পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় টানা ছয় সপ্তাহের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর চরম সংশয় আর অবিশ্বাসের মাঝেই ইসলামাবাদে শুরু হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের ঐতিহাসিক শান্তি আলোচনা।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে শনিবার (১১ এপ্রিল) সকালে দুই দেশের প্রতিনিধিদের পৃথক বৈঠকের পর সন্ধ্যায় প্রথমবার সরাসরি এক টেবিলে বসেন দুই চিরবৈরী রাষ্ট্রের শীর্ষ কর্মকর্তারা। টানা দুই ঘণ্টা তাদের এই আলোচনা চলে।
মার্কিন হামলার ভয়াবহতা তুলে ধরতে কালো পোশাক পরে এবং নিহত স্কুল শিক্ষার্থীদের জুতা ও ব্যাগ সঙ্গে নিয়ে পাকিস্তানে আসেন ইরানি প্রতিনিধিরা। হাইভোল্টেজ এ বৈঠকে মূলত সাতটি বিষয় সবচেয়ে গুরুত্ব পাচ্ছে।
লেবাননে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি, সব ধরনের মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম ধমনি হরমুজ প্রণালির ওপর নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণের দাবিতে অনড় ইরান।
অপরদিকে হরমুজকে শর্তহীনভাবে উন্মুক্ত করা এবং ইরানের পারমাণবিক ও মিসাইল কর্মসূচি চিরতরে বন্ধের শর্তে মরিয়া যুক্তরাষ্ট্র।
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর দুই দেশের এ শীর্ষ পর্যায়ের সরাসরি আলোচনা শেষ পর্যন্ত বিশ্বকে খাদের কিনারা থেকে ফেরাতে পারবে কি না, তা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
পাকিস্তানি একটি সূত্র জানিয়েছে, আলোচনা ইতিবাচক পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেরেনা হোটেলে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির এই আলোচনা দুই ঘণ্টা চলে। এরপর নৈশভোজের বিরতি দেওয়া হয়েছে।
আবার এ আলোচনা শুরু হবে। এ সময় পাকিস্তানের সেনাপ্রধানও উপস্থিত ছিলেন।
শুরুতে বলা হচ্ছিল, দুই দেশের প্রতিনিধিরা পরোক্ষভাবে আলোচনায় অংশ নেবেন। তবে পরে পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে সরাসরি আলোচনা শুরু হয়। এটিকে বড় অগ্রগতি হিসাবে দেখা হচ্ছে। ইতোমধ্যে অনেক বিষয় আলোচনায় এসেছে। লেবানন ইস্যুতেও কিছু অগ্রগতি হয়েছে।
কিছু সূত্র ইঙ্গিত দিয়েছে, ইসরাইলের অভিযান এখন লেবাননের দক্ষিণে সীমাবদ্ধ থাকবে, বৈরুতে আর কোনো হামলা হবে না।
ইরানের সূত্র অনুযায়ী, দেশটির আটকে থাকা প্রায় ৬০০ কোটি ডলার ছাড়ে রাজি হয়েছে ওয়াশিংটন। তবে যেহেতু রুদ্ধদ্বার বৈঠক, তাই তাৎক্ষণিকভাবে সব তথ্য যাচাই করা যায়নি।
খবর রয়টার্স, আলজাজিরা, তাসনিম নিউজ, ডন, এএফপিসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের।
এর আগে শনিবার সকালে মার্কিন বিমানবাহিনীর দুটি বিশেষ বিমানে যুক্তরাষ্ট্রের একটি উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিদল ইসলামাবাদ বিমানঘাঁটিতে অবতরণ করে। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের নেতৃত্বাধীন এই দলে রয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার ও বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। তাদের স্বাগত জানান পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল অসীম মুনির এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার।
অন্যদিকে, ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির নেতৃত্বে ইরানি প্রতিনিধিদল শুক্রবারই ইসলামাবাদে পৌঁছায়।
নিহত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি এবং যুদ্ধে নিহত অন্য ইরানিদের স্মরণে তারা কালো পোশাক পরে এসেছিলেন। মার্কিন হামলায় নিহত শিক্ষার্থীদের স্মৃতিচিহ্ন হিসাবে তারা নিহতদের জুতা ও ব্যাগ সঙ্গে করে নিয়ে আসেন।
শান্তি আলোচনার আগে শনিবার দুপুরে ইসলামাবাদে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে বৈঠক করে ইরানের প্রতিনিধিদল। এর আগে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের নেতৃত্বে মার্কিন প্রতিনিধিদল শাহবাজ শরিফের সঙ্গে বৈঠক করে।
পরে এক বিবৃতিতে শাহবাজ শরিফ আশা প্রকাশ করেন, এ আলোচনা মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে একটি বড় ধাপ হিসাবে কাজ করবে। একই সঙ্গে দুই পক্ষকে সম্ভাব্য সব ধরনের সহযোগিতা দিতে পাকিস্তানের অঙ্গীকারের কথা তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন।
পরে ইরানের প্রতিনিধিদলটি পাকিস্তানের সেনাপ্রধান অসীম মুনিরের সঙ্গেও বৈঠক করে। দুই বৈঠকে ইরানি প্রতিনিধিদল জানায়, তারা যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এবং পূর্ব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অগ্রগতি মূল্যায়ন করবে।
নিশ্চিদ্র নিরাপত্তায় রেড জোন: এই হাইভোল্টেজ আলোচনাকে কেন্দ্র করে ২০ লাখ মানুষের শহর ইসলামাবাদকে নজিরবিহীন নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে ফেলা হয়েছে।
শহরের মোড়ে মোড়ে হাজার হাজার সেনাসদস্য ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে এবং মূল কেন্দ্রটিকে রেড জোন হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছে।
লেবাননে সংঘাত অব্যাহত: দক্ষিণ লেবাননে শনিবারও ইসরাইলি হামলা অব্যাহত ছিল। বৈরুতের আকাশে ইসরাইলি ড্রোন এবং যুদ্ধবিমানের শব্দ শোনা গেছে। অন্যদিকে, হিজবুল্লাহও ইসরাইলি অবস্থানে একাধিক পালটা হামলা চালিয়েছে।
