ভূত, কঙ্কাল, ডাইনি ও নানা ভৌতিক সাজে সজ্জিত হওয়া, কুমড়ো কেটে তাতে মুখ তৈরি করা এবং শিশুদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে মিষ্টি সংগ্রহ—এসব আয়োজনের মধ্য দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উদ্যাপিত হয় হ্যালোইন। প্রতিবছর ৩১ অক্টোবর পালিত হয় উৎসবটি। ২০২৬ সালে হ্যালোইন পড়েছে শনিবার।
বর্তমানে হ্যালোইন আনন্দ, পোশাক, সাজসজ্জা ও মিষ্টি বিনিময়ের উৎসব হিসেবে পরিচিত হলেও এর ইতিহাস বহু পুরোনো। ধারণা করা হয়, প্রায় দুই হাজার বছর আগে ইউরোপের প্রাচীন কেল্টিক জনগোষ্ঠীর সাওইন (Samhain) উৎসবের সঙ্গে হ্যালোইনের ঐতিহাসিক যোগসূত্র রয়েছে।
প্রাচীন কেল্টরা আয়ারল্যান্ড, যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চল এবং ইউরোপের অন্য কিছু এলাকায় বসবাস করত। তাদের কাছে নভেম্বরের শুরু ছিল নতুন বছরের সূচনা এবং ফসল কাটার মৌসুমের সমাপ্তির সময়। এর পরপরই শুরু হতো শীতকাল। ঋতু পরিবর্তনের এই সময়কে ঘিরে তাদের নানা ধর্মীয় বিশ্বাস ও আচার প্রচলিত ছিল।
কেল্টদের বিশ্বাস ছিল, সাওইন উৎসবের সময় জীবিত মানুষ ও মৃতদের জগতের মধ্যকার সীমারেখা দুর্বল হয়ে যায়। ফলে মৃতদের আত্মা পৃথিবীতে ফিরে আসতে পারে। এই বিশ্বাস থেকেই উৎসবের রাতে বড় অগ্নিকুণ্ড জ্বালানো, বিশেষ পোশাক পরা এবং নানা আচার পালনের রীতি গড়ে ওঠে। তবে এসব ছিল প্রাচীন জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় বিশ্বাস ও লোকাচারের অংশ।
খ্রিস্টীয় ঐতিহ্যের প্রভাব
সময়ের সঙ্গে হ্যালোইনের ঐতিহ্যে খ্রিষ্টীয় ধর্মীয় রীতির প্রভাব যুক্ত হয়। খ্রিষ্টীয় বর্ষপঞ্জিতে ১ নভেম্বর পালিত হয় অল সেইন্টস ডে বা সব সাধুর দিবস। এর আগের সন্ধ্যা পরিচিত হয় অল হ্যালোজ ইভ নামে। সময়ের সঙ্গে এই নাম সংক্ষিপ্ত হয়ে ‘হ্যালোইন’ হয়েছে বলে মনে করা হয়। ২ নভেম্বর পালিত অল সোলস ডে-ও মৃতদের স্মরণ করার ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত।
মধ্যযুগে ইংল্যান্ড ও আয়ারল্যান্ডের কিছু এলাকায় অল সোলস ডে উপলক্ষে দরিদ্র মানুষ বাড়ি বাড়ি গিয়ে খাবার চাইতেন। বিনিময়ে তাঁরা বাড়ির মৃত স্বজনদের আত্মার শান্তির জন্য প্রার্থনা করার প্রতিশ্রুতি দিতেন। তাঁদের দেওয়া বিশেষ ধরনের পিঠা ‘সোল কেক’ নামে পরিচিত ছিল। পরবর্তী সময়ে শিশু-কিশোরদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে খাবার বা উপহার সংগ্রহের রীতির সঙ্গে এসব প্রথার যোগসূত্র তৈরি হয়। আধুনিক হ্যালোইনের ‘ট্রিক-অর-ট্রিট’ প্রথার বিকাশেও এমন ঐতিহ্যের প্রভাব রয়েছে বলে মনে করা হয়।
কুমড়োর বাতি ও ভৌতিক পোশাকের প্রচলন
হ্যালোইনের অন্যতম পরিচিত প্রতীক হলো ভেতর ফাঁপা করে মুখের আদলে কাটা কুমড়োর বাতি, যা ‘জ্যাক-ও-ল্যান্টার্ন’ নামে পরিচিত। এর শিকড় আয়ারল্যান্ডের লোককাহিনি ও শাকসবজিতে মুখ খোদাই করার ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। আগে শালগম বা অন্য সবজিতে মুখ খোদাই করে তার ভেতরে আলো জ্বালানোর চল ছিল। পরে উত্তর আমেরিকায় কুমড়ো সহজলভ্য হওয়ায় সেটিই বেশি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
ভৌতিক বা অদ্ভুত পোশাক পরার পেছনেও প্রাচীন লোকবিশ্বাসের প্রভাব রয়েছে। একসময় মানুষ মনে করত, উৎসবের রাতে আত্মারা পৃথিবীতে ফিরে আসতে পারে। তাই তাদের নজর এড়াতে বা ভয় দূরে রাখতে মানুষ ছদ্মবেশ ধারণ করত বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। বর্তমানে সেই রীতি বদলে আনন্দ, সৃজনশীলতা ও বিনোদনের অংশ হয়ে উঠেছে।
যুক্তরাষ্ট্রে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে হ্যালোইন
উনিশ শতকে ইউরোপ থেকে, বিশেষ করে আয়ারল্যান্ড থেকে বিপুলসংখ্যক অভিবাসী উত্তর আমেরিকায় যাওয়ার পর হ্যালোইনের প্রচলন আরও বিস্তৃত হয়। ১৮৪০-এর দশকের আলু-দুর্ভিক্ষের সময় আয়ারল্যান্ড ছেড়ে যাওয়া অনেক মানুষ নিজেদের উৎসব ও লোকাচারও সঙ্গে নিয়ে যান। ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্রে হ্যালোইন ঘিরে সামাজিক অনুষ্ঠান, পোশাক প্রতিযোগিতা, কুমড়োর সাজসজ্জা এবং শিশুদের মিষ্টি সংগ্রহের রীতি জনপ্রিয় হয়।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে হ্যালোইন উদ্যাপন করা হয়। কোথাও এটি বড় সামাজিক উৎসব, কোথাও আবার মূলত শিশু-কিশোরদের আনন্দ আয়োজন। বাড়িঘর সাজানো, ভৌতিক পোশাক পরা, কুমড়োর বাতি তৈরি, মিষ্টি বিনিময় এবং বিশেষ অনুষ্ঠান আয়োজন এর পরিচিত অনুষঙ্গ।
প্রাচীন কেল্টিক বিশ্বাস থেকে শুরু করে খ্রিষ্টীয় ঐতিহ্য এবং ইউরোপীয় অভিবাসীদের হাত ধরে উত্তর আমেরিকায় বিস্তার—দীর্ঘ সময়ের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে হ্যালোইন আজকের রূপ পেয়েছে। এর বর্তমান আয়োজনের সঙ্গে প্রাচীন বিশ্বাসের সরাসরি সম্পর্ক সব ক্ষেত্রে স্পষ্ট নয়; বরং ইতিহাস, লোককথা ও আধুনিক বিনোদনের নানা ধারা মিলেই গড়ে উঠেছে এই উৎসবের পরিচিত রূপ।