বাজেটর ঘাটতি পূরণে সরকার কোন পথে হাঁটবে?

রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন না থাকা সত্ত্বেও, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে উন্নয়ন ব্যয় এক লাফে ৫০ শতাংশ বাড়ানোর বড় চ্যালেঞ্জ হাতে নিচ্ছে সরকার।

আসন্ন বাজেটে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) জন্য ৩ লক্ষ কোটি টাকার বিশাল পরিকল্পনা করা হয়েছে। কিন্তু বিশাল এই ব্যয়ের বিপরীতে আয়ের খতিয়ান মেলাতে গিয়ে সরকারকে বড় ধরনের বাজেট ঘাটতির মুখে পড়তে হচ্ছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—এই বিশাল ঘাটতি বাজেট পূরণে সরকার আসলে কোন পথে হাঁটছে?

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তাবিত ৩ লক্ষ কোটি টাকার এডিপির বড় একটি অংশ আসবে ঋণ ও অনুদান থেকে। ব্যয়ের এই খতিয়ানকে সচল রাখতে সরকার মূলত দুটি উৎসের ওপর নির্ভর করছে:

সরকারি তহবিল: ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা (৬৩.৩৩ শতাংশ)।

বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান: ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা (৩৬.৬৭ শতাংশ)।

চলতি অর্থবছরের (২০২৫-২৬) মূল বাজেটে এডিপির আকার ছিল ২.৩০ লক্ষ কোটি টাকা, যা পরবর্তীতে বাস্তবায়ন সংকটের কারণে সংশোধিত বাজেটে ২ লক্ষ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়। সেই সংশোধিত বরাদ্দের তুলনায় আগামী অর্থবছরের উন্নয়ন বাজেট ৫০% বাড়ানো হচ্ছে, যা ঘাটতির চাপকে আরও ঘনীভূত করবে।

বরাদ্দে শীর্ষ ৫ মন্ত্রণালয়

  • নতুন এডিপিতে বরাদ্দের দিক থেকে সর্বোচ্চ বরাদ্দ পেয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। এই বিভাগের বরাদ্দ হলো ৩৩ হাজার ৭৩৫ কোটি টাকা।
  • দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ রাখা হয়েছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ। এ বিভাগের বরাদ্দ ৩০ হাজার ৭৪১ কোটি টাকা।
  • তৃতীয় স্থানে থাকা স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে বরাদ্দ ২৬ হাজার ৮০৬ কোটি টাকা।
  • এরপরে চতুর্থ স্থানে থাকা মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২০ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকা।
  • পঞ্চম সর্বোচ্চ বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে, বরাদ্দ ১৯ হাজার ৪৪১ কোটি টাকা।

সরকার বিশাল অংকের এডিপি পরিকল্পনা করলেও মাঠপর্যায়ে তা বাস্তবায়নের হার ক্রমাগত কমছে, যা অর্থায়নের অপচয় ও ঘাটতি ব্যবস্থাপনাকে আরও জটিল করে তুলছে।

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ৬৩ হাজার ৩২৭ কোটি টাকা। সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (RADP) আকার অনুযায়ী এটি মোট বরাদ্দের ৩০.৩১ শতাংশ। 

কোন পথে হাঁটছে সরকার?

পরিকল্পনা কমিশন ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঘাটতি সামাল দিতে এবং এডিপি বাস্তবায়নের গুণগত মান বাড়াতে সরকার এবার শুধু বরাদ্দের দিকেই তাকাচ্ছে না, বরং কিছু কৌশলগত পদক্ষেপ নিচ্ছে:

প্রকল্প ঋণ ও বৈদেশিক অর্থায়নের সর্বোচ্চ ব্যবহার: অভ্যন্তরীণ উৎসের ওপর চাপ কমাতে ১.১০ লক্ষ কোটি টাকার বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান সময়মতো ছাড় ও ব্যবহারের ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে।

সম্ভাব্যতা সমীক্ষা বাধ্যতামূলক করা: যেকোনো বড় প্রকল্প অনুমোদনের আগে কঠোরভাবে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা নিশ্চিত করা হবে, যাতে মাঝপথে প্রকল্প ঝুলে না যায়।

সক্ষমতা ও পর্যবেক্ষণ বৃদ্ধি: প্রকল্প পরিচালকদের দক্ষতা বৃদ্ধি, আর্থিক ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং বাজেট বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

বিশাল এই ঘাটতি মেটাতে সরকার যদি শেষ পর্যন্ত বৈদেশিক ঋণের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে না পারে, তবে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে অভ্যন্তরীণ ঋণ নেওয়ার প্রবণতা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে—যা সামগ্রিক অর্থনীতিতে নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।