বাংলাদেশের আম চাষে ধীরে ধীরে বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে। একসময় ল্যাংড়া, হিমসাগর, ফজলি, গোপালভোগ ও আশ্বিনার মতো ঐতিহ্যবাহী জাতই আমবাগানের প্রধান আকর্ষণ ছিল। এখন সেই চিত্র বদলে দিয়ে বাণিজ্যিক বাগানে জায়গা করে নিচ্ছে আম্রপালি, বারি আম-৪, বারি আম-৭, গৌড়মতি, কাটিমনসহ আগাম ও নাবি জাতের আম। গবেষণার মাধ্যমে নতুন জাত উদ্ভাবন এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বাণিজ্যিক চাষ সম্প্রসারণের ফলে আমের মৌসুমও দীর্ঘ হচ্ছে।
কৃষি তথ্য সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৩ লাখ ৬ হাজার একর জমিতে আম চাষ হচ্ছে এবং ২০২৪ সালের হিসাবে বার্ষিক উৎপাদন ছিল প্রায় ১৪ লাখ ৮২ হাজার মেট্রিক টন। তবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উৎপাদনের পরিমাণ আরও বেশি। ২০২৫ সালে আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৬ লাখ ৬৬ হাজার মেট্রিক টন এবং ২০২৬ মৌসুমে অনুকূল পরিস্থিতিতে উৎপাদন ২৭ লাখ মেট্রিক টন ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনার কথা জানায় সংশ্লিষ্টরা।
আম্রপালির উত্থান
বাংলাদেশের আমবাগানের পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় উদাহরণ আম্রপালি। গবেষকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে উৎপাদিত প্রতি চারটি আমের প্রায় একটি আম্রপালি। অর্থাৎ মোট উৎপাদনের প্রায় ২৫ শতাংশই এই জাতের।
এক দশক আগেও বাণিজ্যিক আমবাগানে ল্যাংড়া, হিমসাগর বা ফজলির আধিপত্য বেশি ছিল। কিন্তু তুলনামূলকভাবে ছোট গাছ, ঘনভাবে চাষের সুযোগ, নিয়মিত ফলন এবং বাজারে চাহিদার কারণে আম্রপালি দ্রুত কৃষকদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বর্তমানে ৬৪ জেলাতেই এ জাতের চাষ ছড়িয়ে পড়েছে বলে কৃষি কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। শুধু আম্রপালিই নয়, বারি আম-৩ নামে পরিচিত এই জাতের পাশাপাশি বারি আম-৪, বারি আম-৭ এবং অন্যান্য উন্নত জাতও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্তার লাভ করছে।
নতুন জাতের দিকে গবেষকদের নজর
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের চাঁপাইনবাবগঞ্জের আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণাকেন্দ্র আমের নতুন জাত উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। গবেষণাকেন্দ্রের সাম্প্রতিক কার্যক্রমে বারি আম-১৩-এর মতো রঙিন ও নাবি জাত এবং নতুন সংকর জাত নিয়ে কাজের কথা উঠে এসেছে। গবেষকদের মতে, এসব জাতের কিছু বৈশিষ্ট্য হলো তুলনামূলক বেশি ফলন, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা, ভালো স্বাদ এবং দীর্ঘ সময় সংরক্ষণের সম্ভাবনা।
গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন কয়েকটি জাত প্রচলিত জাতের তুলনায় প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ বেশি ফলন দিতে সক্ষম। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, গবেষণার লক্ষ্য এখন শুধু বেশি ফলন নয়। কোন জাত কোন অঞ্চলের মাটি ও আবহাওয়ায় ভালো ফলন দেবে, কোন জাত রপ্তানির উপযোগী, কোন জাত দীর্ঘ সময় বাজারে রাখা যাবে এবং কোন জাত জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা করতে পারবে, এসব বিষয়ও গুরুত্ব পাচ্ছে।
মৌসুমের বাইরে আম, বদলে যাচ্ছে বাজার
বাংলাদেশের আমের বাজারে সবচেয়ে দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে মৌসুমের দৈর্ঘ্যে। ঐতিহ্যগতভাবে মে থেকে আগস্ট পর্যন্ত ছিল আমের প্রধান মৌসুম। কিন্তু নতুন ও নাবি জাতের বিস্তারের কারণে এখন মার্চ-এপ্রিল থেকে আম বাজারে আসা শুরু করে এবং কিছু জাত সেপ্টেম্বর এমনকি বছরের অন্যান্য সময়ও পাওয়া যাচ্ছে।
