কলকাতার যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে আজ মুখোমুখি হচ্ছে ব্রাজিল ও ভারত। একদিকে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল, অন্যদিকে বিশ্ব ফুটবলে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টায় থাকা ভারত। কাগজে-কলমে এটি একটি আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচ হলেও কলকাতা, ভারতীয় ফুটবল এবং ব্রাজিলের বিশাল সমর্থকগোষ্ঠীর কাছে ম্যাচটির গুরুত্ব অনেক বেশি।
৩ অক্টোবরের এই ম্যাচটি সিনিয়র পর্যায়ে ভারত ও ব্রাজিলের প্রথম মুখোমুখি লড়াই। ভারতের জন্য এটি এখন পর্যন্ত মুখোমুখি হওয়া সবচেয়ে উচ্চ র্যাঙ্কের প্রতিপক্ষ। ম্যাচের আগে ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ব্রাজিল পঞ্চম এবং ভারত ১৩৮তম অবস্থানে রয়েছে।
ভারতীয় ফুটবলের ইতিহাসে বড় আন্তর্জাতিক দলের বিপক্ষে খেলা নতুন কিছু নয়। তবে ব্রাজিলের মতো পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলের বিপক্ষে সিনিয়র পর্যায়ে সরাসরি মাঠে নামার ঘটনা বিরল। এ কারণেই অল ইন্ডিয়া ফুটবল ফেডারেশন (এআইএফএফ) ম্যাচটিকে ভারতীয় ফুটবলের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ একটি উপলক্ষ হিসেবে দেখছে।
এআইএফএফের ভাষ্য, ব্রাজিলের বিপক্ষে খেলা ভারতীয় ফুটবলারদের বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী দলের বিপক্ষে নিজেদের পরীক্ষা করার সুযোগ দেবে। একই সঙ্গে এমন ম্যাচ থেকে খেলোয়াড়েরা বড় মঞ্চের অভিজ্ঞতা অর্জনের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করার সুযোগ পেতে পারেন।
ব্রাজিলের দিক থেকেও ম্যাচটির আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। কোচ কার্লো আনচেলত্তি অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সাম্প্রতিক দুই প্রীতি ম্যাচের পর নতুন খেলোয়াড় ও দলের সমন্বয় পরীক্ষা করছেন। ২০২৬ বিশ্বকাপের পরবর্তী পর্যায়ের জন্য নতুন প্রজন্ম গড়ে তোলার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেও ম্যাচটি গুরুত্বপূর্ণ।
ভারতের অন্য অনেক শহরের তুলনায় কলকাতার সঙ্গে ব্রাজিলের সম্পর্ক আরও গভীর। বিশ্বকাপ এলেই শহরের বিভিন্ন পাড়া হলুদ-সবুজ পতাকায় সেজে ওঠে। ব্রাজিলের পাশাপাশি আর্জেন্টিনারও বিশাল সমর্থকগোষ্ঠী রয়েছে কলকাতায়। দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবলের প্রতি এই আকর্ষণ কয়েক দশক ধরে গড়ে উঠেছে।
গবেষক সৌভিক নাহার ২০১৪ সালের একাডেমিক গবেষণায় কলকাতায় ব্রাজিল ও পেলের জনপ্রিয়তাকে আন্তঃদেশীয় ফুটবল-সমর্থনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর গবেষণায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে পেলের ১৯৭৭ সালের কলকাতা সফর এবং এর সাংস্কৃতিক প্রভাব।
১৯৭৭ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্ক কসমসের হয়ে কলকাতার ইডেন গার্ডেনে মোহনবাগানের বিপক্ষে খেলতে এসেছিলেন পেলে। ম্যাচটি ২-২ গোলে শেষ হয়। প্রতিবেদনে প্রায় ৮০ হাজার দর্শকের উপস্থিতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সেই সফর কলকাতার মানুষের কাছে ব্রাজিলীয় ফুটবলকে কেবল দূরের কোনো বিশ্বকাপের গল্প না রেখে একজন জীবন্ত কিংবদন্তির সঙ্গে যুক্ত করে দেয়।
