বাংলাদেশে যে কোনো বড় সংকটের মুখোমুখি হলেই একটি চেনা সংস্কৃতি দেখা যায়- সেটি হলো ‘দোষ চাপানোর সংস্কৃতি’ বা ব্লেম-গেম। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হচ্ছে না। অতীত সরকার, বর্তমান প্রশাসন, বৈশ্বিক পরিস্থিতি বা আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর দায় চাপিয়ে অনেকেই নিজেদের দায়িত্ব শেষ করতে চান। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে এই রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক কাদা ছোড়াছুড়ির চেয়ে বড় প্রশ্ন "সমাধান কী এবং আমরা কবে এই সংকট থেকে মুক্তি পাব?
সমালোচনার দেয়াল টপকে এই সংকটের দ্রুত ও টেকসই সমাধানের জন্য কী করা প্রয়োজন এবং সরকারের বর্তমান রোডম্যাপ কেমন হওয়া উচিত, তা নিয়ে সম্ভাব্য কিছু সুপারিশ তুলে ধরা হলো:
দ্রুত সমাধানের জন্য করণীয়
বকেয়া পরিশোধ ও আমদানি সচল রাখা: জ্বালানি আমদানির জন্য বিদেশি সরবরাহকারী এবং এলএনজি (LNG) কোটা সচল রাখতে জরুরি ভিত্তিতে ডলারের জোগান নিশ্চিত করা।
কারিগরি অপচয় ও চুরি রোধ: বিদ্যুৎ ও গ্যাস সঞ্চালন লাইনের সিস্টেম লস কমানো এবং অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্নকরণে কঠোর অভিযান চালানো।
শিল্প খাতকে অগ্রাধিকার: সীমিত জ্বালানিকে আবাসিক বা কম গুরুত্বপূর্ণ খাতের চেয়ে উৎপাদনমুখী শিল্প ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে পরিকল্পিতভাবে বণ্টন করা।
সেটা না করলে দেশ আরো বড় সংকটে পড়তে পারে।
ভর্তুকি ও মূল্য সমন্বয়: জ্বালানি খাতের লোকসান কমাতে এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সামঞ্জস্য রাখতে ধাপে ধাপে যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ করা।
এবার আসি দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের রোডম্যাপ (Long-term Roadmap) কি হতে পারে--
নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান বৃদ্ধি: আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে স্থলভাগ (Onshore) ও গভীর সমুদ্রে (Offshore) গ্যাস ও খনিজ অনুসন্ধানে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থাকে কাজে লাগানো।
নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর: ২০৪১ সালের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী সৌর, বায়ু ও জলবিদ্যুতের মতো টেকসই জ্বালানির অনুপাত মোট উৎপাদনের অন্তত ১০-২০ শতাংশে উন্নীত করা।
ক্যাপাসিটি চার্জের চুক্তি পুনর্বিবেচনা: অলস বসে থাকা বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে বসিয়ে রেখে ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ দেওয়ার যে আত্মঘাতী নীতি, তা দ্রুত সংস্কার বা বাতিল করা।
আঞ্চলিক জ্বালানি সহযোগিতা: ভারত, নেপাল বা ভুটান থেকে জলবিদ্যুৎ ও সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ আমদানির দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করা।
এবার দেখা যাক বর্তমান সরকারের কী করণীয়
জরুরি অর্থ বরাদ্দ: বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বকেয়া মেটাতে এবং এলএনজি আমদানির জন্য অন্তর্বর্তীকালীন তহবিল বা বন্ডের মাধ্যমে অর্থ সংস্থানের চেষ্টা দ্রুত চেষ্টা করা।
আইনি ও চুক্তিভিত্তিক সংস্কার: জ্বালানি খাতের বিশেষ আইন ও অস্বচ্ছ চুক্তিগুলো পর্যালোচনা করতে উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া।
অনুসন্ধানে জোর: সাগরে গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান এবং বাপেক্সের মাধ্যমে স্থলভাগে নতুন কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
দোষ চাপানোর সংস্কৃতি কোনো সংকটের সমাধান দেয় না, বরং সমাধানের পথকে দীর্ঘায়িত করে। বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিতামূলক এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ‘জাতীয় জ্বালানি রোডম্যাপ’। সরকার এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের উচিত ব্লেম-গেম’ না খেলে এই সংকট সমাধানের একটি সুনির্দিষ্ট টাইমলাইন বা সময়সীমা জনগণের সামনে স্পষ্ট করা।
লেখক: রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক