চোট থেকে ফিরে ইউএস ওপেন জিতে বিশ্বসেরা রিবাকিনা

নিউইয়র্কে আসার সময় পায়ের চোটে ব্যথা ছাড়া ঠিকমতো হাঁটতেই পারছিলেন না এলেনা রিবাকিনা। আর টুর্নামেন্ট শেষে সেই তিনিই হাতে তুলেছেন ইউএস ওপেনের ট্রফি, সঙ্গে পেয়েছেন নারী টেনিসের বিশ্ব র‍্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষস্থান। কঠিন শারীরিক অবস্থাকে পেছনে ফেলে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে ক্যারিয়ারের তৃতীয় গ্র্যান্ড স্ল্যাম জিতেছেন কাজাখস্তানের এই টেনিস তারকা।

শনিবারের (১২ সেপ্টেম্বর) ফাইনালে দুইবারের বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আরিনা সাবালেঙ্কাকে ৬-৪, ৫-৭, ৬-২ গেমে হারিয়ে ইউএস ওপেনের শিরোপা জেতেন ২৭ বছর বয়সী রিবাকিনা। একই প্রতিপক্ষকে হারিয়েই জানুয়ারিতে অস্ট্রেলিয়ান ওপেনও জিতেছিলেন তিনি। ২০২৬ সালে চারটি গ্র্যান্ড স্ল্যামের মধ্যে দুটিই এখন রিবাকিনার দখলে।

তবে নিউইয়র্কে তার পথচলা মোটেও সহজ ছিল না। গত মাসে সিনসিনাটি ওপেনের কোয়ার্টার ফাইনালে ইগা শিয়নতেকের বিপক্ষে খেলার সময় পায়ের পুরোনো চোট আরও বেড়ে যায়। বছরের শেষ গ্র্যান্ড স্ল্যাম শুরুর এক সপ্তাহেরও বেশি সময় আগে এমন চোটে পড়ে টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়াই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল।

রিবাকিনা বলেন, ‘আমি খুব হতাশ হয়ে পড়েছিলাম। প্রতিদিন পরিস্থিতি কী হবে, সেটাই বুঝতে পারছিলাম না। নিউইয়র্কে এসে এমআরআই করিয়েছিলাম। ফল খুব একটা ভালো ছিল না। পরের কয়েক দিন ব্যথা ছাড়া হাঁটতেও পারছিলাম না।’

তবে অস্ট্রেলিয়ায় তার পরিচিত একজন চিকিৎসকের সহায়তা এবং দলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় শেষ পর্যন্ত একটি পরিকল্পনা তৈরি করা হয়। প্রায় এক সপ্তাহ কোর্টে অনুশীলন করতে পারেননি রিবাকিনা। এর বদলে প্রতিদিন জিমে পুনর্বাসনমূলক অনুশীলন করেছেন। পাশাপাশি মানসিকভাবে নিজেকে স্বাভাবিক রাখতে দলের সঙ্গে রাতের খাবার খাওয়া ও সিনেমা দেখার মতো কাজও করেছেন।

নিউইয়র্কে ফিরে কোর্টে নামার পর অবশ্য চোটের কোনো প্রভাবই যেন দেখা যায়নি। প্রথম চার ম্যাচের একটিতেও সেট হারাননি তিনি। সেই পথেই চারবারের গ্র্যান্ড স্ল্যামজয়ী নাওমি ওসাকাকেও বিদায় করেন। এরপর কোয়ার্টার ফাইনালে অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন ঝেং চিনওয়েন, সেমিফাইনালে তৃতীয় বাছাই কোকো গফ এবং ফাইনালে শীর্ষ বাছাই সাবালেঙ্কাকে হারিয়ে শিরোপা নিশ্চিত করেন।

রিবাকিনা বলেন, ‘চোট নিয়ে আমি সত্যিই দুর্ভাগা ছিলাম। কিন্তু আমি খুব গর্বিত। এখনো বিশ্বাস করতে পারছি না।’