২০২৬ সালের সাম্প্রতিক বাজারচিত্রে দেখা গেছে, সেপ্টেম্বরেও চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাটসহ বিভিন্ন বাজারে কাটিমন, বারি আম-৪, আশ্বিনা, গৌড়মতিসহ কয়েক ধরনের আম পাওয়া গেছে। ফলে আমের ব্যবসা এখন কেবল দুই-তিন মাসের মৌসুমি বাণিজ্য না থেকে দীর্ঘ সময়ের কৃষি অর্থনীতিতে পরিণত হওয়ার পথে। কৃষিবিদদের ভাষায়, এটি অনেকটা ‘রিলে রেসের’ মতো। একটি জাতের মৌসুম শেষ হওয়ার পর অন্য জাত বাজারে আসছে। ফলে কৃষক দীর্ঘ সময় ধরে আম বিক্রির সুযোগ পাচ্ছেন।
কাটিমন ও নাবি জাতের সম্ভাবনা
কাটিমন জাতের আম কৃষকদের মধ্যে বিশেষ আগ্রহ তৈরি করেছে। প্রচলিত জাতগুলোর মৌসুম শেষ হওয়ার পরও এই জাত বাজারে পাওয়া যায়। ফলে যখন বাজারে দেশীয় আমের সরবরাহ কম থাকে, তখন নাবি জাতের কৃষকেরা তুলনামূলক ভালো দাম পাওয়ার সুযোগ পান।
তবে কৃষি গবেষকদের সতর্কতাও রয়েছে। কিছু কৃষক প্রচলিত জাতের গাছে কৃত্রিমভাবে ফুল আনা বা হরমোন প্রয়োগের মাধ্যমে মৌসুমের বাইরে ফলন নেওয়ার চেষ্টা করছেন। গবেষকদের মতে, এসব পদ্ধতি সবসময় নিরাপদ নয়। অনিয়ন্ত্রিতভাবে ফুলের স্বাভাবিক চক্র পরিবর্তন করলে ফলের আকৃতি বিকৃত হতে পারে এবং পরবর্তী মৌসুমে গাছে ফুল আসাও কমে যেতে পারে। তাই জেনেটিকভাবে নাবি জাত ব্যবহার করাই বেশি নিরাপদ।
বারি-১৯ ও বারি-২০ আম আসছে
নতুন জাত উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গবেষণাকেন্দ্রের কার্যক্রম আরও আশাব্যঞ্জক। সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী, বারি আম-১৯ নামে একটি নতুন সংকর জাত ছাড়ার প্রস্তুতি চলছে। এটি বারি আম-৩ ও বারি আম-৪-এর সংকর। গবেষকদের মতে, এ জাতের ফল আকারে আকর্ষণীয়, মিষ্টি এবং ফলের বোঁটা তুলনামূলক শক্ত হওয়ায় ঝড়ের সময় ফল ঝরে পড়ার ঝুঁকি কম হতে পারে। জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে আগস্টের মাঝামাঝি পর্যন্ত এ জাতের ফলন পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
অন্যদিকে বারি আম-২০ নামে সম্ভাব্য আরেকটি জাত আম্রপালি ও ল্যাংড়ার সংকরায়নে তৈরি করা হচ্ছে। গবেষকদের প্রত্যাশা, এতে ল্যাংড়ার মতো স্বাদ ও চেহারার সঙ্গে আম্রপালির কিছু বৈশিষ্ট্য যুক্ত থাকবে এবং আগস্ট-সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ফলন পাওয়া যেতে পারে। গবেষকদের মতে, নতুন জাতগুলো সফলভাবে অনুমোদন ও মাঠপর্যায়ে বিস্তার লাভ করলে বাংলাদেশের আমের মৌসুম আরও দীর্ঘ হবে।
দক্ষিণাঞ্চলেও নতুন সম্ভাবনা
আম চাষের পরিবর্তন শুধু রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের লবণাক্ত এলাকাতেও আম চাষের সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা চলছে। পটুয়াখালীর দুমকীতে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণাকেন্দ্রে উপকূলীয় মাটি, আবহাওয়া ও পরিবেশের উপযোগী ফলের জাত নিয়ে গবেষণা করা হচ্ছে। সেখানে বিভিন্ন দেশ থেকে সংগ্রহ করা ৩১টি বিদেশি আমের জার্মপ্লাজম নিয়ে পরীক্ষা চালানোর তথ্য জানিয়েছে বাসস। কয়েকটি জাত বহু মৌসুমের পরীক্ষায় আশাব্যঞ্জক ফলও দেখিয়েছে।
এটি বাংলাদেশের কৃষিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত। কারণ জলবায়ু পরিবর্তন, লবণাক্ততা ও জলাবদ্ধতার কারণে দক্ষিণাঞ্চলে প্রচলিত কৃষির ওপর চাপ বাড়ছে। সেখানে অভিযোজিত আমের জাত সফল হলে নতুন এলাকাকে বাণিজ্যিক আম উৎপাদনের আওতায় আনা সম্ভব হতে পারে।
রপ্তানির সম্ভাবনাও বাড়ছে
আমের উৎপাদন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রপ্তানি সম্ভাবনাও বাড়ছে। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্য ও যুক্তরাজ্যের বাজারে আম রপ্তানি করছে। কৃষি তথ্য সার্ভিসের মতে, বাংলাদেশের আম রপ্তানি সম্প্রসারণের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। ২০২৬ মৌসুমে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ ও নাটোরে রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদনের জন্য নিরাপদ ও আধুনিক চাষপদ্ধতি ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মালয়েশিয়া ও জাপানের বাজারেও রপ্তানি বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে কাজ হয়েছে বলে বাসস জানিয়েছে।
তবে আন্তর্জাতিক বাজারে জায়গা করতে হলে শুধু ভালো জাত থাকলেই হবে না। আম উৎপাদনে কীটনাশকের নিরাপদ ব্যবহার, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কীটনাশক প্রয়োগ বন্ধ রাখা, সঠিক গ্রেডিং, প্যাকেজিং, সংরক্ষণ, ঠান্ডা শৃঙ্খল এবং আন্তর্জাতিক মানের পরীক্ষাগার সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।
উৎপাদন বাড়লেও ঝুঁকি আছে
আম চাষে সম্ভাবনা যেমন বাড়ছে, তেমনি জলবায়ুজনিত ঝুঁকিও স্পষ্ট হচ্ছে। ২০২৬ সালের মৌসুমে রাজশাহী অঞ্চলে তাপপ্রবাহ ও খরার কারণে আমের গুটি ঝরে পড়ার ঘটনা কৃষকদের উদ্বিগ্ন করেছে। রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ ও নাটোরে প্রায় ১২ লাখ মেট্রিক টন উৎপাদনের লক্ষ্য থাকলেও অতিরিক্ত তাপমাত্রা ও পানির সংকট নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। অর্থাৎ নতুন জাত উদ্ভাবন করলেই ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ শেষ হচ্ছে না। উচ্চ তাপমাত্রা, অনিয়মিত বৃষ্টি, খরা, ঝড়, রোগবালাই ও পানির সংকট মোকাবিলায় একই সঙ্গে আধুনিক বাগান ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।
প্রযুক্তিনির্ভর আমবাগানের দিকে যাত্রা
বাংলাদেশের আম চাষ এখন ধীরে ধীরে প্রচলিত বাগান ব্যবস্থাপনা থেকে প্রযুক্তিনির্ভর কৃষির দিকে যাচ্ছে। কৃষি তথ্য সার্ভিসের তথ্যে আধুনিক আম উৎপাদনে পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি, সুষম সার প্রয়োগ, পানিসাশ্রয়ী সেচ, ফেরোমন ফাঁদ ও বায়োপেস্টিসাইড ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের গবেষণাকেন্দ্রের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় আমের জেনেটিক রিসোর্স ব্যাংক, ডিজিটাল ডেটাবেজ এবং ড্রোনের মাধ্যমে বাগান পর্যবেক্ষণের মতো প্রযুক্তির কথাও উঠে এসেছে। এসব প্রযুক্তি বাস্তবায়িত হলে রোগ শনাক্তকরণ, ফলনের পূর্বাভাস এবং বাগান ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তন আসতে পারে।
সম্ভাবনার দুয়ার খুলছে
সব মিলিয়ে বাংলাদেশের আম চাষ এখন একটি নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করছে। একদিকে নতুন ও উন্নত জাত, অন্যদিকে মৌসুম দীর্ঘ করার প্রযুক্তি, নতুন অঞ্চলে চাষ সম্প্রসারণ এবং রপ্তানি বাজারের সম্ভাবনা, এই চারটি বিষয় আমকে বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতির আরও গুরুত্বপূর্ণ খাতে পরিণত করতে পারে।
তবে উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি কৃষকের ন্যায্য দাম, নিরাপদ উৎপাদন, বাজার ব্যবস্থাপনা, সংরক্ষণ ও রপ্তানি অবকাঠামো নিশ্চিত না হলে এই সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো কঠিন হবে। বিশেষ করে বারি আম-১৯, সম্ভাব্য বারি আম-২০সহ নতুন জাতগুলো মাঠপর্যায়ে সফল হলে এবং উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা সহনশীল জাতের বিস্তার ঘটলে বাংলাদেশের আমের মানচিত্র আরও বড় হতে পারে।
ফলে আগামী দিনের আম চাষ শুধু ‘কত টন আম উৎপাদন হলো’ এই হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং কোন জাত কখন ফল দিচ্ছে, কতটা নিরাপদ, কতদিন সংরক্ষণ করা যাচ্ছে, কোন বাজারে কত দামে বিক্রি হচ্ছে এবং কতটা বিদেশে রপ্তানি করা যাচ্ছে এসব সূচকই বাংলাদেশের আম অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।
তথ্যসূত্র: কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, কৃষি তথ্য সার্ভিস, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাসস, প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার।