মো: শরিফুল ইসলাম: মানব সভ্যতার বিকাশে নির্মাণ শিল্পে সিমেন্টের আবিস্কার একটি যুগান্তকারী ঘটনা বা বিস্ময়। একটি দেশ বা রাষ্ট্রের উন্নতির জন্য প্রয়োজন সভ্যতার বিকাশ। গুহা থেকে যখন মানুষ চার দেয়ালের মাঝে বসতি গড়তে শুরু করে তখন থেকেই ধাপে ধাপে টেকসই বসতি স্থাপনে আধুনিক নির্মাণসামগ্রীর ব্যবহার করে আসছে। একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিমাপের বিভিন্ন সূচকের মধ্যে নির্মাণ বা অবকাঠামো খাত অন্যতম। লোহা, ইট, বালু, পাথরের সাথে নির্মাণখাতকে এগিয়ে নিতে বড় ভূমিকা রাখছে সিমেন্ট।
বলা যায়, আজকের উন্নত বিশ্ব কিংবা ডিজিটাল বাংলাদেশের যোগাযোগসহ সকল অবকাঠামো উন্নয়নের পেছনে অন্যতম চালিকাশক্তি সিমেন্ট শিল্প। আগামীর স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণেও দেশবাসীর আস্থার মজবুত ভিত হতে পারে এই নির্মাণ সামগ্রটি। তবে সিমেন্টের প্রধান কাঁচামাল ক্লিংকার, চুনাপাথর, জিপসাম, স্ল্যাগ ও ফ্লাই অ্যাশ আমদানিতে খরচ বেড়ে যাওয়া এবং এসব পণ্যে অতিরিক্ত কর আরোপ এই শিল্পের উন্নতিতে কিছুটা অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দেশে সিমেন্ট শিল্পের ইতিহাস
বাংলাদেশে প্রথম সিমেন্ট কারখানা স্থাপিত হয় ১৯৪১ সালে, সিলেটের ছাতক উপজেলার সুরমা নদীর তীরে। যার নাম ছিল আসাম বেঙ্গল সিমেন্ট কোম্পানি। স্বাধীনতার পর ছাতক সিমেন্ট বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসির) অধীনে যায়। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে ১৯৭৩ সালে চিটাগাং সিমেন্ট ক্লিংকার অ্যান্ড গ্রাইন্ডিং ফ্যাক্টরি নামের একটি কারখানা হয়, যা বর্তমানে হাইডেলবার্গ সিমেন্ট দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।
১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত মেঘনা সিমেন্ট ইন্ডাস্ট্রি স্বাধীন বাংলাদেশে দেশীয় মালিকানায় দেশের প্রথম বেসরকারি খাতের মিল। আর ১৯৯৪ সালের ৩১শে ডিসেম্বর সিমেন্ট খাতে দেশের সবচেয়ে বড় উদ্যোক্তা হিসেবে প্রথমে এগিয়ে আসে এম আই সিমেন্ট ফ্যাক্টরি বা ক্রাউন সিমেন্ট। যা দেশের অবকাঠামো উন্নয়নে বিশাল অবদান রেখে চলছে।
২০০০ সালে মেট্রোসেম সিমেন্ট, ২০০১ সালে প্রিমিয়ার সিমেন্ট, ২০০২ সালে শাহ্ সিমেন্ট, ফ্রেশ সিমেন্ট, আকিজ সিমেন্ট ও আনোয়ার সিমেন্ট, ২০০৩ সালে আমান সিমেন্ট ও মীর সিমেন্ট বাজারে আসে। পুরোনো কোম্পানিগুলো নিয়মিত বিরতিতে তাদের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়েছে। বড় গ্রুপগুলো সিমেন্ট উৎপাদনে আধুনিক ভার্টিক্যাল রোলার মিল (ভিআরএম) প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। ২০১০ সালে রেজিস্ট্রিকৃত সিমেন্ট কারখানার সংখ্যা ৭৪ হলেও বর্তমানে উৎপাদনে নিয়োজিত কারখানার সংখ্যা মাত্র ৩৫টি। এসব সিমেন্ট কারখানার মিলিত উৎপাদন ক্ষমতা বছরে ২৫ মিলিয়ন টনেরও বেশি।
সিমেন্টের কাঁচামালের দুষ্প্রাপ্যতা
