রেমিট্যান্স প্রবাহ, বৈদেশিক ঋণ সহায়তা এবং উচ্চ সুদের হারের ওপর ভর করে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শেষে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৫১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু রিজার্ভ বাড়ালেই হবে না; এর পাশাপাশি বিনিয়োগ, শিল্প উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিও নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় অর্থনীতিতে এর ইতিবাচক প্রভাব সীমিত থাকবে।
এর আগে ২০২১ সালের ১ সেপ্টেম্বর দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪৮ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল, যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ। সে সময় রেমিট্যান্স প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল এবং আমদানি ব্যয় তুলনামূলক কম ছিল।
তবে ওই হিসাব আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের বিপিএম-৬ পদ্ধতি অনুযায়ী ছিল না। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারে রিজার্ভের মধ্যে সোনা, নগদ বৈদেশিক মুদ্রা, বন্ড, ট্রেজারি বিল, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলে সংরক্ষিত সম্পদ এবং বিশেষ ড্রইং অধিকার অন্তর্ভুক্ত থাকে।
বাংলাদেশ ব্যাংক নিজস্ব হিসাবে রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল, রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টির আওতায় দেওয়া কিছু অর্থ এবং কিছু কম রেটিংয়ের সিকিউরিটিজও যুক্ত করে থাকে। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে রিজার্ভের পরিমাণ আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় বেশি দেখা যায়।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এই হিসাব পদ্ধতি অনুসরণ করেও ৫১ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য অর্জন সহজ হবে না।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মানীয় ফেলো মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, রিজার্ভ বাড়াতে হলে রেমিট্যান্সের প্রবাহ শক্তিশালী রাখতে হবে এবং উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে বাজেট সহায়তার ঋণ নিশ্চিত করতে হবে।
তার মতে, সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো সরকার রিজার্ভ বৃদ্ধি নাকি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান, কোন খাতে বেশি গুরুত্ব দেবে। কারণ বিনিয়োগ বাড়লে শিল্পের কাঁচামাল ও মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি বাড়বে, যা রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে আমদানি বেড়েছে ৪ দশমিক ৫৫ শতাংশ। অন্যদিকে রপ্তানি আয় কমেছে ৪ দশমিক ৩৮ শতাংশ। তবে প্রথম ১০ মাসে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে ১৯ দশমিক ৫ শতাংশ।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, শুধু রিজার্ভের অঙ্ক বড় হওয়া অর্থনৈতিক সাফল্যের একমাত্র সূচক নয়। সাধারণ মানুষের জীবনমানে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে হলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির মাধ্যমে উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডও বাড়াতে হবে।
গত বছরের জুন শেষে দেশের রিজার্ভ ছিল ৩১ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার। চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে রিজার্ভ ৩৮ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। পরে সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে ৩২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার করা হয়।
২৩ মে পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৩৪ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ডলার। তবে বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে এর পরিমাণ ২৯ দশমিক ৯১ বিলিয়ন ডলার।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রেমিট্যান্স প্রবাহের ধারাবাহিক বৃদ্ধি, বিনিময় হার স্থিতিশীল থাকা এবং উচ্চ সুদের হার ভবিষ্যতে রিজার্ভ বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি আমদানির ব্যয় বাড়তে পারে, যা বৈদেশিক মুদ্রার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য আমদানি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৮ দশমিক ৮ শতাংশ, রপ্তানি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ৮ শতাংশ এবং রেমিট্যান্স বৃদ্ধির লক্ষ্য ১৫ শতাংশ।
চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে প্রতি মাসে গড়ে ৮৯ হাজার ৮৭০ জন কর্মী বিদেশে গেছেন। আগের অর্থবছরে এই সংখ্যা ছিল ৮৫ হাজার ৩৪০ জন। তবে ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে বিদেশগামী কর্মীর সংখ্যা কিছুটা কমেছে। সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, বৈশ্বিক সংঘাত পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে ভবিষ্যতে রেমিট্যান্স প্রবাহেও প্রভাব পড়তে পারে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, রেমিট্যান্স বৃদ্ধি, লেনদেন ভারসাম্যের উন্নতি, স্থিতিশীল বিনিময় হার এবং উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে ইতিবাচক আলোচনা রিজার্ভ বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে।
তিনি জানান, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সঙ্গে নতুন কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা ইতিবাচকভাবে এগোচ্ছে। আগের ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের কর্মসূচির পরিবর্তে ৫ থেকে ৬ বিলিয়ন ডলারের নতুন কর্মসূচি নিয়ে উভয় পক্ষ নীতিগতভাবে একমত হয়েছে।
তার মতে, আগামী অর্থবছরে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল থেকে এক বিলিয়ন ডলারের বেশি বাজেট সহায়তা পাওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি বিশ্বব্যাংক, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক এবং অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে আরও ২ থেকে ৩ বিলিয়ন ডলার সহায়তা আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে এসব ঋণ ভবিষ্যতে সুদ পরিশোধের চাপ এবং বৈদেশিক ঋণের বোঝা আরও বাড়াবে বলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন।