মানুষ যখন নিজের সুখ, নিজের স্বার্থ আর নিজের ভালো থাকা নিয়েই ব্যস্ত তখন এক যুবক নাকি টানা দুই বছর ধরে খাবার জুগিয়ে যাচ্ছেন পিঁপড়েদের। না এটি কোন সিনেমার গল্প নয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এক ব্যতিক্রমী ভিডিও ঘিরেই তৈরি হয়েছে এমন আলোচনা। কথিত আছে একটি নির্দিষ্ট পিঁপড়ার কলোনিতে নিজের পকেটের টাকা খরচ করে নিয়মিত চিনি ঢেলে দেন ওই যুবক। যেন ক্ষুদ্র প্রাণীগুলো খাবারের অভাবে বিপাকে না পড়ে।
ভাবুন তো মানুষের ব্যস্ত এই পৃথিবীতে যেখানে সামান্য সাহায্য করতেও অনেকে ১০ বার ভাবেন। সেখানে ক্ষুদ্র পিপলাদের জন্য এমন উদ্যোগ সত্যিই বিশ্বয়কর। কিন্তু গল্পের এখানেই শেষ নয়। এই চিনিকে কেন্দ্র করেই সামনে এসেছে আরো একটি চমকপ্রদ প্রশ্ন।
বিনামূল্যে খাবার পেতে থাকলে একটি পিঁপড়ার কলোনিতে কি ধরনের পরিবর্তন ঘটতে পারে?
সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল ভিডিওটিতে পিঁপড়ার কলোনিতে বিপুল পরিমাণ চিনি ঢেলে দিতে দেখা যায়। এরপরের ৩০ দিনের পরিবর্তন টাইমল্যাপস ফুটেজের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। পিপড়ারা কিভাবে খাবার সংগ্রহ করছে, কিভাবে একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করছে কিংবা অতিরিক্ত খাবারের উপস্থিতিতে তাদের চলাচল ও আচরণে কোন পরিবর্তন হচ্ছে কিনা। এসব বিষয় দর্শকদের কৌতুহলের কেন্দ্রে। কারণ পিপড়া শুধু ক্ষুদ্র একটি প্রাণী নয় তাদের রয়েছে জটিল সামাজিক কাঠামো, শ্রম বিভাজন এবং খাবার খুঁজে বের করে কলোনিতে ফিরিয়ে আনার অসাধারণ ক্ষমতা। তবে টানা দুই বছর চিনি দেওয়ার দাবি এবং ভিডিও পর্যবেক্ষণ এই দুটি বিষয় এক নয়। ভিডিওটির পূর্ণ প্রেক্ষাপট, পরীক্ষার সমকাল এবং পর্যবেক্ষণের নির্ভরযোগ্য তথ্য যাচাই না করে ঘটনাটির সব দাবি নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
এবার আসা যাক সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্নে
ভিডিওটিকে ঘিরে কেউ কেউ দাবি করছেন পিঁপড়ার কলোনিতে বিনামূল্যে খাবার দেওয়ার ফলাফল নাকি সমাজতন্ত্রের ব্যর্থতা বুঝিয়ে দেয়। কিন্তু সত্যি কি একটি পিঁপড়ার কলোনির আচরণ দিয়ে মানুষের অর্থনীতি ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার সাফল্য ব্যর্থতা নির্ধারণ করা যায়? বৈজ্ঞানিকভাবে এর উত্তর না এত সহজে নয়।
সমাজতন্ত্র পুঁজিবাদ কিংবা কল্যাণমূলক অর্থনীতির মত ব্যবস্থার সঙ্গে পিঁপড়ার আচরণের সরাসরি তুলনা করতে হলে মানুষের সমাজের জটিল বাস্তবতা উৎপাদন সম্পদের বন্টন প্রণোদনা এবং রাষ্ট্রীয় নীতির মত বিষয় বিবেচনায় নিতে হয়। পিপড়ার কলোনিতে অতিরিক্ত চিনি দিলে খাবারের জন্য তাদের আগমন বাড়তে পারে। অন্য প্রাণীও আকৃষ্ট হতে পারে। এমনকি পরিবেশ ও কলোনির স্বাভাবিক আচরণেও পরিবর্তন আসতে পারে।
সবশেষে এই ঘটনাটি আমাদের সামনে দুটি ভিন্ন ভাবনার দরজা খুলে দেয়। একদিকে রয়েছে ক্ষুদ্র প্রাণীর প্রতি যত্ন দেখানোর ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। অন্যদিকে রয়েছে বিনামূল্যে সম্পদ বিতরণ এবং তার সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে বিতর্ক।
মানুষের জীবনে যেমন সহায়তা, সহযোগিতা ও সম্পদের সুষম বন্টন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি প্রকৃতির প্রতিটি প্রাণীর নিজস্ব জীবনচক্র ও পরিবেশগত ভারসাম্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে পিপড়াদের সাহায্য করতে গিয়ে অতিরিক্ত চিনি ছড়িয়ে দেওয়া সব পরিস্থিতিতে পরিবেশের জন্য উপকারী হবে এমন নিশ্চয়তা নেই। তাই বন্যপ্রাণী বা ক্ষুদ্র প্রাণীদের সহায়তা করতে চাইলে তাদের স্বাভাবিক আবাসস্থল ও পরিবেশের কথা বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।