সিমেন্ট উৎপাদন করতে গিয়ে কাঁচামাল হিসেবে প্রাথমিক ধাপে ব্যবহার করা হয় চুনাপাথর (লাইমস্টোন) এবং মাটি। এগুলোকে প্রথমে চূর্ণ করা হয়, তারপর ঢুকানো হয় বিশাল আকৃতির সিলিন্ডারের ভেতর। সেখানে ১৪৫০ থেকে ১৫০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় মিশ্রণটিকে উত্তপ্ত করা হয়, যাকে বলা হয় ক্যালসিনেশন। উচ্চ তাপমাত্রায় উপাদানগুলো ভেঙে ক্যালসিয়াম অক্সাইড ও কার্বন-ডাই-অক্সাইডে পরিণত হয়। এই প্রক্রিয়ায় তৈরি হয় ক্লিংকার। ক্লিঙ্কার ঠান্ডা করে মেশানো হয় জিপসাম ও চুনাপাথর। সঙ্গে আনুপাতিকহারে মেশানো হয় লোহার আকরিক অথবা ছাই, যেগুলো স্ল্যাগ এবং ফ্লাইঅ্যাশ নামে বেশি পরিচিত। এরপর মিশ্রণটি একটি বলমিলের ভেতরে চূর্ণ করে তৈরি হয় সিমেন্ট।
স্থানীয় কাঁচামাল এবং আমদানিকৃত ক্লিংকার উভয় উপাদান থেকেই স্থানীয়ভাবে সিমেন্ট তৈরি হয়। দেশীয় কোম্পানিগুলি চীন, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ফিলিপিন্স, ইন্দোনেশিয়া ও ভারত থেকে ক্লিনকার আমদানি করে। দেশের ব্যক্তিমালিকানাধীন সিমেন্ট কারখানাগুলো প্রায় ৬০ শতাংশ এবং বহুজাতিক কোম্পানিগুলো যেমন লাফার্জ মল্লিন্স, সিমেক্স, হলসিম, হিডেলবার্জ বাকি ৪০% সিমেন্ট উৎপাদন করে। দেশে প্রধান প্রধান সিমেন্ট কোম্পানিগুলো হলো- ক্রাউন সিমেন্ট, শাহ সিমেন্ট, আকিজ সিমেন্ট, ফ্রেশ, সেভেন সার্কেল, আরামিত ও রয়েল ইত্যাদি। যেসব সিমেন্ট কারখানা আমদানিকৃত ক্লিংকার থেকে সিমেন্ট তৈরি করে তাদের অবস্থান মূলত ঢাকা, চট্টগ্রাম ও মোংলায়।
চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেটে সিমেন্টের প্রধান কাঁচামাল ক্লিংকার আমদানিতে প্রতি টনে শুল্ক ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭০০ টাকা করা হয়েছে। সিমেন্ট খাতের উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন- বিসিএমএ’র তথ্য বলছে, ডলার-সংকটের কারণে ঋণপত্র (এলসি) খুলতে সমস্যায় পড়ছেন উদ্যোক্তারা। ফলে সিমেন্টের কাঁচামাল আমদানিতে বিঘ্ন ঘটছে। আবার গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটে সিমেন্টের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।
সিমেন্টের পাঁচ ধরনের কাঁচামাল আমদানিতে অগ্রিম আয়কর (এআইটি) দশমিক ৫০ শতাংশ করার দাবি জানিয়েছেন বিসিএমএর নেতারা। তাই সিমেন্টের পাঁচটি কাঁচামাল আমদানিতে অগ্রিম আয়কর-ক্লিংকারে ২ শতাংশ; স্লাগ ও লাইমস্টোনে ৩ শতাংশ; ফ্লাই অ্যাশ ও জিপসামে ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে দশমিক ৫০ শতাংশ করার দাবি জানান তারা।
বাংলাদেশে উৎপাদিত সিমেন্ট
বাংলাদেশের আবহাওয়া বিবেচনায় বেশ কয়েক ধরণের সিমেন্ট উৎপাদিত হয়। এর মধ্যে সাধারণ পোর্টল্যান্ড সিমেন্ট বা ওপিসি, পোর্টল্যান্ড কম্পোজিট সিমেন্ট বা পিসিসি সিমেন্ট বেশি উৎপাদিত হয়। পিসিসি সিমেন্টে ক্লিংকারের পরিমাণ ৬৫ শতাংশ থেকে ৭৯ শতাংশ, স্ল্যাগ, ফ্লাই অ্যাশ, লাইমস্টোন বা চুনাপাথর ২১ ভাগ থেকে ৩৫ ভাগ আর জিপসাম থাকে সর্বোচ্চ ০-৫ ভাগ পর্যন্ত। নির্মাণ কাজে এই সিমেন্ট ব্যাপক ব্যবহৃত হয়।
এছাড়া আইজোনিল সিমেন্ট প্লাস্টারের জন্য উৎপাদন করা হয়। যা বর্তমানে ক্রাউন্ট সিমেন্ট উৎপাদন করছে। এই সিমেন্ট পানি থেকে দেয়ালকে সম্পূর্ণভাবে সুরক্ষিত রাখে, যা সাধারণ প্লাস্টার দিতে পারে না। ঘরের দেয়ালকে ভেতর বা বাইরের পানি থেকে রক্ষা করে আইজোনিল সিমেন্ট।
এছাড়া ক্রাউন সিমেন্টসহ বেশ কয়েকটি কোম্পানী রেডিমিক্স উৎপাদন করছে। বর্তমানে আবাসন নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে এর চাহিদা অনেক বেশি। কারণ এখানে নির্মাণকারীদের খুব একটা ঝামেলা পোহাতে হয় না।
চাহিদার প্রায় দ্বিগুণ উৎপাদন
বর্তমানে দেশে বছরে প্রায় ২৫ মিলিয়ন টন সিমেন্ট ব্যবহৃত হয়, যা দেশেই উৎপাদিত হয়। সিমেন্ট উৎপাদনে দেশ এখন স্বয়ংসম্পূর্ণ। উৎপাদনে থাকা ৩৫টি কারখানার বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা ৭ কোটি ৯০ লাখ টনের বেশি। তবে কার্যকর উৎপাদন ক্ষমতা কিছুটা কম, প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ টন। যেখানে দেশে সিমেন্টের বাজারের আকার প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশি সিমেন্ট মূলত ভারতে যায়। আসামের বেশ কিছু বড় প্রকল্পে ব্যবহৃত হয়েছে বাংলাদেশি সিমেন্ট। দেশে বর্তমানে ৩৫টি দেশি-বিদেশি সিমেন্ট কোম্পানি আছে। এ খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ ৪০ হাজার কোটি টাকা। কর্মসংস্থান লক্ষাধিক। দেশে সিমেন্টের চাহিদা বছরে ৩ কোটি ৯০ লাখ টন। যদিও কারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা ৭ কোটি ৯০ লাখ টন। সেই হিসেবে উৎপাদন সক্ষমতার পুরোটা ব্যবহৃত হচ্ছে না।
স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে বড় অংশীদার হতে পারে ক্রাউন সিমেন্ট
সিমেন্ট শিল্পে আশাতীত অগ্রগতি সাধিত হওয়ার পেছনে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের মধ্যে বিপ্লবের প্রধান কারিগর- ক্রাউন সিমেন্ট। ১৯৯৪ সালের ৩১শে ডিসেম্বর এম.আই. সিমেন্ট ফ্যাক্টরি নামে মুন্সিগঞ্জের মোক্তারপুরে কারখানা গড়ে তোলেন কোম্পানীর স্বপ্নদ্রষ্টা আলহাজ্ব মো: খবির উদ্দিন মোল্লা। প্রতিষ্ঠানটির সিমেন্ট গুণগত দিক থেকে বিশ্বমানের। ক্রাউন সিমেন্টের মূল্য বিদেশের বাজারের চেয়ে অনেক কম। এমনকি ভারত ও পাকিস্তানের চেয়েও কম। বাংলাদেশ চাইলে দুবাই, আফগানিস্তান ও ভারতের দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোয় এই সিমেন্ট রপ্তানি করতে পারে। শুধু প্রয়োজন সরকারি সহযোগিতা। এদেশে সিমেন্ট শিল্পের অনেক বড় সম্ভাবনা রয়েছে। তাই এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশে পরিবেশবান্ধব সিমেন্ট শিল্প কারখানার প্রসার ঘটানো সম্ভব। ফলে সিমেন্ট উৎপাদন শিল্পে বাংলাদেশ এশিয়ার প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।
ক্রাউন সিমেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘‘সিমেন্ট সভ্যতার প্রতীক, বন্ধনের প্রতীক, বন্ধুত্বের প্রতীক, দীর্ঘস্থায়ীত্বের প্রতীক, নিরাপদ ও নিরাপত্তার প্রতীক। ক্রাউন সিমেন্টের গুণগতমান, সেবার মান, ডেলিভারির কোয়ালিটি, সরবরাহের কোয়ালিটি কাস্টমারের কাছে আজ প্রমাণিত। কাস্টমারের আস্থা ক্রাউন সিমেন্টে, যা এখন দেশের চাহিদা ও বিদেশে রপ্তানীতে শীর্ষে। ভবিষ্যতে এ খাতে বহুমুখী সেবা দিয়ে আরো এগিয়ে যেতে চায় ক্রাউন সিমেন্ট’’। (সূত্র: ওয়েবসাইট)
ছবি: মো: আলমগীর কবির, ভাইস চেয়ারম্যান, ক্রাউন সিমেন্ট গ্রুপ
ক্রাউন সিমেন্টের ভাইস চেয়ারম্যান মো: আলমগীর কবির জানান, ‘‘সিমেন্টের গুণগত মান ঠিক করেন প্রকৌশলীরা, মান বজায় রেখে তাদের আস্থা আনতে পারলেই আরো বেশি সফলতা আসবে’’। তিনি আরো বলেন, বর্তমানে দেশের সবচেয়ে বড় উন্নয়ন প্রকল্প পদ্মাসেতু, দেশের প্রথম মেট্রোরেল ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে (উড়াল সড়ক), রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের মতো জটিল অবকাঠামোতে ক্রাউন সিমেন্ট ব্যবহৃত হচ্ছে। যা দেশের জন্য একটি মাইলফলক ’’।
