অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে ঋণ ও সুদ বাবদ পরিশোধ ১.৩৫ বিলিয়ন ডলার, বিপরীতে ছাড় হয়েছে মাত্র ৬৬২ মিলিয়ন ডলার; বাড়ছে অভ্যন্তরীণ ঋণের ঝুঁকি
বিদেশি ঋণ গ্রহণের তুলনায় ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়ছে বাংলাদেশের। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) প্রতি ১ ডলার বিদেশি ঋণ ছাড়ের বিপরীতে ২ ডলার ৪ সেন্ট পরিশোধ করতে হয়েছে সরকারকে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) ২৬ অক্টোবর প্রকাশিত প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, এই তিন মাসে বিদেশি ঋণের আসল ও সুদ বাবদ বাংলাদেশ পরিশোধ করেছে ১৩৫ কোটি ডলার। বিপরীতে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে ঋণ ও অনুদান মিলিয়ে ছাড় হয়েছে ৬৬ কোটি ২৩ লাখ ১০ হাজার ডলার।
অর্থাৎ, নতুন অর্থ ছাড়ের তুলনায় ঋণ পরিশোধের পরিমাণ দ্বিগুণেরও বেশি।
ঋণ পরিশোধ বেড়েছে, ছাড় কমেছে
ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে বিদেশি ঋণ পরিশোধ বেড়েছে ৫ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বরে ঋণ পরিশোধের পরিমাণ ছিল ১২৮ কোটি ডলার।
এবার আসল ঋণ পরিশোধ করতে হয়েছে ৮৫ কোটি ৮৯ লাখ ২০ হাজার ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৮১ কোটি ৬৯ লাখ ৯০ হাজার ডলার। সুদ পরিশোধ বেড়ে হয়েছে ৪৯ কোটি ২৩ লাখ ১০ হাজার ডলার। আগের বছর এ খাতে ব্যয় ছিল ৪৬ কোটি ২৯ লাখ ৬০ হাজার ডলার।
অন্যদিকে, বিদেশি ঋণ ছাড় কমেছে ৪২ দশমিক ৩ শতাংশ। গত অর্থবছরের একই সময়ে ছাড় হয়েছিল ১১৪ কোটি ৯০ লাখ ডলার। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে ছাড় হওয়া ৬৬ কোটি ২৩ লাখ ১০ হাজার ডলারের মধ্যে ঋণ ৫৪ কোটি ১৭ লাখ ৪০ হাজার এবং অনুদান ১১ কোটি ৫৭ লাখ ডলার।
ঋণ পরিশোধের চাপ আরও বাড়তে পারে
ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইএনএম) নির্বাহী পরিচালক অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরি দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, আগের বছরগুলোতে নেওয়া ঋণ এবং সেসব ঋণচুক্তির শর্ত অনুযায়ী এখন আসল ও সুদ পরিশোধ করতে হচ্ছে। চুক্তিবদ্ধ পরিশোধের বাধ্যবাধকতা ইচ্ছামতো কমানো বা বাড়ানোর সুযোগ নেই।
তাঁর আশঙ্কা, আগামী দুই থেকে তিন বছরে ঋণ পরিশোধের চাপ আরও বাড়বে। একই সময়ে বিদেশি ঋণ ছাড় কমে গেলে সরকারের উন্নয়ন ব্যয় ও বাজেট বাস্তবায়নে অর্থসংস্থানের সংকট তৈরি হতে পারে।
মুজেরি বলেন, বিদেশি ঋণ ও অনুদান পর্যাপ্ত না হলে সরকারকে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে বেশি ঋণ নিতে হতে পারে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নিলে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়তে পারে। আর বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণ বাড়লে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণপ্রাপ্তি সংকুচিত হতে পারে। এতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্বব্যাংক ও এডিবি থেকে সবচেয়ে বেশি অর্থছাড়
প্রথম প্রান্তিকে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুই বিদেশি অর্থায়নকারী সংস্থা ছিল বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (আইডিএ) এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। এ দুটি সংস্থা মিলে ছাড় করেছে ৩৫ কোটি ৮৬ লাখ ২০ হাজার ডলার, যা মোট অর্থছাড়ের প্রায় ৫৪ শতাংশ।
এর মধ্যে আইডিএ দিয়েছে ১৯ কোটি ৬৫ লাখ ১০ হাজার ডলার এবং এডিবি ১৬ কোটি ২১ লাখ ১০ হাজার ডলার।
দ্বিপক্ষীয় ঋণচুক্তির আওতায় ভারত দিয়েছে ১০ কোটি ৪৯ লাখ ৯০ হাজার ডলার। এ ছাড়া জাপান ৪ কোটি ৪৬ লাখ ৬০ হাজার, রাশিয়া ২ কোটি ৬ লাখ ৫০ হাজার এবং চীন ১ কোটি ৪৬ লাখ ৬০ হাজার ডলার ছাড় করেছে।
এ সময়ে এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক (এআইআইবি) কোনো অর্থ ছাড় করেনি। অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা ও দেশ মিলিয়ে দিয়েছে ১১ কোটি ৮৭ লাখ ৩০ হাজার ডলার।
প্রতিশ্রুতি বাড়লেও অর্থ ছাড়ে ধীরগতি
বিদেশি ঋণ ও অনুদানের প্রতিশ্রুতি অবশ্য বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে মোট প্রতিশ্রুতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১২৭ কোটি ৩০ লাখ ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৯১ কোটি ৬ লাখ ৭০ হাজার ডলার। অর্থাৎ প্রতিশ্রুতি বেড়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ।
মোট প্রতিশ্রুতির মধ্যে ঋণ ১১৪ কোটি ৮০ লাখ ডলার এবং অনুদান ১২ কোটি ৫৪ লাখ ৫০ হাজার ডলার।
ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, ইস্টার্ন রিফাইনারি প্রকল্পের আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণে ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (আইএসডিবি) কাছ থেকে ১০০ কোটি ডলারের ঋণ প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে।
তবে ঋণের প্রতিশ্রুতি পেলেই তাৎক্ষণিকভাবে অর্থ ছাড় হয় না বলে মনে করেন মুজেরি। তাঁর মতে, নতুন সরকার গঠনের পর উন্নয়ন সহযোগীরা সরকারের নীতি ও পরিকল্পনা পর্যালোচনা করছে। আগের সরকারের সময়ে করা কিছু চুক্তি ও ঋণব্যবস্থার ধারাবাহিকতা নিয়েও জটিলতা রয়েছে। এসব কারণে অর্থ ছাড়ে বিলম্ব হতে পারে।
আইএমএফের সঙ্গে নতুন কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা
বর্তমানে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে নতুন কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করছে বাংলাদেশ সরকার। মুজেরির মতে, আইএমএফের সঙ্গে সফল সমঝোতা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বড় উন্নয়ন সহযোগীরা অনেক সময় ঋণ দেওয়ার আগে আইএমএফের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দেশের কর্মসূচি ও সমঝোতার অগ্রগতি বিবেচনায় নেয়।
আইএমএফের অর্থায়ন নিশ্চিত না হলে অন্যান্য বহুপক্ষীয় ঋণদাতার কাছ থেকেও বড় অঙ্কের অর্থ পাওয়া কঠিন হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।
সরকারকে দ্রুত আইএমএফের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানো এবং বিদেশি সহায়তার প্রবাহ বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন এই অর্থনীতিবিদ। তাঁর মতে, এতে সরকারি অর্থায়নের ওপর চাপ কমবে এবং অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এড়ানো সম্ভব হবে।