এরপর টেলিভিশনের বিস্তার সেই সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করে। বিশেষ করে ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে ব্রাজিলের জিকো, সক্রেটিস, রোমারিও, রোনালদো, রিভালদো ও রোনালদিনহোদের খেলা ভারতীয় দর্শকদের কাছে ব্রাজিলীয় ফুটবলের একটি স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করে।
কলকাতায় ব্রাজিল-সমর্থনের ইতিহাস শুধু বিশ্বকাপের ফলাফল দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। একসময় রেডিও ধারাভাষ্য ছিল আন্তর্জাতিক ফুটবল দেখার প্রধান জানালা। পরে টেলিভিশন সেই অভিজ্ঞতাকে বদলে দেয়।
১৯৮৬ বিশ্বকাপের সময় থেকে ব্রাজিলের খেলা ভারতীয় ঘরে আরও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। ফুটবলারদের ব্যক্তিগত দক্ষতা, আক্রমণাত্মক ফুটবল ও নান্দনিকতার সঙ্গে যুক্ত একটি সাংস্কৃতিক ভাবমূর্তি সমর্থকদের আকৃষ্ট করে। গবেষণাতেও কলকাতায় ব্রাজিল-সমর্থনের ক্ষেত্রে পেলের প্রতীকী গুরুত্ব ও গণমাধ্যমের ভূমিকা তুলে ধরা হয়েছে।
২০০২ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের পঞ্চম শিরোপা জয় সেই জনপ্রিয়তাকে আরও দৃঢ় করে। রোনালদো, রোনালদিনহো, রিভালদো ও কাফুদের দল কলকাতার পাড়ায় পাড়ায় উৎসবের আবহ তৈরি করেছিল। এক গবেষণায় ২০০২ বিশ্বকাপ ফাইনালে ব্রাজিলের জয়ের পর কলকাতায় আতশবাজি, হলুদ-সবুজ সাজসজ্জা এবং বড় পর্দায় খেলা দেখার ব্যাপক আয়োজনের বর্ণনা পাওয়া যায়।
এখন সেই সমর্থনের বড় অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলে গেছে। ব্রাজিলের তারকা খেলোয়াড়দের ভারতীয় অনুসারী, ফ্যান ক্লাব ও ম্যাচকেন্দ্রিক অনলাইন কনটেন্টের মাধ্যমে সম্পর্কটি আরও দৃশ্যমান হয়েছে।
শুধু ভারতীয় দিকের গল্প নয়, ব্রাজিলের অধিনায়ক মারকুইনোসও ভারতীয় সমর্থকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানোর সুযোগ হিসেবে দেখছেন এই সফরকে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ব্রাজিলের বাইরে তাদের অন্যতম বড় সমর্থকগোষ্ঠী ভারতে রয়েছে।
ব্রাজিলের কোচ আনচেলত্তিও কলকাতার ফুটবল-আবেগ সম্পর্কে অবগত। তিনি বলেছেন, এ ধরনের ম্যাচ খেলোয়াড়দের প্রস্তুতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ এবং তিনি সমর্থকদের জন্য আনন্দদায়ক ফুটবল দেখতে চান।
ফলে ম্যাচটি কেবল একটি দেশের জাতীয় দলের বিপক্ষে আরেক দেশের জাতীয় দলের খেলা নয়; এটি ব্রাজিলীয় ফুটবলের দীর্ঘদিনের ভারতীয় দর্শক-সম্পর্কেরও একটি প্রকাশ্য উদযাপন।
ভারতের জন্য ম্যাচটির সবচেয়ে বড় দিক হতে পারে অভিজ্ঞতা। বিশ্বের অন্যতম সফল জাতীয় দলের বিপক্ষে খেলার সুযোগ একটি দলের খেলোয়াড়দের নিজেদের সীমা ও সক্ষমতা বোঝার সুযোগ করে দেয়।
ভারতীয় ফুটবলার জয় গুপ্তাও ম্যাচটি নিয়ে বড় প্রত্যাশার কথা বলেছেন। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে তাঁর বক্তব্য এসেছে, ব্রাজিলের ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ও অন্য তারকাদের বিপক্ষে খেলার অভিজ্ঞতা ভারতীয় খেলোয়াড়দের জন্য বিশেষ কিছু।
তবে ম্যাচটিকে ঘিরে ভিন্নমতও রয়েছে। সাবেক ভারতীয় অধিনায়ক বাইচুং ভুটিয়া ম্যাচটির সময়সূচি ও উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর মতে, একটি বড় আন্তর্জাতিক ম্যাচ আয়োজন করলেই ভারতীয় ফুটবলের কাঠামোগত সমস্যাগুলোর সমাধান হবে না। তাঁর মন্তব্যে ভারতীয় ফুটবলের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন, অবকাঠামো ও তৃণমূল পর্যায়ের বিষয়গুলোও সামনে এসেছে।
এ কারণে ব্রাজিল-ভারত ম্যাচের তাৎপর্য দুটি দিক থেকে দেখা হচ্ছে একটি হলো তাৎক্ষণিক আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা, অন্যটি হলো সেই অভিজ্ঞতা ভারতীয় ফুটবলের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নে কীভাবে কাজে লাগানো হবে।
ব্রাজিলের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ভারতীয় ফুটবলে ব্রাজিলিয়ান খেলোয়াড়দের উপস্থিতি। কলকাতার ক্লাব ফুটবলে একাধিক ব্রাজিলিয়ান খেলোয়াড় সমর্থকদের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক তৈরি করেছেন।
হিন্দুস্তান টাইমসের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে ১৯৮৪ সালে সাও পাওলোর অনূর্ধ্ব-২০ দল কলকাতায় আসার কথা এবং পরবর্তী সময়ে ভারতীয় ক্লাব ফুটবলে ব্রাজিলিয়ান খেলোয়াড়দের উপস্থিতির কথা তুলে ধরা হয়েছে। ১৯৯৯ সালে মোহনবাগানে আসা জোসে রামিরেজ বারেত্তোও কলকাতার ফুটবল সংস্কৃতির অংশ হয়ে ওঠেন।
২০১২ সালেও ব্রাজিলের সাবেক বিশ্বকাপজয়ী খেলোয়াড়দের একটি দল কলকাতায় প্রদর্শনী ম্যাচ খেলেছিল। সেই ম্যাচে ডুঙ্গা, বেবেতো, জিনহো ও মাউরো সিলভাসহ ব্রাজিলের সাবেক তারকারা অংশ নেন।
অর্থাৎ আজকের ম্যাচের পেছনে রয়েছে কয়েক দশকের একটি সম্পর্ক।
ভারত-ব্রাজিল ম্যাচকে জনপ্রিয়ভাবে ‘ফুটবল দ্বৈরথ’ বলা হলেও ঐতিহাসিক অর্থে এটি ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা বা ব্রাজিল-উরুগুয়ের মতো দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়।
বর্তমান ম্যাচের আকর্ষণ মূলত বিশ্বচ্যাম্পিয়ন বনাম ভারতীয় ফুটবলের পরীক্ষার মঞ্চ এবং ভারতীয় দর্শকদের দীর্ঘদিনের ব্রাজিল-প্রেমের মিলন। এ কারণেই ম্যাচটি আন্তর্জাতিক ফুটবল সংবাদে জায়গা করে নিয়েছে।
ব্রাজিলের জন্য এটি নতুন খেলোয়াড়দের পরখ করার প্রস্তুতি ম্যাচ; ভারতের জন্য নিজেদের মান যাচাইয়ের বিরল সুযোগ। আর কলকাতার জন্য এটি কয়েক দশকের ফুটবল-আবেগের সঙ্গে বর্তমান প্রজন্মের তারকাদের সরাসরি সাক্ষাৎ।
ভারত-ব্রাজিল ম্যাচের সবচেয়ে বড় গল্প হয়তো মাঠের ৯০ মিনিটের চেয়েও বড়। একদিকে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল, অন্যদিকে এমন একটি ভারতীয় দল, যার জন্য বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী ফুটবল সংস্কৃতির সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতা নিজেই একটি বড় অভিজ্ঞতা।