রাসেলস ভাইপার কেন এতো ভয়ংকর?

দুনিয়ার বিষধর সাপ গুলোর মধ্যে এই রাসেলস ভাইপার অন্যতম। বাংলায় যাকে 'চন্দ্রবোড়া সাপ' নামে গ্রামে অনেকেই চেনেন। এই সাপের দংশনে ২ ঘন্টার মধ্যে এন্টিভেনোম দিতে না পারলে আক্রান্ত ব্যক্তির মৃত্যু নিশ্চিত।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) ২০১৮ সালের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় ৫৪ লাখ মানুষ সাপের দংশনে দংশিত হয়, যার মধ্যে প্রতি বছর অন্তত এক লাখ মানুষ মারা যায়! এর মধ্যে ৩০-৪০% মৃত্যুর জন্যে রাসেলস ভাইপার সাপ দায়ী।

এই সাপের দংশনে আহত হয়ে বছরে প্রায় ৪ লাখ মানুষের অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হয় অথবা পঙ্গুত্ব বরণ করেন।

আশার কথা হলো ভারতের Haffkine Institute এ তৈরি এন্টিভেনোম (polyvalent antivenom) ২ ঘন্টার মধ্যে আক্রান্ত ব্যক্তিকে দিতে পারলে আক্রান্ত ব্যক্তির জীবন বাঁচানো সম্ভব। 

রাসেলস ভাইপারের ইতিহাস

চন্দ্রবোড়া সাপ পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের দুর্লভ সাপ। এটি পশ্চিমবঙ্গের বেশিরভাগ জেলায়, বিশেষ করে নদীয়া, বর্ধমান, উত্তর চব্বিশ পরগনা ও বাঁকুড়া জেলার গ্রাম অঞ্চলে ভয়ের অন্যতম কারণ। আগে শুধুমাত্র বাংলাদেশের রাজশাহী অঞ্চলে এ সাপ দেখা যেত। 

২০১৮ সালের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণা বলছে, দেশে বিলুপ্ত প্রায় সাপগুলোর মধ্যে একটি এই রাসেলস ভাইপার। মাত্র ১৭ টি জেলায় তখন এই সাপের অস্তিত্ব পাওয়া যেত। কিন্তু বর্তমানে এই সাপ দেশে প্রায় ২৫ টির অধিক জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে।

কেন এই সাপের কামড়ে মানুষ মারা যায়?

একটি চন্দ্রবোড়া সাপ এক ছোবলে বেশ খানিকটা বিষ ঢালতে পারে। পূর্ণবয়স্ক সাপের ক্ষেত্রে বিষের পরিমাণ ১৩০-২৫০ মিলিগ্রাম। যা কিনা একজন মানুষের মৃত্যুর জন্যে যথেষ্ট। চন্দ্রবোড়ার বিষ হেমোটক্সিক, অর্থাৎ কামড় দিলে লোহিত রক্তকণিকা ধ্বংস হয়, রক্ত জমাট বাঁধতে পারে না, ও বিভিন্ন অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চন্দ্রবোড়ার বিষ ফুসফুস, কিডনি নষ্ট করে দেওয়ার মতো বিভিন্ন জটিলতা তৈরি করে। চন্দ্রবোড়া সাপের কামড়ে পাঁচ মিনিটের মধ্যে ক্ষতস্থান ফুলে যায়।

রাসেলস ভাইপার কখন ও কেন কামড়ায়?

অন্যান্য সাপের মতোই চন্দ্রবোড়াও সাধারণত মানুষকে এড়িয়েই চলে, কিন্তু লোকালয়ের কাছাকাছি ক্ষেতে কিংবা ঘাসজমিতে, কিংবা অনেক সময় ইঁদুর শিকার করতে লোকালয়ে ঢুকে পড়ার ফলে মানুষের সঙ্গে এর সংঘাত প্রতিনিয়ত বেড়ে চলেছে। এরা প্রচণ্ড জোরে হিস হিস শব্দ করতে পারে। চন্দ্রবোড়া দিনে ও রাতে উভয় সময়ে কামড়ায়।

দুনিয়াতে প্রতিবছরই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ কেবল এই সাপটির কামড়েই প্রাণ হারান। আক্রমণের ক্ষিপ্র গতি ও বিষের তীব্রতার কারণে ‘কিলিংমেশিন’ হিসেবে বদনাম রয়েছে সাপটির। তবে "মানুষকে তেড়ে এসে কামড়ায়" এ কথা গুজব মাত্র। এরা মূলত ambush predator, তাই এক জায়গায় চুপ করে পড়ে থাকে। তাকে ডিস্টার্ব না করলে সেও আপনাকে ডিস্টার্ব করবে না।

হঠাৎ এই বিষধর রাসেলস ভাইপার সাপ ছড়িয়ে পড়ার কারণ কী?

এটা নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে অথেনটিক কোনো গবেষণা নেই। জার্নাল অব দি এশিয়াটিক সোসাইাটি, বাংলাদেশে ২০১৮ সালে এই সাপ নিয়ে গবেষণা করেছিল। তখন মাত্র ১৭ টি জেলায় রাসেলস ভাইপারের উপস্থিতি পাওয়া যায়! 

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ফরিদ আহসানের গবেষণায় এসেছে 'আগে কৃষিজমিতে বছরে একবার বা দুইবার ফসল ফলানো হতো এবং বাকি সময় পানির অভাব থাকায় জমি পরিত্যক্ত পড়ে থাকতো। বর্তমানে সেচ সুবিধার কল্যাণে কৃষকরা বছরে দুই থেকে তিনটি ফসল ফলাতে পারেন। সারা বছর ক্ষেতে ফসল থাকায় জমিতে ইঁদুরের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে শুরু করে, যা এই রাসেলস ভাইপার সাপের প্রধান খাদ্য। ইঁদুর বাড়ার সাথে সাথে সাপ পর্যাপ্ত খাদ্য পেতে শুরু করে এবং বংশবিস্তারের জন্য যথাযথ পরিবেশ পেতে থাকে।

তবে ছড়িয়ে পড়া মানেই আতঙ্ক কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়া। দেশের কৃষিনির্ভর জেলাগুলোর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স গুলোর সবখানে পর্যাপ্ত এন্টিভেনোম নেই যা দিয়ে রাসেলস ভাইপার সাপের কামড়ে আক্রান্ত রোগীকে দ্রুত চিকিৎসা দেয়া যাবে।

কৃষি জমিয়ে ইঁদুরের বিস্তার অনেক। রাসেলস ভাইপারের প্রিয় খাবার এই ইঁদুর। তাই এই সাপ ছড়িয়ে পরলে আগে আতঙ্ক ছড়াবে কৃষকদের অন্তরে। কয়েকজন কৃষক আক্রান্ত হলে আতঙ্ক কয়েকশত গুণ বেড়ে যাবে। তাতেই কৃষক মাঠে যাবে না। কেবল একটা মৌসুমে রাসেলস ভাইপার সাপের আতঙ্ক ফসলের উৎপাদন এর মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। কারণ, মনে রাখা লাগবে কৃষক বাঁচলেই দেশের অর্থনীতি বাঁচবে। কৃষক সাপের আতঙ্কে যদি দুই-তিন মাস ও ভরা মৌসুমে ফসলী জমি এড়িয়ে যায় তাতেই দেশে অর্থনীতিতে আঘাত আসতে বাধ্য। 

---

ডা: মো: মিজানুর রহমান, 
এমবিবিএস, এমপিএইচ,
গবেষণা সহকারী ও জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষক