রান্নার গ্যাসের দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে সরকার, কিন্তু সেই দামে সিলিন্ডার কিনতে পারছেন না অনেক ভোক্তা। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নির্ধারিত হিসাবে ১২ কেজি তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৮৩৭ টাকা। অথচ রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকার খুচরা বাজারে একই সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৭০০ টাকায়।
অর্থাৎ, সরকারি দামের চেয়ে ক্রেতাকে অতিরিক্ত গুনতে হচ্ছে ৩৬৩ থেকে ৮৬৩ টাকা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই বাড়তি খরচ সাধারণ পরিবারের মাসিক বাজার ব্যয়ের ওপর বড় চাপ তৈরি করছে। ১৩ অক্টোবর প্রকাশিত দ্য ডেইলি স্টার–এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজধানীর ১০টি খুচরা বিক্রয়কেন্দ্রে চালানো জরিপে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম কোথাও ২ হাজার ২০০ টাকার নিচে পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, জাগো নিউজের বাজার অনুসন্ধানেও ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৭০০ টাকা দরে সিলিন্ডার বিক্রির তথ্য উঠে এসেছে। কিছু এলাকায় ক্রেতাদের বেশি দাম দিয়েও গ্যাস পেতে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।
প্রশ্ন উঠেছে, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে সরকার দাম নির্ধারণ করার পরও কেন ভোক্তাকে এত বেশি অর্থ দিতে হচ্ছে?
আমদানি বাড়লেও বাজারে সরবরাহ ও দামের এই অসংগতি কেন কাটছে না?
সরকারি দাম কত, বাস্তবে কত?
১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডার · অক্টোবর ২০২৬
বিইআরসি নির্ধারিত দাম ৳১,৮৩৭
প্রতিবেদনে পাওয়া বাজারদর
৳২,২০০–২,৭০০
সরকারি দামের তুলনায় বাড়তি ব্যয়
৳৩৬৩–৮৬৩
সূত্র: বিইআরসির মূল্য ঘোষণা এবং ১৩ অক্টোবর প্রকাশিত ডেইলি স্টার ও জাগো নিউজের বাজার প্রতিবেদন।
বিইআরসি গত ৪ অক্টোবর ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করে। নতুন দাম ওই দিন সন্ধ্যা ৬টা থেকে কার্যকর হয়। এর আগে সেপ্টেম্বরে একই সিলিন্ডারের দাম ছিল ১ হাজার ৫৮৫ টাকা।
অর্থাৎ, সরকারি মূল্য এক মাসে প্রায় ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ বাড়লেও বাজারে বিক্রয়মূল্য তার চেয়েও অনেক বেশি। তবে উল্লেখ করা বাজারদর একটি নির্দিষ্ট সময়ের সংবাদভিত্তিক পর্যবেক্ষণ; বাংলাদেশের প্রতিটি জেলা ও দোকানে একই দাম নেওয়া হচ্ছে, এমন দাবি করা যাবে না।
আমদানি বাড়ছে, তবু দাম বেশি কেন?
বাজারের অস্বাভাবিক দামের সঙ্গে এলপিজি আমদানি ও সরবরাহের পরিস্থিতির তুলনা করলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়।
জাগো নিউজের বিইআরসির তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ১১ লাখ ৭৭ হাজার ৭৪২ মেট্রিক টন এলপিজি আমদানি হয়েছে। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় আমদানি বেড়েছে ৭ দশমিক ৩ শতাংশ। তারপরও বাজারে উচ্চমূল্য ও সরবরাহের সংকটের অভিযোগ রয়েছে।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হলো, দেশে মোট আমদানি বাড়া আর প্রতিটি খুচরা দোকানে পর্যাপ্ত সিলিন্ডার পৌঁছানো এক বিষয় নয়। আমদানির পর সংরক্ষণ, পরিবহন, কোম্পানির ডিপো থেকে পরিবেশকের কাছে সরবরাহ এবং খুচরা বিক্রির প্রতিটি ধাপে কোনো বাধা তৈরি হলে স্থানীয় বাজারে সংকট দেখা দিতে পারে।
এ ছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির দাম, ডলারের বিনিময় হার, পরিবহন ব্যয় এবং পরিবেশক-খুচরা বিক্রেতার কমিশনও চূড়ান্ত মূল্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তবে বর্তমানে বাজারে অতিরিক্ত দামের কতটা কোন কারণে হচ্ছে, তা নির্ধারণ করতে প্রতিটি স্তরের প্রকৃত ক্রয়মূল্য, সরবরাহ ও বিক্রির হিসাব যাচাই করা প্রয়োজন।
ব্যবসায়ীদের আপত্তি কোথায়?
এলপিজি ব্যবসায়ীরা সরবরাহ, মূল্য ও ব্যবসায়িক কমিশন নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের সংগঠন এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেড ১২ অক্টোবর ঘোষণা দেয়, দাবি আদায়ে ১৫ ও ১৬ অক্টোবর সারা দেশে সিলিন্ডারের দোকান বন্ধ রাখা হবে। সংগঠনটির বক্তব্য অনুযায়ী, ব্যবসায়ীদের হয়রানি এবং কমিশনসংক্রান্ত সমস্যার প্রতিবাদে এ কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।
তবে ব্যবসায়ীদের দাবির কারণে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি মূল্য নেওয়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে বৈধ হয়ে যায় না। একইভাবে, বেশি দামে বিক্রি হলেই প্রতিটি ক্ষেত্রে কৃত্রিম সংকট বা কারসাজি হয়েছে—এ সিদ্ধান্তেও পৌঁছানো যায় না। অনিয়ম শনাক্ত করতে সরবরাহকারী কোম্পানি, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতার হিসাব এবং বাস্তব বাজারদর যাচাই জরুরি।
ভোক্তার পকেটে বাড়তি চাপ
একটি পরিবার মাসে দুটি ১২ কেজির সিলিন্ডার ব্যবহার করলে বাজারদর ২ হাজার ২০০ টাকা হওয়ার ক্ষেত্রে সরকারি দামের তুলনায় মাসে অতিরিক্ত খরচ হয় ৭২৬ টাকা। আর প্রতিটি সিলিন্ডার ২ হাজার ৭০০ টাকা হলে অতিরিক্ত খরচ দাঁড়ায় ১ হাজার ৭২৬ টাকা।
হিসাব সরকারি দরে বাজারদর ২,২০০ টাকা বাজারদর ২,৭০০ টাকা
প্রতি সিলিন্ডার ১,৮৩৭ টাকা ২,২০০ টাকা ২,৭০০ টাকা
দুটি সিলিন্ডার ৩,৬৭৪ টাকা ৪,৪০০ টাকা ৫,৪০০ টাকা
দুই সিলিন্ডারে অতিরিক্ত ব্যয় — ৭২৬ টাকা ১,৭২৬ টাকা
এই হিসাব কেবল দামের পার্থক্য বোঝানোর জন্য; এটি কোনো নির্দিষ্ট পরিবারের প্রকৃত মাসিক খরচের জরিপ নয়।
নিয়ন্ত্রণে কী করা প্রয়োজন?
বাজারে স্বাভাবিক দাম ফিরিয়ে আনতে কয়েকটি বিষয়ে নজর দেওয়া জরুরি।
- সরবরাহের হিসাব প্রকাশ: আমদানিকারক কোম্পানিগুলোর আমদানি, ডিপোতে মজুত এবং বাজারে সরবরাহের তথ্য নিয়মিত যাচাই করা।
- খুচরা পর্যায়ে তদারকি: নির্ধারিত দামের তুলনায় বেশি মূল্য নেওয়া হচ্ছে কি না, তা দোকানভিত্তিক যাচাই করা।
- কমিশন ও পরিবহন ব্যয়ের স্বচ্ছতা: কোম্পানি, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতার ব্যয়ের কাঠামো পর্যালোচনা করা।
- অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তি: অতিরিক্ত মূল্য আদায় বা সরবরাহে অনিয়মের অভিযোগ পেলে প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া।
জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এর আগে সরকার নির্ধারিত দামে এলপিজি বিক্রি নিশ্চিত করতে বিভিন্ন জেলায় অভিযান চালানোর কথা জানিয়েছে। সংস্থাটি ক্রেতাদের কেনার সময় মূল্যতালিকা দেখা, রসিদ সংগ্রহ এবং অনিয়মের অভিযোগ জানানোর পরামর্শও দিয়েছে।
১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের সরকারি দাম ১ হাজার ৮৩৭ টাকা হলেও সাম্প্রতিক বাজার প্রতিবেদনে ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৭০০ টাকার বিক্রয়মূল্য উঠে এসেছে। অর্থাৎ, ভোক্তাকে সিলিন্ডারপ্রতি ৩৬৩ থেকে ৮৬৩ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে বলে এসব প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে।
এখন মূল প্রশ্ন শুধু দাম বাড়ল কেন, তা নয়; বরং আমদানি বাড়ার পরও কেন নির্ধারিত দামে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। এই প্রশ্নের উত্তর পেতে আমদানিকারক থেকে খুচরা বিক্রেতা পর্যন্ত সরবরাহব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ হিসাব, ব্যবসায়ীদের কমিশনসংক্রান্ত দাবি এবং বাজার তদারকির ফলাফল জনসমক্ষে আনা প্রয়োজন। তবেই বোঝা যাবে, অতিরিক্ত দামের পেছনে প্রকৃত ব্যয় কতটা, সরবরাহের ঘাটতি কতটা এবং কোথায় নিয়ম লঙ্ঘন হচ্ছে।
প্রতিবেদনটি ১৩ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি। বাজারদর এলাকা ও বিক্রেতাভেদে পরিবর্তিত হতে পারে।