সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার নতুন কর্মসূচি ‘প্রত্যয়’ সোমবার (১ জুলাই) থেকে চালু হচ্ছে। এদিকে ‘প্রত্যয় স্কিম’ বাতিল না হওয়ায় সারা দেশে সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বাত্মক কর্মবিরতির ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশন। শিক্ষকদের শত বিরোধিতার মধ্যেই প্রত্যয় স্কিম চালু করতে যাচ্ছে সরকার।
রাষ্ট্রায়ত্ত, স্বায়ত্তশাসিত, স্বশাসিত সংস্থায় যারা নতুন চাকরিতে যোগ দেবেন, তারা বাধ্যতামূলক এ কর্মসূচির আওতায় আসবেন। এই স্কিমের আওতায় থাকা চাকরিজীবীরা অবসরে যাওয়ার পর প্রচলিত পদ্ধতিতে পেনশন পাবেন না।
একই সঙ্গে পেনশন সুবিধা রয়েছে এমন সব সরকারি প্রতিষ্ঠানেও আগামী বছরের ১ জুলাই থেকে নতুন নিয়োগপ্রাপ্তরা এ স্কিমের আওতায় আসবেন।
এই স্কিমের বিরোধিতা করে গত তিন মাস ধরে আন্দোলন করছেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা। আজ থেকেই সর্বাত্মক কর্মবিরতির ঘোষণা দিয়েছেন তারা। প্রত্যয় স্কিমের আওতায় আসা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মনে করেন, এটি চালু হলে চাকরিপ্রার্থীরা সরকারি চাকরিতে আসতে নিরুৎসাহিত হবে।
জানা গেছে, গত মার্চ মাসে প্রত্যয় চালুর বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এরপর থেকেই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এই স্কিমের বিরোধিতা করে আসছেন।
চারটি আলাদা কর্মসূচি (স্কিম) নিয়ে গত বছরের ১৭ আগস্ট সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার যাত্রা শুরু হয়। স্কিমগুলো মধ্যে রয়েছে- প্রগতি, সুরক্ষা, প্রবাস ও সমতা। প্রগতি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মালিক ও কর্মচারীদের জন্য। সমতা নিম্নআয়ের মানুষের জন্য। প্রবাস শুধু প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য। আর সুরক্ষা রিকশাচালক, কৃষক, শ্রমিক, কামার, কুমার, জেলে, তাঁতি ইত্যাদি স্বকর্মে নিয়োজিত নাগরিকদের জন্য।
জানা গেছে, চলমান চার কর্মসূচিতে এ পর্যন্ত প্রায় ৩ লাখ ৩৫ হাজার গ্রাহক হয়েছেন, যার বিপরীতে জমা পড়েছে ৯৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৯৩ কোটি টাকা বিনিয়োগও হয়েছে ট্রেজারি বন্ডে।
প্রত্যয় স্কিমে অংশগ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা কর্মচারীর প্রাপ্ত মূল বেতনের ১০ শতাংশ বা সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা, যা কম হয় তা কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বেতন থেকে কর্তন করা হবে এবং সমপরিমাণ অর্থ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা প্রদান করবে।
এরপর উভয় অর্থ ওই প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত ওই কর্মকর্তা-কর্মচারীর কর্পাস হিসাবে জমা করবে। এ প্রক্রিয়ায় ওই কর্মকর্তা-কর্মচারীর পেনশন ফান্ড গঠিত হবে এবং ওই ফান্ড জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক লাভজনক খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রাপ্য মুনাফা এবং চাঁদা হিসেবে জমা করা অর্থের ভিত্তিতে পেনশন প্রদান করা হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয় জানায়, বিদ্যমান সিপিএফ ব্যবস্থায় কর্মচারী মূল বেতনের ১০ শতাংশ এবং প্রতিষ্ঠান মূল বেতনের ৮ দশমিক ৩৩ শতাংশ প্রদান করে থাকে। প্রত্যয় স্কিমে প্রতিষ্ঠান প্রদান করবে মূল বেতনের ১০ শতাংশ, যা সিপিএফ ব্যবস্থা থেকে এক দশমিক ৬৭ শতাংশ বেশি। প্রত্যয় স্কিমে একজন ব্যক্তি একটি প্রতিষ্ঠানে যোগদানের পর মাসিক ২ হাজার ৫০০ টাকা নিজ বেতন থেকে এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান থেকে একই পরিমাণ টাকা ৩০ বছর চাঁদা প্রদান করলে তিনি অবসরে যাওয়ার পর অর্থাৎ ৬০ বছর বয়স থেকে মাসিক ৬২ হাজার ৩৩০ টাকা হারে পেনশন পাবেন। এ ক্ষেত্রে ৩০ বছর ধরে মাসিক ২ হাজার ৫০০ টাকা হারে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর নিজ বেতন থেকে প্রদত্ত মোট চাঁদার পরিমাণ ৯ লাখ টাকা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থা কর্তৃক প্রদত্ত মোট চাঁদার পরিমাণ ৯ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট কর্মচারী মিলিয়ে সর্বমোট চাঁদার পরিমাণ হবে ১৮ লাখ টাকা। তিনি যদি ৭৫ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন, তবে ১৫ বছরে পেনশন প্রাপ্য হবেন এক কোটি ১২ লাখ ১৯ হাজার ৪০০ টাকা, যা সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর নিজ জমার ১২ দশমিক ৪৭ গুণ।
এই স্কিমের আওতায় রয়েছে- বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি), বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ), ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশসহ (আইসিবি) সব রাষ্ট্রমালিকানাধীন ও সরকারি ব্যাংক; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, সাধারণ বীমা করপোরেশনসহ সব করপোরেশন, পেট্রোবাংলা, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি), বিএসটিআইসহ প্রায় ৪০০ সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের নতুন কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য প্রত্যয় প্রযোজ্য হবে। সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পদ্মা অয়েল, যমুনা অয়েলসহ সরকারের হাতে ৫০ শতাংশের বেশি শেয়ারের মালিকানা রয়েছে, এমন কোম্পানিগুলোতে নতুন যোগ দেওয়া কর্মীরাও আর বিদ্যমান নিয়মে পেনশন পাবেন না।
‘প্রত্যয় স্কিম’ প্রসঙ্গে অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ গণমাধ্যমকে বলেছেন, প্রত্যয় চালু হওয়ায় যদি কোনো অসংগতি থাকে, তা আলোচনা করে সমাধান করা উচিত। এ স্কিম সর্বজনীন হচ্ছে কিনা তা দেখা দরকার। যদি তা না হয় এবং যদি তা বৈষম্যপূর্ণ হয়, তাহলে সেটি সমাধান করতে হবে।