ফুটবল মাঠে গোল, জয় কিংবা শিরোপার লড়াই—এসবই সাধারণত ম্যাচের মূল আকর্ষণ। কিন্তু তুরস্কের ইস্তাম্বুলে একটি অপেশাদার লিগের ফাইনালে মুহূর্তেই বদলে গেল ম্যাচের চিত্র। বলের আঘাতে একটি সিগাল মাঠে পড়ে যাওয়ার পর খেলা ভুলে সেটিকে বাঁচাতে ছুটে যান এক ফুটবলার। প্রায় দুই মিনিট বুকের ওপর চাপ প্রয়োগ করে পাখিটির শ্বাস ফেরানোর চেষ্টা করেন তিনি।
ঘটনাটি ঘটে গত ২২ ফেব্রুয়ারি ইস্তাম্বুলের জেইতিনবুর্নু এলাকায় ইস্তাম্বুল প্রথম অপেশাদার লিগের প্লে-অফ ফাইনালে। মুখোমুখি হয়েছিল ইস্তাম্বুল ইউরদুম স্পোর ও মেভলানাকাপি গুজেলহিসার। ম্যাচের ২২ মিনিটে ইউরদুম স্পোরের গোলরক্ষক মুহাম্মেত উয়ানিক নিজের পেনাল্টি এলাকা থেকে বল ক্লিয়ার করেন। উড়ে যাওয়া বলটি নিচু দিয়ে উড়ে যাওয়া একটি সিগালের গায়ে আঘাত করলে পাখিটি ঘুরতে ঘুরতে মাঠে পড়ে যায়।
বলটি পাখিটির গায়ে লেগেছে—প্রথমে তা বুঝতে পারেননি গোলরক্ষক উয়ানিক। পরে কী ঘটেছে বুঝতে পেরে তিনি মানসিকভাবে বিচলিত হয়ে পড়েন। বলটি যে একটি জীবন্ত প্রাণীর গায়ে আঘাত করেছে, তা জানার পর ঘটনাটি তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়।
এর মধ্যেই ইস্তাম্বুল ইউরদুম স্পোরের অধিনায়ক গানি চাতান ছুটে যান সিগালটির কাছে। পাখিটিকে নিস্তেজ অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে তিনি বুকের ওপর চাপ প্রয়োগ শুরু করেন। কোনো আনুষ্ঠানিক প্রাথমিক চিকিৎসার প্রশিক্ষণ না থাকলেও তাৎক্ষণিকভাবে প্রাণীটিকে বাঁচানোর চেষ্টা করেন তিনি।
প্রায় দুই মিনিট ধরে চাতান পাখিটির বুকে সাবধানে চাপ দিতে থাকেন। একপর্যায়ে সিগালটির পা নড়তে শুরু করে। পরে সেটি চোখ খুলে সাড়া দেওয়ার লক্ষণ দেখায় এবং শ্বাস নিতে শুরু করে। এরপর চাতান পাখিটিকে মাঠের চিকিৎসাকর্মীদের কাছে তুলে দেন।
চিকিৎসার পর জানা যায়, সিগালটির একটি ডানা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে সেটি তখন উড়তে পারছিল না। তবে মাঠে প্রাথমিকভাবে সাড়া ফিরে পাওয়ার পর পাখিটিকে আরও চিকিৎসার জন্য নেওয়া হয়।
অদ্ভুত এই ঘটনায় ম্যাচও কিছু সময়ের জন্য থেমে যায়। মাঠে উপস্থিত খেলোয়াড় ও দর্শকদের দৃষ্টি তখন পুরোপুরি চলে যায় আহত পাখিটির দিকে। খেলার উত্তেজনা ছাপিয়ে সবার মনোযোগের কেন্দ্র হয়ে ওঠে ছোট্ট প্রাণীটিকে বাঁচানোর চেষ্টা।
তবে শেষ পর্যন্ত চাতানের দল শিরোপা জিততে পারেনি। নির্ধারিত সময়ের পর টাইব্রেকারে ইস্তাম্বুল ইউরদুম স্পোর ৪-২ গোলে হেরে যায়। কিন্তু ম্যাচের ফল নিয়ে চাতানের আক্ষেপ ছিল সীমিত। তার কাছে আহত একটি প্রাণকে বাঁচানোর চেষ্টা করাটাই ছিল বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
চাতানের এই মানবিক আচরণের দৃশ্য পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং ব্যাপক সাড়া তৈরি করে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও ঘটনাটি গুরুত্ব পায়।
ফুটবলের মাঠে সেদিন হয়তো ইস্তাম্বুল ইউরদুম স্পোর শিরোপা জিততে পারেনি। কিন্তু একটি উড়ে যাওয়া বল যখন একটি প্রাণের জন্য বিপদ ডেকে এনেছিল, তখন খেলার উত্তেজনা ভুলে পাশে দাঁড়ানো গানি চাতানের মানবিক আচরণই হয়ে উঠেছে ম্যাচটির সবচেয়ে স্মরণীয় ঘটনা।