চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে দেশের ব্যাংকগুলোল কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা বা সিএসআর ব্যয় কমেছে। গত বছরের জুলাই-ডিসেম্বর ছয় মাসে ব্যাংকগুলোর সিএসআর ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ১৯৭ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ আগের ছয় মাসের তুলনায় জানুয়ারি-জুন সময়ে সিএসআর ব্যয় কমেছে প্রায় ৭৮ কোটি ৮১ লাখ টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের টেকসই অর্থায়ন বিভাগের চলতি বছরের প্রথম ৬ মাসের সিএসআর কার্যক্রমের পর্যালোচনা প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে দেশে কার্যরত ৬১টি তফশিলি ব্যাংকের সিএসআর ব্যয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী- চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ব্যাংকগুলোর মোট সিএসআর ব্যয়ের সবচেয়ে বড় অংশ গেছে 'অন্যান্য' খাতে। এ খাতে ব্যয় হয়েছে ৪৮ কোটি ৫৩ লাখ টাকা, যা মোট সিএসআর ব্যয়ের ৪০ দশমিক ৭৭ শতাংশ। অন্যদিকে স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় হয়েছে ৩৪ কোটি ৬৬ লাখ টাকা বা ২৯ দশমিক ১১ শতাংশ। শিক্ষা খাতে ব্যয় হয়েছে ২৪ কোটি ১৩ লাখ টাকা, যা মোট ব্যয়ের ২০ দশমিক ২৭ শতাংশ। পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রশমন ও অভিযোজন খাতে ব্যয় হয়েছে ১১ কোটি ৭২ লাখ টাকা বা ৯ দশমিক ৮৪ শতাংশ।
'অন্যান্য' খাতের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় হয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায়। এ উপখাতে ব্যয়ের পরিমাণ ৩৪ কোটি ৩৪ লাখ টাকা, যা মোট সিএসআর ব্যয়ের ২৮ দশমিক ৮৫ শতাংশ। এ ছাড়া অন্যান্য উপখাতে ৫ কোটি ৮৩ লাখ, ক্রীড়া ও সংস্কৃতিতে ৪ কোটি ৪৬ লাখ, অবকাঠামো উন্নয়নে ২ কোটি ২ লাখ এবং আয়-উৎসারী কার্যক্রমে ১ কোটি ৮৮ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা উপখাতের আওতায় প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে অনুদান এবং দেশের শীতপ্রধান অঞ্চলের শীতার্ত ও দরিদ্র মানুষের মধ্যে কম্বল বিতরণের জন্যও অর্থ দেওয়া হয়েছে।
ব্যাংকগুলোর সিএসআর ব্যয়ের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অংশ গেছে স্বাস্থ্য খাতে। এ খাতে মূলত হতদরিদ্র, অসহায়, সুবিধাবঞ্চিত ও প্রতিবন্ধী রোগীদের চিকিৎসায় আর্থিক সহায়তা, ক্লিনিক্যাল সেবা, বিনামূল্যে চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসামগ্রী বিতরণে অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন দুরারোগ্য ও জটিল রোগে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার জন্য সরাসরি অনুদান দেওয়া হয়েছে। হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার নির্মাণ, পরিচালন ব্যয় এবং চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনার ক্ষেত্রেও ব্যাংকগুলো সিএসআর অর্থ দিয়েছে।
শিক্ষা খাতে জানুয়ারি-জুন সময়ে ব্যাংকগুলোর ব্যয় হয়েছে ২৪ কোটি ১৩ লাখ টাকা। শিক্ষার্থীদের বৃত্তি ও শিক্ষা উপকরণ দেওয়ার পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়নেও এ অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। তবে গত বছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ের তুলনায় এ খাতে সিএসআর ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ঐ সময়ে শিক্ষা খাতে ব্যয় হয়েছিল ৪৪ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। ফলে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে শিক্ষা খাতে ব্যয় কমেছে ৪৫ দশমিক ৭৪ শতাংশ।
পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রশমন ও অভিযোজন খাতে জানুয়ারি-জুন সময়ে ব্যয় হয়েছে ১১ কোটি ৭২ লাখ টাকা। আগের ছয় মাসে এ খাতে ব্যয় হয়েছিল ২৯ কোটি ২৯ লাখ টাকা। ফলে এ খাতে সিএসআর ব্যয় কমেছে ৫৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ। এই খাতে বিভিন্ন এলাকায় বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি, পরিবেশবিষয়ক গবেষণা, মৎস্যজীবীদের বিকল্প আয়ের সুযোগ সৃষ্টি এবং জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য নিরাপদ সুপেয় পানি ও স্যানিটেশন সহায়তা দেওয়ার মতো কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে।
ব্যাংকের ক্যাটাগরি অনুযায়ী দেখা যায়, সিএসআর ব্যয়ের বড় অংশ এসেছে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে। ৪৩টি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মধ্যে ৩৩টি ব্যাংক জানুয়ারি-জুন সময়ে সিএসআর খাতে ১০৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা ব্যয় করেছে। এটি ব্যাংক খাতের মোট সিএসআর ব্যয়ের ৮৭ দশমিক ১১ শতাংশ। ৯টি বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মধ্যে ৬টি ব্যাংক ব্যয় করেছে ১২ কোটি ৯১ লাখ টাকা বা ১০ দশমিক ৮৫ শতাংশ। ছয়টি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকের মধ্যে দুইটি ব্যাংক ব্যয় করেছে ২ কোটি ৩১ লাখ টাকা। বিশেষায়িত তিনটি ব্যাংকের মধ্যে একটি ব্যাংক ব্যয় করেছে ১১ লাখ টাকা। জানুয়ারি-জুন ২০২৬ সময়ে ইসলামী শরিয়াহভিত্তিক ১০টি ব্যাংকের সিএসআর ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৮ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। এটি ব্যাংক খাতের মোট সিএসআর ব্যয়ের প্রায় ১৫ দশমিক ৩৮ শতাংশ।