ক্রাউন সিমেন্ট গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোল্লা মোহাম্মদ মজনু বলেন, ‘‘গুণগত মান, সরবরাহের সক্ষমতা ও বিপণন কৌশল, সবক্ষেত্রেই এগিয়ে ক্রাউন সিমেন্ট। ফলে সিমেন্ট খাতে বিদেশি কোম্পানিগুলোর উপর এদেশের সরকার, আবাসন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ জনগণের নির্ভরতা কমে গেছে’’। (সূত্র: ওয়েবসাইট)
এছাড়া প্রতিষ্ঠানটির অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো: মিজানুর রহমান মোল্লা বলেন, ‘‘বাড়ি বা স্থাপনার পরিপূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ক্রাউন সিমেন্ট সবসময়ই দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। দিনের পর দিন মানুষের নির্ভরতার প্রতীক হয়ে আমরা গড়ে যাচ্ছি আপনাদের স্বপ্নের মজবুত ভিত''। (সূত্র: ওয়েবসাইট)
কয়েক বছর আগেও ব্যক্তি খাতে সিমেন্টের চাহিদা ছিল মোট বাজারের ৬০ শতাংশ। অন্য খাতে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় এখন সেখানকার চাহিদা কমে দাঁড়িয়েছে ৫০ শতাংশে। এছাড়া বর্তমানে সিমেন্টের বাজারের ২৫ শতাংশ সরকারি বিভিন্ন উন্নয়নকাজ, ১০ শতাংশ শিল্প ও বাণিজ্যিক ভবন, ১০ শতাংশ আবাসন খাত এবং বাকি ৫ শতাংশ বৈদ্যুতিক খুঁটি ও কংক্রিটের দখলে রয়েছে। সরকারি মেগা প্রকল্প ও উন্নয়নমূলক কাজে সিমেন্টের চাহিদা যে হারে বেড়েছে, ব্যক্তি খাতে সেভাবে বাড়েনি।
দেশে সিমেন্ট রপ্তানীতে শীর্ষে ক্রাউন
গত দুই দশক ধরে দেশের সিমেন্ট শিল্প অনেক এগিয়েছে। বাংলাদেশের সিমেন্টের মানও অনেক উন্নত। একই সঙ্গে দেশের সিমেন্ট উৎপাদনও বৃদ্ধি পেয়েছে কয়েকগুণ। ফলে এখন দেশের চাহিদা পূরণ করে সিমেন্ট রপ্তানি করা হচ্ছে। তবে এজন্য সরকারের পলিসি সাপোর্ট প্রয়োজন। গুণগত মানে আপোষহীন বিশ্বমানের ক্রাউন সিমেন্ট প্রতিষ্ঠাকালীন সময় থেকেই শুধু দেশে নয়, সুনাম অর্জন করেছে বিদেশের মাটিতেও। আবার সিমেন্ট রপ্তানির ক্ষেত্রেও বাংলাদেশে ক্রাউন সিমেন্ট রয়েছে সবার শীর্ষে। আর তাই ক্রাউন সিমেন্টকে সবাই চিনে বাংলাদেশের গ্লোবাল সিমেন্ট হিসেবে। দেশের রপ্তানী খাতে অসামান্য অবদানের জন্য ২০১৩-২০১৪ অর্থবছরে জাতীয় রপ্তানী ট্রফি পেয়েছে ক্রাউন সিমেন্ট। এছাড়া বেশ কয়েকবার আইসিএমএবি অ্যাওয়ার্ড জিতেছে দেশের সুনামধন্য এই শিল্প প্রতিষ্ঠানটি।
বাংলাদেশ থেকে ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় সাতটি রাজ্য, মিয়ানমার ও নেপালে সিমেন্ট রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ আছে। তবে যোগাযোগ অবকাঠামোর অভাব ও নানা শুল্ক-অশুল্ক বাধায় তা ধরা যাচ্ছে না। ভবিষ্যতে বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও ভুটানে পণ্যের অবাধ যাতায়াত সম্ভব হলে বাংলাদেশের সিমেন্ট রপ্তানি বাড়তে পারে বলে আশা করছেন উদ্যোক্তারা।
