অবহেলিত প্রাণীর জন্য শহরে এলো আশার গাড়ি

রাজধানী ঢাকার ব্যস্ততম বসুন্ধরা এলাকায় একটি নির্মাণাধীন ভবনের নিচে অসুস্থ অবস্থায় পড়ে থাকা এক পথকুকুরকে উদ্ধার করে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে বাংলাদেশ অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের (Bangladesh Animal Welfare Association - BAWA) নবপ্রবর্তিত প্রাণী অ্যাম্বুলেন্স সেবা। দ্রুত খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে আসে অ্যাম্বুলেন্সটি এবং কুকুরটিকে উদ্ধার করে বনানীর একটি প্রাণী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।

প্রাণীদের জন্য একটি সম্পূর্ণ অ্যাম্বুলেন্স সেবার কথা শুনে অনেকেই হয়তো বিস্মিত হচ্ছেন। তবে এটিই বাস্তবতা। বাংলাদেশ অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন একটি অ্যাম্বুলেন্সের মাধ্যমে এই অভিনব এবং অত্যন্ত প্রয়োজনীয় সেবা চালু করেছে। এই মানবিক উদ্যোগটি প্রাণীপ্রেমীদের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।

কুকুরটিকে উদ্ধারকারী প্রত্যক্ষদর্শী জানান, হঠাৎ দেখি কুকুরটা মাথা ঘুরে পড়ে আছে। পরে আমার মাথায় কোনো কাজ করছিল না। খোঁজ নিয়ে জানলাম পূজার ছুটির কারণে অধিকাংশ ভেটেরিনারি হসপিটাল বন্ধ। হঠাৎ শুনলাম যে অ্যানিমেল কেয়ার খোলা আছে। তখন মনে পড়ল ফেসবুকে দেখা প্রাণী অ্যাম্বুলেন্সের কথা। ছবিতে থাকা নম্বরে ফোন দিতেই তারা দ্রুত এসে কুকুরটিকে নিয়ে যায়। প্রায় চার বছর ধরে পশু নিয়ে কাজ করছি, কিন্তু কখনো কোনো আহত প্রাণীকে অ্যাম্বুলেন্সে নিতে পারিনি। এ অভিজ্ঞতা আমার কাছে মানুষের চাঁদে পা রাখার মতোই লাগলো।

প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা ৫টা পর্যন্ত এই অ্যাম্বুলেন্সটি প্রাণীদের জন্য বিনামূল্যে সেবা দিচ্ছে। এই সেবার জন্য কোনো অর্থ দিতে হচ্ছে না।

BAWA-এর একজন স্বেচ্ছাসেবক জানান, রাস্তায় যদি কোনো প্রাণী এক্সিডেন্ট বা অসুস্থ অবস্থায় পড়ে থাকে, আমাদের দেওয়া নাম্বারে ফোন করলে আমরা দ্রুত গিয়ে উদ্ধার করি ও হাসপাতালে নিয়ে যাই। এই সেবাটি চালু হওয়ার মাত্র চার দিনের মধ্যেই প্রতিদিন প্রায় ১৫ থেকে ২০টি করে কল আসছে এবং আমরা ১৫-২০টি প্রাণীকে সেবা দিতে সক্ষম হয়েছি।

বাংলাদেশ অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এটি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের উপহারে চালু করা হয়েছে। আমরা এটার সম্পূর্ণ ফ্রি সার্ভিস দিচ্ছি। যারা এটাতে অসুস্থ বা দুর্বল প্রাণী পরিবহন করবেন, তাদের জন্য এটা সম্পূর্ণভাবে ফ্রি। কিন্তু কোনো ধনাঢ্য ব্যক্তি, কোনো প্রাণী পালক যদি এটার জ্বালানি খরচ দিতে চান, সেক্ষেত্রে আমরা না করবো না। সবার জন্য এটাকে উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। আপাতত আমরা এটা ঢাকা শহরের জন্য করেছি। পর্যায়ক্রমে পুরো ঢাকা জেলা, এরপরে ঢাকা বিভাগ, তারপরে বাংলাদেশের আরও যে বিভাগগুলো আছে, সেই বিভাগীয় শহরগুলোতে চালু করার চেষ্টা করবো। পর্যায়ক্রমে সারা দেশে এটার কার্যক্রম চলবে।

শুধু অ্যাম্বুলেন্স সেবাই নয়, BAWA পথের প্রাণীদের বিনামূল্যে চিকিৎসা দিতে একটি হাসপাতালও প্রতিষ্ঠা করতে যাচ্ছে। এই উদ্যোগের উদ্যোক্তা আদনান আজাদ জানান, যে পথপ্রাণীগুলো রাস্তা পার হতে গেলে এক্সিডেন্ট করতো অনেক মানুষ এগুলো তাকিয়ে দেখতো, অনেকেই ভাবতো যে আমি কিভাবে এই প্রাণীটাকে হাসপাতালে নিয়ে যাবো। অনেকের ইচ্ছা থাকলেও তারা হয়তোবা এটা নিয়ে যাওয়ার সাহস পেতো না। এখন আমরা যেহেতু একটা ফ্রি অ্যাম্বুলেন্স দিয়েছি বাংলাদেশ অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে, এখন মানুষ আমাদের ফোন করছে। ফোন করার পরে তৎক্ষণাৎ আমাদের অ্যাম্বুলেন্স সেখানে চলে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে যে প্রাণীগুলো অকালেই মারা যেতো, সেই প্রাণীগুলো কিন্তু এখনো বেঁচে থাকছে। একটা ফ্রি ক্লিনিক আমরা অচিরেই চালু করবো। হয়তো আগামী মাসের ভিতরে আমাদের কাজটা কমপ্লিট হয়ে যাবে। সর্বক্ষণিক চিকিৎসকের ব্যবস্থা থাকবে এবং ট্রিটমেন্ট সম্পূর্ণ ফ্রি থাকবে। এতে আর কারও কিছু না হোক যে প্রাণীগুলো আছে তারা এখান থেকে ব্যাপক উপকার পাবে।

যেকোনো প্রাণীর জন্য অ্যাম্বুলেন্স সেবা পেতে ০১৩৪৬ ৯৯০ ২৪৪ এই নাম্বারে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত যোগাযোগ করা যাবে বলে জানিয়েছে প্রাণীকুল কল্যাণ সংস্থাটি।

ব্যস্ত নগরজীবনে মানুষের সহাবস্থানে থাকা অসংখ্য প্রাণী চিকিৎসার অভাবে অবহেলায় মৃত্যুবরণ করে। এই বাস্তবতায় প্রাণীদের জন্য বিশেষায়িত অ্যাম্বুলেন্স চালু করে বাংলাদেশে মানবিকতার এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে BAWA। অনেকেই বলছেন এভাবেই গড়ে উঠবে প্রাণবান, মানবিক বাংলাদেশ।