ফাইনালেও তার মানসিক দৃঢ়তার পরিচয় পাওয়া গেছে। প্রথম সেটে তার অন্যতম বড় অস্ত্র সার্ভ ঠিকমতো কাজ না করলেও সেটটি জিতে নেন তিনি। প্রথম সার্ভের সাফল্য ছিল মাত্র ২৭ শতাংশ। তারপরও নিজের সার্ভ থেকে ৩০ পয়েন্টের মধ্যে ২২টি জেতেন এবং কোনো ব্রেক পয়েন্টের মুখোমুখি না হয়েই সেটটি নিজের করে নেন।

দ্বিতীয় সেটের দ্বাদশ গেমে রিবাকিনার সার্ভ ভেঙে ম্যাচে সমতা ফেরান সাবালেঙ্কা। কিন্তু তৃতীয় সেটে আবারও পুরো নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেন রিবাকিনা। সাবালেঙ্কা যখন হতাশায় দৃশ্যত ভেঙে পড়ছিলেন, তখন রিবাকিনাকে দেখা যায় অবিশ্বাস্য রকম শান্ত ও স্থির। সাবেক ব্রিটিশ এক নম্বর অ্যানাবেল ক্রফট তাকে মেশিনের সঙ্গে তুলনা করে বলেন, রিবাকিনার মাথার ভেতর কী চলছে, তা বোঝাই কঠিন।

শিরোপার জন্য সার্ভ করার সময় অবশ্য কিছুটা নার্ভাস হয়ে পড়েছিলেন রিবাকিনা। পরপর দুটি ডাবল ফল্ট করেন তিনি। কিন্তু ৪০-৩০ ব্যবধানে ম্যাচ পয়েন্ট পাওয়ার পর আর কোনো ভুল করেননি। শিরোপা নিশ্চিত করতে ম্যাচের ১২তম এসটি নিখুঁতভাবে মেরে দেন তিনি। এরপর দুই হাত উঁচিয়ে হাসিমুখে উদযাপনে মাতেন রিবাকিনা।

এই জয়ের মধ্য দিয়ে সোমবার নারী টেনিসের বিশ্ব র‍্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে উঠবেন রিবাকিনা। তিনি হবেন বিশ্বসেরা হওয়া ৩০তম নারী খেলোয়াড়। গত ৯৯ সপ্তাহ ধরে শীর্ষে থাকা সাবালেঙ্কাকে সরিয়েই এক নম্বর স্থানটি দখল করবেন তিনি।

রিবাকিনার ক্যারিয়ারে এখন গ্র্যান্ড স্ল্যামের তিনটি শিরোপা। ২০২২ সালে উইম্বলডন জয়ের পর গত জানুয়ারিতে অস্ট্রেলিয়ান ওপেনে দ্বিতীয় বড় শিরোপা জেতেন তিনি। এবার নিউইয়র্কে তৃতীয়টি যোগ হলো। ক্যারিয়ার গ্র্যান্ড স্ল্যাম পূর্ণ করতে এখন শুধু ফ্রেঞ্চ ওপেনের শিরোপাটিই বাকি।

ফ্রেঞ্চ ওপেনে এখনো কোয়ার্টার ফাইনালের বেশি এগোতে পারেননি রিবাকিনা। তবে মাটির কোর্টে ২০২৩ সালে রোমে ডব্লিউটিএ এক হাজারের শিরোপা জিতেছিলেন তিনি। সাবেক ব্রিটিশ এক নম্বর লরা রবসনের মতে, রিবাকিনা সব ধরনের কোর্টেই কার্যকর একজন খেলোয়াড়। বিশেষ করে দ্রুতগতির কোর্টে তার সার্ভ ও রিটার্ন যখন ঠিকঠাক থাকে, তখন তাকে থামানো প্রায় অসম্ভব।

রবসন বলেন, রিবাকিনা আরও অনেক গ্র্যান্ড স্ল্যাম জিতবেন বলে তিনি মনে করেন। কারণ তার সার্ভ ও রিটার্ন যখন সেরা অবস্থায় থাকে, তখন শক্ত কোর্টে তাকে হারানোর মতো খেলোয়াড় খুঁজে পাওয়া কঠিন। সূত্র: বিবিসি