ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের প্রেক্ষিতে সৃষ্ট অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে এশীয় প্রতিবেশীদের, বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জ্বালানি নিরাপত্তা ও অপরিশোধিত তেল আমদানিতে সহায়তার জন্য ১০ বিলিয়ন (১ হাজার কোটি) ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে জাপান।
বুধবার (১৫ এপ্রিল) এশিয়ার অন্যান্য দেশের নেতাদের সঙ্গে এক অনলাইন বৈঠক শেষে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি এ সহায়তার কথা ঘোষণা করেন।
জাপান পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যের জন্য দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর ওপর নির্ভরশীল, যার মধ্যে চিকিৎসা সরঞ্জাম অন্যতম। বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে তাকাইচি এই গুরুত্বের কথা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, ‘জাপান সাপ্লাই চেইনের মাধ্যমে এশিয়ার প্রতিটি দেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত এবং আমরা একে অপরের ওপর নির্ভরশীল।’
জাপানের এই বিশেষ উদ্যোগের লক্ষ্য হলো, এশিয়ার দেশগুলোকে অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য সংগ্রহে সহায়তা করা। সেই সঙ্গে সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ ব্যবস্থা বজায় রাখা এবং তেলের মজুত বাড়াতেও কাজ করবে এই তহবিল।
হরমুজ প্রণালিতে অবরোধের কারণে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে এশিয়া বিশেষভাবে ঝুঁকির মুখে পড়ে। কারণ, এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে যাতায়াত করা তেল ও গ্যাসের প্রায় ৯০ শতাংশই এশিয়ার দেশগুলোর জন্য নির্ধারিত।
জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই ১০ বিলিয়ন ডলারের আর্থিক সহায়তা দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর জোট আসিয়ানের (এসিয়ান) সদস্য দেশগুলোর প্রায় এক বছরের অপরিশোধিত তেল আমদানির খরচের সমান।
মন্ত্রণালয় আরও জানায়, ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ অন্যান্য দেশের নেতারা এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। এই প্রকল্পের অর্থায়ন আসবে বিভিন্ন উৎস থেকে। এর মধ্যে জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন (জেবিআইসি) ও নিপ্পন এক্সপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট ইন্স্যুরেন্সের মতো রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা এবং জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা) ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) অন্যতম।
তাকাইচি অবশ্য আশ্বস্ত করে বলেছেন, এই উদ্যোগের ফলে জাপানের অভ্যন্তরীণ তেল সরবরাহে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।
২০২৫ সালের শেষে জাপানের সংরক্ষিত মজুত দিয়ে দেশটির ২৫৪ দিনের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানো সম্ভব ছিল। তবে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের কারণে কর্তৃপক্ষ সেই মজুত ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছে। গত মাসে জাপান তাদের মজুত থেকে রেকর্ড ৫০ দিনের ব্যবহারের সমপরিমাণ তেল ছেড়েছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মে মাসের শুরুর দিকে আরও ২০ দিনের ব্যবহারের সমান তেল ছাড়া হবে।
জাপান বর্তমানে ন্যাপথার ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগে আছে। এটি অপরিশোধিত তেল থেকে তৈরি একটি পেট্রোকেমিক্যাল, যা প্লাস্টিক তৈরির প্রধান কাঁচামাল। বিশেষ করে হাসপাতালগুলোতে এটি নিয়ে শঙ্কা সবচেয়ে বেশি। কারণ সিরিঞ্জ, গ্লাভস এবং ডায়ালিসিস যন্ত্রপাতির মতো জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জাম তৈরিতে এই উপাদানটি প্রয়োজন হয়।
তাকাইচি সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন এবং এখনই কোনো বিঘ্ন ঘটবে না বলে আশ্বস্ত করেছেন। তবে ক্রমবর্ধমান বয়স্ক জনসংখ্যার চাপে থাকা জাপানের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা ন্যাপথার ঘাটতির কারণে আরও সংকটে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এদিকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতেও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। তেলের আকাশছোঁয়া দামের কারণে এ অঞ্চলের দেশগুলো বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জ্বালানি সাশ্রয়ে সরকারগুলো জনগণকে গাড়ি শেয়ার করা (কারপুল) এবং এসি ব্যবহার কমানোর পরামর্শ দিচ্ছে। এরই মধ্যে ফিলিপাইন দেশজুড়ে ‘জাতীয় জ্বালানি জরুরি অবস্থা’ ঘোষণা করেছে।
বুধবার জাপানের আয়োজিত ওই শীর্ষ সম্মেলনেই ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়র আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোকে তাদের জ্বালানি বিনিময় চুক্তি (ফুয়েল-শেয়ারিং প্যাক্ট) কার্যকর করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘এশিয়ার কোনো একক দেশ একা পদক্ষেপ নিয়ে এই মাত্রার সাপ্লাই চেইন বিপর্যয় থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারবে না।’