এক সময় দেশের বাজারে বিদেশি সিমেন্টের রাজত্ব থাকলেও সেটি এখন পুরোপুরিই দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রণে। ক্রমেই তার পরিসর বাড়ছে। বলা চলে, সিমেন্টের বাজার এখন প্রায় পুরোপুরিই দখলে রেখেছে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো। সম্ভাবনাময় সিমেন্ট শিল্পের এই উত্থানের ফলে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেও অবদান রাখছে সিমেন্ট শিল্প। চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে (জানুয়ারি–সেপ্টেম্বর) সিমেন্টের বাজারে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৭ শতাংশ। বছর শেষে তা ৬ থেকে ৭ শতাংশের মধ্যে থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিশ্বে বাংলাদেশের সন্তোষজনক অবস্থান
সিমেন্টের বৈশ্বিক বাজারের আকারও অনেক বড় হয়েছে। গ্লোবাল সিমেন্ট প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে বিশ্বে ৫১২ কোটি ৯০ লাখ টন সিমেন্ট ব্যবহৃত হয়। ওই বছর সিমেন্ট উৎপাদনের সক্ষমতা ছিল ৭১৩ কোটি ৮০ লাখ টন। সিমেন্টের বাজারের আকার ছিল ৩৯৫ বিলিয়ন ডলার বা ৩৩ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক সিমেন্ট খাতের পোর্টাল সেমনেট ডটকম প্রকাশিত ‘গ্লোবাল সিমেন্ট রিপোর্ট–এর সর্বশেষ সংস্করণে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। প্রতি দুই বছর পরপর বিশ্বের সিমেন্ট খাতের তথ্য–উপাত্ত নিয়ে এই সমীক্ষা প্রকাশ করে তারা।
দেশভিত্তিক সিমেন্ট ব্যবহারে শীর্ষে রয়েছে চীন। এরপরের অবস্থান ভারতের। ২০১৬ সালে চীনে সিমেন্ট ব্যবহৃত হয় ২৩৯ কোটি টন। ভারতে ব্যবহৃত হয় প্রায় ২৯ কোটি টন।
বার্ষিক মাথাপিছু সিমেন্ট ব্যবহার
মাথাপিছু বাৎসরিক সিমেন্ট ব্যবহারে যদিও বাংলাদেশ এখনো অনেক পিছিয়ে, তারপরও সামগ্রিক সূচকে বিশ্বে সিমেন্ট ব্যবহারে বাংলাদেশের অবস্থান উপরের দিকেই থাকে। এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সিমেন্ট ব্যবহার হয় চীনে যা মাথাপিছু ১ হাজার ৮০০ কেজি। প্রতিবেশী ভারতে মাথাপিছু ৩২০ কেজি এবং মিয়ানমারে ২৮০ কেজি। সেই হিসেবে মাথাপিছু মাত্র ২০০ কেজি সিমেন্টের ব্যবহার নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান তালিকার নিচের দিকে হলেও আয়তনের হিসেবে আমাদের এই ছোট্ট দেশটির বার্ষিক চাহিদা প্রায় সাড়ে তিন কোটি মেট্রিক টন।
কাঁচামাল আমদানিতে আকস্মিক সম্পূরক শুল্ক আরোপ ও অতিরিক্ত অগ্রিম করারোপ, জ্বালানি সংকট, পরিবহন ভাড়া ও ডলারের মূল্য বৃদ্ধিসহ নানামুখী সমস্যায় দেশের সিমেন্ট শিল্প বর্তমানে দুরাবস্থার মধ্যে রয়েছে। এর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে সিমেন্টের মূল্যের ওপর। এছাড়া কোনো কোনো উৎপাদনকারী নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থা থাকলেও গ্যাস সংকটের কারণে প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারছে না এবং ফলশ্রুতিতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। দেশের নির্মাণ শিল্পের স্বার্থে সরকার যদি সিমেন্ট শিল্পে নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা করে, সিমেন্ট হতে পারে বাংলাদেশের অন্যতম রপ্তানী পণ্য। যা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিপ্লব ঘটাতে পারে।
মোঃ শরিফুল ইসলাম (শরীফ)
সাংবাদিক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