জুলাই থেকে ‘বাংলা কিউআর’ ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা হবে: গভর্নর

তারল্য বা লিকুইডিটি নিয়ে আমি কোনো বড় সমস্যা দেখছি না। মানুষ নিশ্চিন্তে ব্যাংকে টাকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে আগামী মাসের ১ তারিখ থেকে দেশে ‘বাংলা কিউআর’ ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা হবে। এর ফলে একটি কিউআর কোডের মাধ্যমেই সবাই সবার সঙ্গে লেনদেন করতে পারবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। 

গভর্নর মোস্তাকুর রহমান বলেন, ভারতের মতো বাংলাদেশেও ডিজিটাল লেনদেন দ্রুত বাড়বে বলে আমরা আশা করছি। এতে নগদ অর্থের ওপর নির্ভরশীলতাও ধীরে ধীরে কমে আসবে।

আমাদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ টাকা চুরি হয়ে গেছে তিনি বলেছেন, এই পরিস্থিতিতে প্রথম কাজ হচ্ছে ব্যাংকিং ব্যবস্থা স্থিতিশীল করা। অনেকেই বিভিন্ন কথা বলছেন, তবে বাস্তবতা হলো পাঁচটি ইসলামী ব্যাংক আগে থেকেই সমস্যাগ্রস্ত ছিল। গত বছরের ২৯ ডিসেম্বর আগের সরকার একটি স্কিম করে গেছে, সেই অনুযায়ী এখন পেমেন্ট দেওয়া হচ্ছে।

শুক্রবার (১২ জুন) বিকেলে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নে তিনি এসব কথা বলেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বলেন, আরেকটি বিষয় হলো, আমরা নিজেরাও এক ধরনের দ্বন্দ্বে আছি। কিছু মানুষ ব্যাংকে টাকা রেখেছে, আর অন্য একটি গোষ্ঠী সেই টাকা চুরি করে নিয়ে গেছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, একজন করদাতা তিনি রিকশাচালক হোন বা অন্য কেউ, যিনি পণ্য কিনে পরোক্ষভাবে কর দেন, তার টাকার কতটুকু ব্যবহার করে এই ক্ষতি পূরণ করা হবে? এই বিষয়টি নিয়ে আমাদের নীতিগত দ্বিধা রয়েছে।

তিনি বলেন, এর পাশাপাশি সক্ষমতার বিষয়ও আছে। আমাদের জানামতে, ব্যাংক খাতে সার্বিক কোনো সংকট নেই। মূলত পাঁচটি ব্যাংকে সংকট রয়েছে এবং আরও কিছু ব্যাংকের কিছু সমস্যা আছে। এসব বিষয়ে আমরা খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নেব। কারণ, একসঙ্গে প্রায় পাঁচ লাখ কোটি টাকা রাজস্ব খাত থেকে এনে দেওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। এটি বাস্তবতা। তাই অন্য যে-সকল আর্থিক প্রক্রিয়া ও ব্যবস্থা রয়েছে, সেগুলোর মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করা হবে।

তিনি আরও বলেন, টাকা চুরির বিষয়টি আমরা প্রথম দিন থেকেই কঠোরভাবে অনুসরণ করছি। এ জন্য একটি ‘স্টোলেন অ্যাসেট রিকভারি টাস্কফোর্স’ গঠন করা হয়েছে এবং আমরা নিয়মিত বৈঠক করছি। তবে নির্মম সত্য হলো, বিশ্বব্যাপী চুরি হওয়া সম্পদ উদ্ধারের সাফল্যের হার খুবই কম। তবু এর অর্থ এই নয় যে, আমরা চেষ্টা বন্ধ করে দেব।

গভর্নর বলেন, সাধারণত এসব সম্পদ উদ্ধার করতে পাঁচ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত সময় লাগে। তারপরও আমাদের অঙ্গীকার হলো, যারা টাকা চুরি করে নিয়ে গেছে তাদের শান্তিতে থাকতে দেওয়া হবে না। বিভিন্ন দেশে সম্পদ জব্দের কাজ চলছে। আমরা একাধিক আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে চুক্তি করেছি এবং প্রায় ১০টি সংস্থা আমাদের সঙ্গে কাজ করছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি দেশে তাদের সম্পদ ফ্রিজ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমাদের একটি যৌথ তদন্ত দলও রয়েছে, যারা নিয়মিত কাজ করছে। ইতোমধ্যে আমরা কিছু ছোট সাফল্য পেয়েছি। সময়মতো এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানানো যাবে। কিছু অর্থও আমরা উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছি। তবে যারা টাকা পাচার করেছে, তারা সাধারণত এক দেশ থেকে আরেক দেশে অর্থ সরিয়ে নেয় এবং বহু স্তরে লেনদেন গোপন করে। ফলে তাদের অনুসরণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। তারপরও আমরা তাদের অনুসরণ অব্যাহত রাখব, তারা যেখানেই থাকুক না কেন।

সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন, কৃষি, মৎস্য ও পানি সম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ, অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন, ডাক- টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার, মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. নাসিমুল গনি, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান এবং প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজার বিষয়ক বিশেষ সহকারী তানভীর গনি।

এর আগে, বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী। এটি দেশের ৫৫তম জাতীয় বাজেট এবং বর্তমান সরকারের মেয়াদে অর্থমন্ত্রী হিসেবে আমির খসরুর প্রথম বাজেট।