বাংলাদেশের পোশাক খাতের জন্য নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে পোল্যান্ডের অন্যতম বৃহৎ পোশাক ব্র্যান্ড এলপিপি। ৪০ মিলিয়ন ডলারের বকেয়া পণ্যমূল্য পরিশোধ ও বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিকারক এবং বায়িং হাউসগুলোর সঙ্গে বিরোধের জেরে নতুন ক্রয়াদেশ স্থগিত করেছে এলপিপি। বিষয়টি শুধু কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সংকট নয়, বরং দেশের রপ্তানি খাতের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গত ৩০ জুলাই বাংলাদেশের সরবরাহকারীদের পাঠানো এক চিঠিতে এলপিপি জানায়, 'ভবিষ্যৎ সোর্সিং কৌশল নিয়ে পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা চলাকালে আমরা বাংলাদেশে নতুন ক্রয়াদেশ দেওয়া এবং সরবরাহকারীদের কাছে নতুন পণ্য উন্নয়নসংক্রান্ত কাজ পাঠানো স্থগিত করছি।'
চিঠিতে আরও বলা হয়, 'এই সময়ে আমরা অন্যান্য দেশে সোর্সিংয়ের সুযোগ ও উৎপাদন সক্ষমতাও মূল্যায়ন করব।'
রপ্তানিকারকদের ভাষ্য, বকেয়া পরিশোধ না করায় স্থানীয় রপ্তানিকারকেরা আইনি প্রক্রিয়া শুরু করেন। আলোচনায় বসার পূর্বশর্ত হিসেবে এলপিপি তাদের ওই মামলা প্রত্যাহারের অনুরোধ জানায়।
এই অর্থপরিশোধ বিরোধে বাংলাদেশের প্রায় ৪০টি পোশাক প্রস্তুতকারক ও বায়িং হাউস জড়িত। তারা এলপিপির নিশ্চয়তায় করা বিক্রয় চুক্তির আওতায় রাশিয়ার এফইএস রিটেইলের জন্য পণ্য সরবরাহ করেছিল।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর রাশিয়ায় পরিচালনাগত জটিলতার কারণে এলপিপি এফইএস রিটেইলের মাধ্যমে ক্রয়াদেশ ও অর্থপরিশোধের ব্যবস্থা নেয়। শুরুতে বিল পরিশোধ করা হলেও গত ১৮ মাস ধরে অর্থ দেওয়া বন্ধ রয়েছে।
রপ্তানিকারকদের মতে, এলপিপি বাংলাদেশ থেকে বছরে ৭০ কোটি ডলারের বেশি মূল্যের পোশাক সংগ্রহ করত।
খাতসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে আলোচনা করতে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি গতকাল ক্ষতিগ্রস্ত রপ্তানিকারকদের সঙ্গে বৈঠক করেছে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতিও এ বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। সংগঠনটির সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, তারা এলপিপির ক্রয়াদেশ স্থগিতের চিঠি পেয়েছেন।
তিনি বলেন, "তারা বাংলাদেশ থেকে পণ্য সংগ্রহ অব্যাহত রাখবে কি না, সেটি তাদের ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত। কিন্তু বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের পাওনা পরিশোধে পদক্ষেপ না নিলে আমরা বাংলাদেশে এলপিপিকে কালো তালিকাভুক্ত (ব্ল্যাকলিস্টেড) করার উদ্যোগ নেব।"
তিনি আরও বলেন, এলপিপির কথিত অনিয়মের বিষয়টি ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ক্রেতাদের ফোরাম এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য অংশীজনের কাছেও তুলে ধরা হবে।
হাতেম বলেন, যেসব ক্রেতা অর্থপরিশোধের বাধ্যবাধকতা মানে না, তাদের ছাড়া পোশাক খাত বরং ভালো থাকবে। এ বিরোধের কারণে ইতোমধ্যে কয়েকটি কারখানা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেও তিনি জানান।
তবে বাংলাদেশ গার্মেন্ট বায়িং হাউস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আবদুল হামিদ বলেন, বাংলাদেশ থেকে বছরে ৭০ কোটি ডলারের বেশি মূল্যের পোশাক সংগ্রহকারী কোনো ক্রেতাকে তারা হারাতে চান না। একই সঙ্গে অর্থপরিশোধ বিরোধে ক্ষতিগ্রস্ত কারখানাগুলোকেও সুরক্ষা দিতে হবে বলে তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
হামিদ আরও বলেন, এক পর্যায়ে এলপিপি ৫০ শতাংশ ছাড়ে বকেয়া পরিশোধের প্রস্তাব দিয়েছিল। তবে এত বড় ছাড় মেনে নিয়ে কোনো রপ্তানিকারক টিকে থাকতে পারবে কি না, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।