দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত চামড়াশিল্প এখন চরম অস্তিত্ব সংকটে। একসময় কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে যে বিশাল অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞ চলত, তা এখন অনেকটাই স্থবির। তীব্র মূলধন সংকট এবং মধ্যস্বত্বভোগী সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যের কারণে ঈদের আগের দিনও কাঁচা চামড়ার বাজারে নেই কোনো চিরচেনা হাঁকডাক।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং চামড়াশিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, কোরবানির কাঁচা চামড়ার বাজারে ধস নামার পেছনে মূলত ৫টি বড় কারণ দায়ী। নিচে কারণগুলো বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. তীব্র তারল্য ও ব্যাংক ঋণ সংকট
কাঁচা চামড়া কেনার জন্য চামড়া ব্যবসায়ীদের কাছে পর্যাপ্ত নগদ টাকা নেই। গত কয়েক বছর ধরেই এ খাতে ব্যাংক ঋণ বিতরণের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে কমছে। এই খাতের অধিকাংশ ব্যবসায়ী খেলাপি হয়ে পড়ায় ব্যাংকগুলো নতুন করে ঋণ দিতে অনীহা প্রকাশ করছে। চলতি বছর চামড়া সংরক্ষণে ২২৮ কোটি টাকা ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও, খাত সংশ্লিষ্টদের ধারণা শেষ পর্যন্ত তা ১০০ কোটি টাকার নিচে নেমে আসবে।
২. সাভার চামড়া শিল্পনগরীর (বিসিক) ব্যর্থতা
হাজারীবাগ থেকে সাভারে ট্যানারি স্থানান্তরের পর থেকেই অধিকাংশ ট্যানারি লোকসানে চলছে। সাভারের ট্যানারিতে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) এখনো পরিপূর্ণভাবে কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাব এবং আন্তর্জাতিক পরিবেশগত সনদ (LWG) না থাকায় ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন।
৩. লবণ ও কেমিক্যালের বর্ধিত মূল্য
চামড়া সংরক্ষণের প্রধান উপাদান হলো লবণ এবং বিভিন্ন রাসায়নিক বা কেমিক্যাল। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বাজারে লবণ ও কেমিক্যালের দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের প্রাথমিক খরচ অনেক বেড়ে গেছে, যা বাজারের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
৪. মধ্যস্বত্বভোগী সিন্ডিকেটের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ
কাঁচা চামড়ার বাজারকে অস্থিতিশীল করার পেছনে বরাবরই মধ্যস্বত্বভোগী সিন্ডিকেটের বড় ভূমিকা থাকে। আড়তদাররা ট্যানারি মালিকদের কাছ থেকে সময়মতো বকেয়া টাকা না পাওয়ায়, তারা মৌসুমি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চামড়া কিনতে চান না। এই সুযোগে একটি নির্দিষ্ট সিন্ডিকেট নামমাত্র মূল্যে চামড়া কিনে বাজার নিয়ন্ত্রণ করে।
৫. মৌসুমি ব্যবসায়ীদের অজ্ঞতা
কোরবানির সময় বিপুল পরিমাণ অপেশাদার বা মৌসুমি ব্যবসায়ী চামড়া কেনাবেচায় যুক্ত হন। সঠিক সময়ে লবণ না দেওয়া এবং চামড়া ছাড়ানো ও সংরক্ষণের সঠিক নিয়ম না জানার কারণে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ চামড়া নষ্ট হয়। এই অজ্ঞতার কারণে তারা অনেক সময় কম দামে চামড়া বিক্রি করতে বাধ্য হন।
নির্ধারিত দাম বনাম বাস্তব চিত্র
বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, সরকার প্রতিবছরের মতো এবারও চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, গত বছর থেকে ২ টাকা বাড়িয়ে এ বছর গরুর কাঁচা চামড়ার দর ঢাকার ভিতরে প্রতি বর্গফুট ৬২ থেকে ৬৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি ঢাকার বাইরে গরুর কাঁচা চামড়ার প্রতি বর্গফুটের দাম ৫৭ থেকে ৬২ টাকা। এই হিসাবে গরুর চামড়ার দাম কমবেশি ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হওয়ার কথা। কয়েক বছর ধরে ৩ থেকে ৫০০ টাকার বেশি বিক্রি হচ্ছে না গরুর চামড়া।
অপরদিকে বকরির চামড়া কেউ কিনছেই না। বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশন দেশের কাঁচা চামড়া সংগ্রহ ও প্রাথমিক প্রক্রিয়াজাতকারী ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন।
বাস্তবতা: কাগজে-কলমে গরুর চামড়ার দাম হাজার টাকার ওপরে হওয়ার কথা থাকলেও, গত কয়েক বছর ধরে মাঠপর্যায়ে ৩ শ থেকে ৫ শ টাকার বেশি বিক্রি হচ্ছে না। আর বকরির চামড়া তো এখন কেউ ফ্রিতেও নিতে চাচ্ছে না।
বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের কঠোর অবস্থান
চামড়া খাতের সম্ভাব্য বিপর্যয় ও কারসাজি ঠেকাতে সরকারের পক্ষ থেকে এবার কঠোর হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় দেশের সব ডিসি, ইউএনও এবং পুলিশ প্রশাসনকে মাঠপর্যায়ে কঠোর নজরদারির নির্দেশ দিয়েছে। চামড়া যাতে সীমান্ত দিয়ে পাচার হতে না পারে, সেজন্য বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) টহল ও নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সিনিয়র সহসভাপতি মো. সাখাওয়াত উল্লাহ জানান, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো খেলাপি ঋণের অজুহাতে টাকা দিচ্ছে না। আড়তদার ও ট্যানারি মালিকদের এই অর্থসংকট দূর না হলে কোরবানির চামড়ার বাজারকে অস্থিরতার হাত থেকে রক্ষা করা কঠিন হবে।