পৃথিবীর সঙ্গে চাঁদে যাওয়া আর্টেমিস-২ এর ‘যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন’ 

দীর্ঘ ৫০ বছরেরও বেশি সময় পর মানবসভ্যতা আবারও চাঁদের বুকে এক রোমাঞ্চকর ও রহস্যময় অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হলো। নাসার আর্টেমিস-২ মিশনের ওরিয়ন মহাকাশযানটি সম্প্রতি চাঁদের অন্ধকার অংশে (ফার সাইড) প্রবেশের পর পৃথিবীর সঙ্গে সম্পূর্ণ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। পূর্বপরিকল্পিত এই নীরবতার সময়টুকুতে চার নভোচারী মহাবিশ্বের এক গভীর নির্জনতায় কাটান, যা পৃথিবীজুড়ে তৈরি করে এক টানটান উত্তেজনা।

চাঁদের বিশালত্বের আড়ালে চলে যাওয়ায় ওরিয়ন মহাকাশযানের রেডিও এবং লেজার সিগন্যালগুলো পৃথিবীর রিসিভারে পৌঁছাতে বাধা পায়। ফলে টানা ৪০ মিনিট নাসার মিশন কন্ট্রোল বা পৃথিবীর কোনো প্রান্ত থেকেই নভোচারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। 

প্রকৌশলীরা আগে থেকেই জানতেন যে চন্দ্রপৃষ্ঠের আড়ালে গেলে এমনটি ঘটবে, তবুও সিগন্যাল ড্রপ হওয়ার মুহূর্তটি ছিল বেশ উদ্বেগজনক। এই সময়ে মহাকাশযানটি সম্পূর্ণভাবে তার প্রি-প্রোগ্রামড কম্পিউটারের নির্দেশনায় পরিচালিত হয়।

যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে পাইলট ভিক্টর গ্লোভার অত্যন্ত আবেগঘন এক বার্তা পাঠান। 

তিনি বলেন, ‘পৃথিবীর সবচেয়ে বড় রহস্য হলো ভালোবাসা। নিচের সবাইকে আমরা চাঁদ থেকে অনেক অনেক ভালোবাসি।’ নাসার কমিউনিকেশন ডেস্ক থেকে লিয়া চেশিয়ার মুস্তাচিও যখন ‘আমরা তোমাদের অপর প্রান্তে দেখার অপেক্ষায় থাকলাম’ বলে বিদায় জানান, তখন গ্লোভারের সংক্ষিপ্ত উত্তর ছিল— ‘দেখা হবে ওই প্রান্তে।’ এরপরই শুরু হয় সেই দীর্ঘ নীরবতা।

এই ৪০ মিনিট নভোচারীরা কাটিয়েছেন মহাজাগতিক এক নিস্তব্ধতায়। সেখানে মিশন কন্ট্রোলের কোনো নির্দেশনা ছিল না, ছিল কেবল মহাকাশযানের ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতির মৃদু গুঞ্জন। জানালার বাইরে তারা দেখছিলেন চাঁদের সেই রুক্ষ ও আদিম ল্যান্ডস্কেপ, যা মানুষ কেবল রোবটের মাধ্যমেই ম্যাপ করতে পেরেছে। সুউচ্চ পর্বত আর প্রাচীন উল্কাপাতের ফলে তৈরি হওয়া গভীর গর্তের সেই দৃশ্যগুলো ছিল একাধারে সুন্দর ও ভয়ংকর।

অবশেষে নীরবতা ভেঙে যখন ওরিয়ন আবার পৃথিবীর সিগন্যাল সীমানায় ফিরে আসে, তখন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে পুরো বিশ্ব। যোগাযোগ পুনরায় স্থাপিত হওয়ার পর কানাডিয়ান নভোচারী জেরেমি হ্যানসেন নাসার ভিউয়িং গ্যালারিতে থাকা তার স্ত্রী ক্যাথরিন এবং ছেলে ডেভনকে উদ্দেশ্য করে বার্তা পাঠান। অত্যন্ত উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমরা এখানে কী পরিমাণ রোমাঞ্চ অনুভব করছি, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। চাঁদের অপর পিঠে থাকা এবং সেখান থেকে পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে থাকা এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা। আমরা দ্রুতই ফিরে আসছি।’

আর্টেমিস-২ মিশনের এই সফল ‘ফ্লাই বাই’ এবং মহাকাশযানের গুরুত্বপূর্ণ ইঞ্জিন বার্ন সফলভাবে সম্পন্ন হওয়া নভোচারীদের পৃথিবীতে ফেরার পথ প্রশস্ত করেছে। চাঁদের রহস্যময় অন্ধকার অংশে কাটানো সেই ৪০ মিনিট মানব মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসে এক অনন্য ও শিহরণ জাগানো মুহূর্ত হিসেবে লিপিবদ্ধ হয়ে থাকবে।