হেজহগ শুধু নাক ডাকা বা গুঙিয়ে শব্দ করেই যোগাযোগ করে—এমন ধারণা দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত। তবে নতুন এক গবেষণা বলছে, এই ছোট্ট কাঁটাওয়ালা প্রাণীটি হয়তো এমন সব উচ্চতর শব্দে যোগাযোগ করে, যা মানুষের কানে ধরা পড়ে না।
বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, হেজহগ মানুষের তুলনায় অনেক বেশি উচ্চ ফ্রিকোয়েন্সির শব্দ শুনতে পারে। ফলে তারা এমন শব্দ ব্যবহার করে একে অপরের সঙ্গে সংকেত আদান–প্রদান করতে পারে, যা মানুষের শ্রবণসীমার বাইরে।
এই গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছেন সোফি রাসমুসেন। তিনি বর্তমানে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়–এর সঙ্গে যুক্ত। তার মতে, এই আবিষ্কার ইউরোপজুড়ে দ্রুত কমে যাওয়া হেজহগ সংরক্ষণে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, হেজহগ প্রায় ৮৫ কিলোহার্টজ পর্যন্ত উচ্চ ফ্রিকোয়েন্সির শব্দ শুনতে সক্ষম। তুলনায় মানুষ সাধারণত সর্বোচ্চ ২০ কিলোহার্টজ পর্যন্ত শব্দ শুনতে পারে। কুকুর প্রায় ৪৫ কিলোহার্টজ এবং বিড়াল প্রায় ৬৫ কিলোহার্টজ পর্যন্ত শব্দ শুনতে পারে।
গবেষণার অংশ হিসেবে উদ্ধারকেন্দ্রে থাকা কয়েকটি হেজহগকে অজ্ঞান অবস্থায় বিভিন্ন ধরনের পালস ও বিপ শব্দ শোনানো হয়। এরপর বিজ্ঞানীরা তাদের মস্তিষ্কের প্রতিক্রিয়া পরিমাপ করে নির্ণয় করেন, কোন ফ্রিকোয়েন্সির শব্দ তারা শুনতে পারে।
পরবর্তীতে বিজ্ঞানীরা হেজহগের কানের একটি ত্রিমাত্রিক মডেল তৈরি করেন। এতে দেখা যায়, তাদের কানের ভেতরে শক্ত হাড়ের একটি বিশেষ শৃঙ্খল রয়েছে, যা উচ্চ স্বরের শব্দ সহজে ভেতরে পৌঁছাতে সাহায্য করে। এই প্রক্রিয়াটি অনেকটা বাদুড়ের ইকোলোকেশন ব্যবস্থার মতো কাজ করে।
গবেষকদের মতে, এই তথ্য ভবিষ্যতে হেজহগ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে এমন শব্দভিত্তিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরি করা সম্ভব হতে পারে, যা মানুষ বা পোষা প্রাণীকে বিরক্ত না করে হেজহগকে বিপজ্জনক যন্ত্র থেকে দূরে রাখবে।
প্রতি বছর যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে হাজার হাজার হেজহগ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়। এ কারণে প্রাণীটি এখন আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘ–এর তালিকায় প্রায় বিপন্ন প্রজাতি হিসেবে বিবেচিত।
গবেষকরা মনে করছেন, ভবিষ্যতে এমন শব্দযন্ত্র তৈরি করা যেতে পারে যা গাড়ি, ঘাস কাটার যন্ত্র বা স্ট্রিমারের কাছ থেকে হেজহগকে দূরে রাখবে। ইতোমধ্যে কিছু গাড়িতে হরিণের মতো বড় প্রাণী দূরে রাখতে আল্ট্রাসোনিক ডিভাইস ব্যবহারের নজির রয়েছে।
তবে গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, এই প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হলে আরও গবেষণা প্রয়োজন। কারণ এমন শব্দ তৈরি করা জরুরি যা হেজহগকে বিপদ থেকে দূরে রাখবে, কিন্তু তাদের স্বাভাবিক বাসস্থান—বিশেষ করে মানুষের বাগান—থেকে দূরে সরিয়ে দেবে না।
গবেষক রাসমুসেনের মতে, এই গবেষণা হেজহগের অদৃশ্য শব্দজগত সম্পর্কে নতুন ধারণা দিয়েছে। তার কথায়, 'হয়তো হেজহগরা একে অপরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় শুধু গন্ধ নয়, এমন শব্দেও কথা বলছে—যা আমরা কখনোই শুনতে পাই না।' সূত্র: বিবিসি