মঙ্গলবার ওয়াশিংটনে ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে আলাদা বৈঠক হওয়ার কথা থাকলেও এর আলোচ্যসূচি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বিভ্রান্তি রয়েছে। লেবানন বলছে, এটি যুদ্ধবিরতির আলোচনা আর ইসরাইল একে ‘আনুষ্ঠানিক শান্তি আলোচনা’ হিসাবে অভিহিত করছে।
৭ ইস্যুতে আলোচনায় গুরুত্ব: বৈঠকে দুই পক্ষের মধ্যে মূলত সাতটি বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
এগুলো হলো-১. ইরান লেবাননে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি চায়। মার্চ থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলি হামলায় সেখানে ইরান সমর্থিত হিজবুল্লাহর প্রায় ২ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন।
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র বলছে, লেবাননে ইসরায়েলি অভিযান মার্কিন-ইরান যুদ্ধবিরতির অংশ নয়; তবে তেহরানের দাবি, এটি চুক্তির অবিচ্ছেদ্য অংশ।
২. ইরান চায় যুক্তরাষ্ট্র তাদের আটকে থাকা সম্পদ ছাড় করুক এবং অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেওয়া সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করুক।
ওয়াশিংটন ইঙ্গিত দিয়েছে যে তারা উলেখযোগ্য মাত্রায় নিষেধাজ্ঞা শিথিল করতে রাজি, তবে এর বিনিময়ে ইরানকে তাদের পারমাণবিক ও মিসাইল কর্মসূচিতে ছাড় দিতে হবে।
৩. ইরান হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের কর্তৃত্বের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি চায়। তারা এ পথ দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের কাছ থেকে ট্রানজিট ফি আদায় এবং প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা করেছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্যে বিশাল পরিবর্তন আনবে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র চায় কোনো ধরনের টোল বা সীমাবদ্ধতা ছাড়াই তেলের ট্যাংকার ও অন্যান্য বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য প্রণালিটি পুরোপুরি উন্মুক্ত থাকুক।
৪. ছয় সপ্তাহের এই যুদ্ধে হওয়া সব ক্ষয়ক্ষতির জন্য ইরান ক্ষতিপূরণ চেয়েছে।
৫. ইরান তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি চায়। তবে ওয়াশিংটন এটি সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জোর দিয়ে বলেছেন যে এ বিষয়ে বিন্দুমাত্র আপস করা হবে না।
৬. ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র উভয় দেশই চায় ইরানের মিসাইল সক্ষমতা ব্যাপকভাবে কমিয়ে আনা হোক। কিন্তু তেহরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে, তাদের শক্তিশালী মিসাইল ভান্ডারের বিষয়ে কোনো আলোচনা করতে রাজি নয়।
৭. ইরান চায় মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন যুদ্ধকামী বাহিনী প্রত্যাহার করা হোক, সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ হোক এবং ভবিষ্যতে আর কোনো আগ্রাসন না চালানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হোক।
অন্যদিকে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শান্তিচুক্তিতে না পৌঁছানো পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক শক্তি বজায় রাখার অঙ্গীকার করেছেন।
আটকে থাকা সম্পদ ও লেবানন ইস্যু: ইরানের একটি জ্যেষ্ঠ সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, সরাসরি আলোচনা শুরুর আগেই কাতারসহ বিভিন্ন বিদেশি ব্যাংকে আটকে থাকা ইরানের ৬০০ কোটি ডলার ছাড় করতে যুক্তরাষ্ট্র সম্মত হয়েছে।
ইরান এটিকে আলোচনার প্রতি ওয়াশিংটনের ‘আন্তরিকতা’ হিসাবে দেখছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সম্পদ ছাড়ের বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি। এই ৬০০ কোটি ডলার মূলত ২০১৮ সালে প্রথমবার আটকে দেওয়া হয়।
এরপর ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বন্দিবিনিময় চুক্তির অংশ হিসাবে এটি ছাড় করার কথা ছিল। কিন্তু ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইরানের মিত্র ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী গোষ্ঠী হামাস ইসরাইলে আকস্মিক হামলা চালানোর পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসন আবারও ওই অর্থ আটকে দেয়।
সেসময় মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, অদূরভবিষ্যতে ইরান এই অর্থের নাগাল পাবে না এবং হিসাবটি পুরোপুরি জব্দ রাখার অধিকার ওয়াশিংটনের রয়েছে।
মূলত দক্ষিণ কোরিয়ায় ইরানের তেল বিক্রির অর্থ ছিল এগুলো। ডোনাল্ড ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে ২০১৮ সালে পারমাণবিক চুক্তি বাতিল করে ইরানের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে দক্ষিণ কোরিয়ার ব্যাংকে এই অর্থ আটকে যায়। পরে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে দোহার মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বন্দিবিনিময় চুক্তির আওতায় অর্থগুলো কাতারের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করা হয়।
ওই চুক্তির অধীনে ইরানে বন্দি পাঁচ মার্কিন নাগরিকের মুক্তির বিনিময়ে এই অর্থ ছাড় করা এবং যুক্তরাষ্ট্রে বন্দি পাঁচ ইরানিকে মুক্তি দেওয়ার কথা ছিল।