডেমি থেকে এসেছে এবং তারা একটি দল হিসেবে গড়ে উঠছে। এই দল শুধু বর্তমানের নয়, ভবিষ্যতেরও।’
অনূর্ধ্ব-১৯, অনূর্ধ্ব-২১ ও অলিম্পিক পর্যায়ে কাজ করার পর যখন সিনিয়র দলের দায়িত্ব নিলেন দে লা ফুয়েন্তে, তখন প্রতিপক্ষের প্রতি শ্রদ্ধা, প্রক্রিয়ার প্রতি গুরুত্ব এবং ধৈর্য ও শান্ত থাকার শিক্ষা দেওয়ার একটি সংস্কৃতি তৈরি করেছেন।
শুক্রবার নিউইয়র্কে ম্যাচের আগের সংবাদ সম্মেলনে ৬৫ বছর বয়সী সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘আপনাদের অনেকেই আমার চেয়ে ছোট এবং অভিজ্ঞতাকে সম্মান করতে হবে আপনাদের।’
ফাইনাল জয়ের পর তিনি বললেন, “ম্যাচ শেষ হওয়ার পর কয়েকজন ফুটবলার বলল, ‘কোচ, আমরা সবক্ষেত্রেই সবকিছু জিতেছি, এখন আমাদের জেতার আর কী আছে।’ আমরা সিদ্ধান্তে পৌঁছালাম যে সেপ্টেম্বরে আমাদের ম্যাচটি বাকি আছে। এই দল অদম্য।’
জাতীয় দল ও স্প্যানিশ কোচদের সাফল্য ক্লাব ফুটবলেও ছড়িয়ে পড়েছে। ম্যানসিটিতে শিরোপায় ঠাসা ১০ বছর পর পেপ গার্দিওলা চলে যাওয়া সত্ত্বেও ২০২৬-২৭ প্রিমিয়ার লিগ শুরু করতে যাওয়া কোচদের এক-চতুর্থাংশই স্প্যানিশ।
টানা ৩৮ ম্যাচ অপরাজিত স্পেন
বিশ্বকাপ জয়ের মধ্য দিয়ে সব ধরনের প্রতিযোগিতা মিলিয়ে টানা ৩৮ ম্যাচ অপরাজিত থাকল স্পেন। ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার কোনো দলের জন্য এটিই দীর্ঘতম অপরাজিত থাকার রেকর্ড।
সবকিছুই জিতছে স্পেন
গত এক দশকে স্পেনের নারী ফুটবলও সমৃদ্ধ হতে শুরু করেছে। উচ্চ চাপের ম্যাচগুলোতেও তারা বড় সাফল্য পেতে শুরু করেছে।
তিন বছর আগে মেয়েদের বিশ্বকাপ ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তাদের জয় এসেছিল। ২০১৫ সালে প্রথমবার বিশ্বকাপে খেলতে নামা দলটি তৃতীয় প্রচেষ্টাতেই চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। স্পেনের নারী দল সেই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ ও ২০২৫ নেশন্স লিগে টানা শিরোপা জেতে।
সাবেক খেলোয়াড় মারিয়া গারিদো ২০২৪ সালে বিবিসি স্পোর্ট-কে বলেছিলেন, ‘স্পেনে নারী ফুটবলের পরিবর্তন ছিল দেখার মতো। দশ বছর আগে যখন আমি বার্সেলোনার হয়ে খেলছিলাম, সেখানে মেয়েদের জন্য কোনো লা মাসিয়া (বার্সেলোনার নারী অ্যাকাডেমি) ছিল না। আমরা নিজেরাই যাতায়াতের খরচ বহন করতাম, আমাদের বাবা-মায়েরা ট্রেনিংয়ে নিয়ে আসতেন এবং আমরা কোনো উপার্জনও করতাম না।’
‘কিন্তু গত পাঁচ বছরে পরিস্থিতির নাটকীয় উন্নতি হয়েছে। নারী ফুটবলের প্রসারে ব্যাপক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে আরও যুব বিভাগ তৈরি, উন্নততর সুযোগ-সুবিধা ও পরিবেশ এবং মেয়েদের জন্য একটি বিশেষ ফুটবল অ্যাকাডেমি প্রতিষ্ঠা। এই রুকিন্তু গত পাঁচ বছরে পরিস্থিতির নাটকীয় উন্নতি হয়েছে। নারী ফুটবলের প্রসারে ব্যাপক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে আরও যুব বিভাগ তৈরি, উন্নততর সুযোগ-সুবিধা ও পরিবেশ এবং মেয়েদের জন্য একটি বিশেষ ফুটবল একাডেমি প্রতিষ্ঠা। এই রূপান্তর শুধু খেলাতে বিপ্লব ঘটায়নি, স্পেনে মেয়েদের ফুটবলের প্রতি শ্রদ্ধাও এনে দিয়েছে।’
পুরুষ ও নারী দলে এই সাফল্য এসেছে গত দশকে যুব পর্যায়ে অসংখ্য শিরোপা জয়ের পর।
জয়ই জয়ের জন্ম দেয়
ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল মনে হচ্ছে। অনেকের বিশ্বাস স্পেনের আধিপত্য চলতে থাকবে। লামিনে ইয়ামাল ও পাউ কুবারসির কথাই ধরুন। পুরুষ দলে এমন দুজন অসাধারণ তরুণ প্রতিভা আছে যারা মাত্র ১৯ বছরেই তাদের প্রথম বিশ্বকাপ শিরোপা জিতল।
একই বয়সে বার্সেলোনার সঙ্গে তিনটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতেছেন জাতীয় নারী দলের খেলোয়াড় ভিকি লোপেজ। ২৩ বছর বয়সের আগেই ৫০ বারের বেশি জাতীয় দলের জার্সি পরেছেন ফরোয়ার্ড সালমা পারালুয়েলো।
১৯৫৮ সালে ব্রাজিলের পেলে (১৭ বছর, ২৪৯ দিন) ও ১৯৮২ সালে ইতালির গিউসেপ্পে বারগোমির পর তৃতীয় সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপ ফাইনাল খেললেন ইয়ামাল। এদিন শুরুর একাদশে ছিলেন ১৯ বছর ও ১৭৮ দিনের কুবারসি। তাতে এক বিশ্বকাপের ফাইনালে দুজন টিনএজারকে খেলানো প্রথম দল হয়েছে স্পেন।
সাবেক ইংল্যান্ড গোলকিপার জো হার্ট বিবিসি স্পোর্ট-কে বললেন, ‘স্পেনের খেলার এমন একটি ধরন আছে, যার ধারেকাছে থাকার প্রমাণ বিশ্বের কেউ দেখাতে পারেনি। এই বিশ্বকাপে কেউ তাদের আঘাত করতে পারেনি। পুরো টুর্নামেন্টে তারা প্রতিপক্ষের মাত্র ১০টি শটের মুখোমুখি হয়েছে।’
ফ্রান্সের ১৯৯৮ বিশ্বকাপ জয়ী থিয়েরি অঁরি ফক্স স্পোর্টস-কে বলেছেন, পরবর্তী বছরগুলোতে আধিপত্য করার সম্ভাবনা স্পেনের রয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমি তাদের পদ্ধতিকে কৃতিত্ব দিতে চাই, যেটা তারা খেলছে। কারণ স্পেন কখনো এভাবে জিততে অভ্যস্ত নয়। এবং এখন তারা প্রত্যেক পর্যায়ে জেতে।’