মাত্র ২৩৫ মিলিসেকেন্ডেই সিদ্ধান্ত নেয় কাক!

দৃষ্টিসংকেত বিশ্লেষণ করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে কাক মানুষের চেয়েও এগিয়ে। নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, কাক মাত্র ২৩৫ মিলিসেকেন্ডে কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। অর্থাৎ এক সেকেন্ডের চার ভাগের এক ভাগ সময়েরও কম সময়ে তারা সিদ্ধান্তে পৌঁছে যায়।

বিজ্ঞানবিষয়ক সংবাদমাধ্যম ফিজ ডট অর্গের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জার্মানির টিউবিনজেন বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই স্নায়ুবিজ্ঞানী ফিলিপ শ্মিডবাউয়ার ও আন্দ্রেয়াস নিডার এ গবেষণা পরিচালনা করেন। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী সায়েন্স-এ।

গবেষণার সারাংশে বলা হয়েছে, একসময় পাখির মস্তিষ্ককে স্তন্যপায়ী প্রাণীর মস্তিষ্কের তুলনায় কম উন্নত বলে বিবেচনা করা হতো। কিন্তু গঠনগত পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও পাখির মস্তিষ্ক উচ্চপর্যায়ের জ্ঞানীয় কার্যক্রম সম্পাদন করতে পারে, এমন প্রমাণ ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে।

গবেষকদের মতে, দৃশ্যমান সংকেতের ভিত্তিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে পাখিদের ওপর প্রবল বিবর্তনীয় চাপ রয়েছে। কারণ, উড়ার সময় দ্রুত চলাচল, বাধা এড়িয়ে চলা এবং তাৎক্ষণিকভাবে খাবার শনাক্ত করার জন্য তাদের দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।

টাচস্ক্রিনে পরীক্ষা, সঠিক উত্তরে মিলেছে খাবার

গবেষণায় দুটি কারিয়ন কাকের (Corvus corone) সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা পরীক্ষা করা হয়। এ জন্য কাক দুটিকে একটি টাচস্ক্রিনে চলমান বিন্দু দেখানো হয়। বিন্দুগুলো কোন দিকে যাচ্ছে, তা শনাক্ত করে সঠিক দিক নির্বাচন করতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। সঠিক উত্তর দিতে পারলে পুরস্কার হিসেবে তাদের খাবার হিসেবে মিলত মিলওয়ার্ম বা একধরনের পোকা।

crow

গবেষণায় দেখা যায়, চলাচলের ধরন শনাক্ত করা কঠিন হলেও কাকের সিদ্ধান্ত দৈবচয়নের চেয়ে অনেক বেশি নির্ভুল ছিল। গবেষক শ্মিডবাউয়ারের ভাষ্য অনুযায়ী, সংকেত স্পষ্ট থাকলে কাকের সিদ্ধান্তের নির্ভুলতা প্রায় ১০০ শতাংশে পৌঁছায়।

পরীক্ষায় কাক গড়ে মাত্র ২৩৫ মিলিসেকেন্ডে সিদ্ধান্ত নেয়। এ ক্ষেত্রে মানুষ ও বানরের তুলনায় তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি প্রায় দ্বিগুণ বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

এমনকি চলমান বিন্দুর সঙ্গে বিভ্রান্তিকর অতিরিক্ত বিন্দু যুক্ত করে পরীক্ষাটি কঠিন করা হলেও কাক অনুমাননির্ভর উত্তর না দিয়ে নির্ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা দেখিয়েছে।

মস্তিষ্কের বিশেষ স্নায়ুকোষের ভূমিকা

গবেষক আন্দ্রেয়াস নিডারের মতে, এই ফলাফল প্রমাণ করে যে পাখির মস্তিষ্কের স্নায়বিক কার্যক্রম মানুষ ও অন্যান্য প্রাইমেটের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বীকৃত মডেলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

গবেষণায় কাকের মস্তিষ্কের প্যালিয়াল এন্ডব্রেইন অংশের স্নায়ুকোষের কার্যক্রমও বিশ্লেষণ করা হয়। দেখা যায়, কোনো দৃশ্যমান সংকেত উপস্থাপনের প্রায় ৭০ মিলিসেকেন্ডের মধ্যেই দিকনির্দেশক স্নায়ুকোষগুলো সম্ভাব্য সিদ্ধান্তের তথ্য সংকেতায়িত করতে শুরু করে। চূড়ান্ত প্রতিক্রিয়ার প্রায় ১৭০ মিলিসেকেন্ড আগেই এ কার্যক্রম দেখা যায়।

সংবেদন থেকে পাওয়া তথ্য যত বেশি স্পষ্ট হয়, স্নায়ুকোষের কার্যক্রমও তত শক্তিশালী হয় এবং সিদ্ধান্ত জানানোর সময় তা একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে পৌঁছায়।

বিজ্ঞানীদের ধারণা, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার এই অসাধারণ ক্ষমতা বিবর্তনের ধারায় গড়ে উঠেছে। দ্রুত উড়তে গিয়ে নিরাপদে চলাচল, আশপাশের পরিস্থিতি শনাক্ত করা এবং মুহূর্তের মধ্যে খাবার খুঁজে পাওয়ার প্রয়োজনীয়তা কাকের মস্তিষ্ককে এমন দক্ষ করে তুলেছে।

গবেষকদের মতে, পাখির মস্তিষ্কের এই দক্ষ সিদ্ধান্ত গ্রহণব্যবস্থা বিবর্তনের মাধ্যমে গড়ে ওঠা দ্রুত দৃশ্য-নির্ভর চলাচল নিয়ন্ত্রণের এক উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।

সূত্র: ফিজ ডট অর্গ