যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শহর নিউইয়র্ক সিটির প্রথম মুসলিম মেয়র হিসেবে শপথ নিয়েছেন মার্কিন বামপন্থিদের আস্থার প্রতীক জোহরান মামদানি। তিনি ব্যতিক্রমী আয়োজনের মধ্য দিয়ে একটি সাবওয়ে স্টেশনে পবিত্র কুরআন হাতে শপথ গ্রহণ করেন।
শপথের এ আয়োজনে জোহরান পবিত্র কোরআনের তিনটি কপি ব্যবহার করেন। সাবওয়ে স্টেশনের বিশেষ অনুষ্ঠানে তার হাতে ছিল দুটি কপি।
স্বামী জোহরানের শপথের জন্য পবিত্র কোরআনের বহু পুরোনো কপিটি নির্বাচনে রমা দুওয়াজিকে সহায়তা করেছেন একজন গবেষক। কপিগুলোর একটি জোহরানের দাদার ও অন্যটি আঠারো শতকের শেষভাগ বা উনিশ শতকের শুরুর দিকের একটি পকেট কোরআন। পবিত্র কোরআনের ঐতিহাসিক এ ক্ষুদ্রাকৃতির কপি নিউইয়র্ক পাবলিক লাইব্রেরির শমবার্গ সেন্টার ফর রিসার্চ ইন ব্ল্যাক কালচারের সংগ্রহ থেকে নেওয়া হচ্ছে।
নিউইয়র্কের ইতিহাসে এটি একটি নতুন অধ্যায় হিসেবে ধরা হচ্ছে— মামদানি প্রথম মুসলিম, প্রথম দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত এবং বহু প্রজন্মের মধ্যে সবচেয়ে কম বয়সী হিসেবে মেয়রের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। শপথ গ্রহণের মাধ্যমে তিনি রূপান্তরমূলক পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নিজের মেয়াদকাল শুরু করেছেন।
সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা জানিয়েছে, ডেমোক্র্যাট মামদানি স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার রাত পেরিয়ে ভোরের কিছু পর নিউইয়র্ক সিটির ম্যানহাটনের একটি ঐতিহাসিক, ব্যবহারবহির্ভূত সাবওয়ে স্টেশনে শপথ নেন। শপথের সময় তিনি হাতে পবিত্র কুরআন ধরে ছিলেন। মামদানি বলেন, ‘এটা সত্যিই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সম্মান ও সৌভাগ্য।’
নিউইয়র্কের অ্যাটর্নি জেনারেল ও রাজনৈতিক মিত্র লেটিশিয়া জেমস শপথ অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন। শপথ অনুষ্ঠানটি আয়োজন হয় পুরোনো সিটি হল স্টেশনে। এটি শহরের প্রথম দিককার অন্যতম সাবওয়ে স্টেশন যা এর দৃষ্টিনন্দন খিলান করা ছাদের কারণে বিখ্যাত।
পরে আরও আনুষ্ঠানিকভাবে অনেক বড় আয়োজনে শহরের সিটি হলে স্থানীয় সময় দুপুর ১টায় আবারও শপথ নেবেন মামদানি। শপথ পড়াবেন যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স। বর্ষীয়ান এই রাজনীতিককে মামদানির রাজনৈতিক নায়কদের একজন বলা হয়। এরপর ব্রডওয়ের বিখ্যাত ‘ক্যানিয়ন অব হিরোজ’ এলাকায় জনসাধারণের জন্য এক উৎসবের আয়োজন করা হবে।
আল জাজিরা বলছে, নিউইয়র্কের মেয়র হিসেবে শপথ নেওয়ার পর এখন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে কঠিন ও নজরকাড়া রাজনৈতিক দায়িত্বগুলোর একটি সামলাতে হবে মামদানিকে। শহরের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম মেয়র হওয়ার পাশাপাশি মামদানি প্রথম দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত এবং আফ্রিকায় জন্ম নেওয়া প্রথম মেয়রও বটে। মাত্র ৩৪ বছর বয়সেই তিনি এই দায়িত্ব পেলেন।
নির্বাচনি প্রচারে ‘জীবনযাত্রার সহনীয় খরচ’ বা ‘অ্যাফোর্ডেবিলিটি’কে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসেন তিনি। ডেমোক্র্যাটিক সোশ্যালিস্ট এই নেতা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, বিশ্বের অন্যতম ব্যয়বহুল এই শহরটিতে মানুষের জীবনযাত্রার খরচ কমাতে রূপান্তরমূলক নীতি প্রয়োগ করবেন তিনি। তার অঙ্গীকারের মধ্যে ছিল— বিনামূল্যে শিশু দেখভালের ব্যবস্থা, ফ্রি বাস সার্ভিস, প্রায় ১০ লাখ পরিবারের জন্য ভাড়া স্থগিত (রেন্ট ফ্রিজ) এবং সিটি করপোরেশনের পরিচালনায় পরীক্ষামূলক মুদি দোকান চালু করা।
তবে কেবল নীতিই নয়- শহরের আবর্জনা, বরফ পরিষ্কার, ইঁদুরের উপদ্রব, সাবওয়ে বিলম্ব কিংবা রাস্তায় খানাখন্দ— সব কিছুর দায়-দায়িত্বও তাকেই সামলাতে হবে।
উগান্ডার কাম্পালায় জন্ম নেওয়া মামদানি খ্যাতনামা চলচ্চিত্র নির্মাতা মীরা নায়ার ও শিক্ষাবিদ-লেখক মাহমুদ মামদানির সন্তান। সাত বছর বয়সে পরিবার নিয়ে তিনি নিউইয়র্কে আসেন। ৯/১১–এর পর মুসলমানদের জন্য অস্বস্তিকর এক শহরেই বড় হয়েছেন তিনি। ২০১৮ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব লাভ করেন।