মমতার বাড়িতে হামলার হুমকি, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ফের উত্তেজনা

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে আবার উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাম্প্রতিক বঙ্গ সফরের দিনই রাজ্যের মন্ত্রী শশী পাঁজার বাড়িতে হামলার অভিযোগ ঘিরে রাজনৈতিক সংঘাত তীব্র হয়েছে। ঘটনার পর বিজেপির বিরুদ্ধে প্রাণনাশের চেষ্টার অভিযোগ তুলেছে রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস। অন্যদিকে বিজেপি নেতাদের বক্তব্য ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

ঘটনার পর রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিয়েছেন বিজেপির নেতা দিলীপ ঘোষ। রোববার (১৫ মার্চ) সকালে কলকাতার নিউটাউনের ইকো পার্কের সামনে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি এমন কিছু মন্তব্য করেন, যা নিয়ে রাজ্য রাজনীতিতে তীব্র আলোচনা শুরু হয়েছে। 

এর আগে ব্রিগেড ময়দানের সভায় বিজেপির তারকা প্রচারক মিঠুন চক্রবর্তী রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে আইসিইউতে পাঠানোর হুঁশিয়ারির মতো বক্তব্য দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সেই বক্তব্যের পরপরই দিলীপ ঘোষের মন্তব্য রাজ্যের রাজনৈতিক পরিবেশকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে।

দিলীপ ঘোষ বলেন, তৃণমূলকে মোকাবিলা করতে বাইরের লোকের প্রয়োজন নেই। তাদের নিজেদের কর্মীরাই যথেষ্ট। 

তিনি দাবি করেন, সারা বাংলায় তারা রাজনৈতিকভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলবেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী দলীয় কর্মীদের তিনি সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। 

তিনি বলেন, তাদের কর্মীরা প্রস্তুত আছে এবং সাধারণ মানুষকেও এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। তার বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, রাজনৈতিক সংঘাত আরও বাড়তে পারে। 

তিনি বলেন, কলকাতায় যদি তারা শক্তভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে তাহলে সারা বাংলায় তা ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। 

শশী পাঁজার বাড়িতে হামলার ঘটনা নিয়েও মন্তব্য করেন তিনি। তার দাবি শশী পাঁজা নাটক করছেন। তিনি বলেন, এর আগে সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের গ্রেপ্তারের সময়ও তৃণমূল কর্মীরা ‘মব’ নিয়ে এসে পার্টি অফিসে ভাঙচুর করেছিলেন। তার অভিযোগ সেই ধরনের ঘটনাই আবার ঘটছে।

দিলীপ ঘোষ বলেন, তাদের বাসে ইট পাটকেল ছোড়া হয়েছে এবং তৃণমূল কর্মীরা সংঘর্ষে জড়িয়েছেন। তার মতে তৃণমূল নেতারা বুঝতে পারছেন না যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি সব সময় একই রকম থাকবে না। এরপর আরও কঠোর ভাষায় তিনি বলেন, যদি সতর্ক না হয় তাহলে শুধু মাথায় নয়, শরীরের আরও জায়গায় ব্যান্ডেজ বাঁধতে হবে। তার বক্তব্যে বোমা বন্দুকের মতো শব্দও উঠে আসে যা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।

দিলীপ ঘোষ বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তার বক্তৃতায় সবকা সাথ সবকা বিকাশ সবকা হিসাবের কথা বলেছেন। তার ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, হিসাব মানে শুধু অর্থের হিসাব নয়। এতদিন যে রাজনৈতিক গুন্ডামি হয়েছে তারও হিসাব দিতে হবে।

এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যদি শশী পাঁজার বাড়িতে হামলা হতে পারে তাহলে কালীঘাটেও হামলা হতে পারে। 

তিনি আরও বলেন, মদন মিত্র বা চেতলার বাড়িতেও হামলার ঘটনা ঘটতে পারে। তার এ মন্তব্য ঘিরে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। 

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে কালীঘাটের নাম উল্লেখ করায় বিতর্ক আরও বেড়েছে। কারণ, কালীঘাটেই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ি অবস্থিত।  এ কারণে অনেকেই এ মন্তব্যকে মুখ্যমন্ত্রীকে লক্ষ্য করে হুমকি হিসেবে দেখছেন। 

দিলীপ ঘোষ তার বক্তব্যে আরও বলেন, বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি জে পি নাড্ডার ওপরও পশ্চিমবঙ্গে হামলা হয়েছিল। তিনি দাবি করেন তখন তিনি নিজেও গাড়িতে ছিলেন। সেই প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, রাজনৈতিক উত্তেজনা নতুন কিছু নয়। 

তিনি আরও বলেন, মোদির বিরুদ্ধে গো ব্যাক লেখা হোর্ডিং দেওয়া হয়েছিল। পরে একদিন কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখানোর পর সেই হোর্ডিং সরিয়ে নেওয়া হয় বলে তার দাবি। 

এই ঘটনার পর তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে। দলটির নেতাদের মতে বিজেপি রাজনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে বলেই হুমকির রাজনীতি করছে। তাদের দাবি গত কয়েকটি নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি আশানুরূপ ফল করতে পারেনি।  আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে বিজেপির মধ্যে চাপ বাড়ছে।

তৃণমূলের দাবি বিজেপির সংগঠন রাজ্যে দুর্বল এবং দলটির ভেতরে গোষ্ঠীকোন্দল রয়েছে। সেই পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক সংঘাত উস্কে দিয়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে তাদের অভিযোগ। অন্যদিকে বিজেপি নেতারা বলছেন, তারা রাজনৈতিকভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলছেন এবং তৃণমূলের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াই করছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরেই তীব্র সংঘাতপূর্ণ। নির্বাচনের আগে এ ধরনের উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে।

বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজ্যে রাজনৈতিক মেরুকরণ ক্রমশ বাড়ছে। দুই প্রধান রাজনৈতিক শক্তি তৃণমূল কংগ্রেস এবং বিজেপির মধ্যে সংঘাত আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা করছেন অনেকেই। তবে তৃণমূলের দাবি বাংলার মানুষ হিংসার রাজনীতি মেনে নেবে না। তারা বলছে, শেষ পর্যন্ত ভোটাররাই এর জবাব দেবে। 

এদিকে রাজনৈতিক মহলের অনেকেই মনে করছেন, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো রাজ্যের নির্বাচনি রাজনীতির তাপমাত্রা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।