যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সংঘাত নিরসনে একটি সম্ভাব্য চুক্তির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে দুই দেশ।
হোয়াইট হাউজ সূত্রে জানা গেছে, তেহরানের সাথে একটি এক পৃষ্ঠার সংক্ষিপ্ত সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের প্রস্তুতি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এই চুক্তির প্রাথমিক লক্ষ্য হলো বর্তমান যুদ্ধাবস্থার অবসান ঘটানো এবং ভবিষ্যতে একটি পূর্ণাঙ্গ ও বিস্তারিত পারমাণবিক চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য প্রয়োজনীয় রূপরেখা তৈরি করা। দুইজন মার্কিন কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো এই ইতিবাচক অগ্রগতির খবর নিশ্চিত করেছেন।
আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে ইরানের কাছ থেকে চূড়ান্ত উত্তরের অপেক্ষায় রয়েছে ওয়াশিংটন। যদিও এখনো কোনো কিছুই আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত হয়নি, তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে দুই পক্ষ এই প্রথম কোনো চুক্তির এত কাছাকাছি পৌঁছেছে।
প্রস্তাবিত এই সমঝোতা স্মারকের আওতায় ইরান তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচিতে সাময়িক স্থগিতাদেশ দিতে রাজি হতে পারে। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর আরোপিত কঠোর নিষেধাজ্ঞাগুলো প্রত্যাহার করে নেবে এবং বিশ্বজুড়ে আটকে থাকা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের ইরানি তহবিল অবমুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দেবে। এছাড়া উভয় পক্ষ পারস্য উপসাগরের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলের ওপর আরোপিত সব ধরনের বিধিনিষেধ তুলে নিতে একমত হয়েছে।
সমঝোতার খসড়া অনুযায়ী, এই এক পৃষ্ঠার নথিতে মোট ১৪টি দফা রয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনার সরাসরি এবং মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ইরানি কর্মকর্তাদের সাথে এ বিষয়ে সংলাপ চালিয়ে যাচ্ছেন। এই সমঝোতা স্মারকটি স্বাক্ষরিত হলে তা আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘোষণা করবে এবং একটি ৩০ দিনের নিবিড় আলোচনার সময়কাল শুরু হবে।
এই সময়ের মধ্যেই হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া, পরমাণু কর্মসূচির সীমাবদ্ধতা এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিস্তারিত রূপরেখা চূড়ান্ত করা হবে।
পারমাণবিক ইস্যুতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কতদিন স্থগিত থাকবে, তা নিয়ে বর্তমানে দুই পক্ষের মধ্যে দরকষাকষি চলছে। সূত্রগুলো জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ২০ বছরের মেয়াদ চাইলেও ইরান প্রথমে ৫ বছরের প্রস্তাব দিয়েছিল, তবে এখন ১২ থেকে ১৫ বছরের একটি সময়সীমার মধ্যে বিষয়টি রফা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এছাড়া ইরান যদি এই চুক্তির কোনো শর্ত লঙ্ঘন করে, তবে স্থগিতাদেশের মেয়াদ আরও বাড়ানোর বিধান রাখার দাবি জানিয়েছে ওয়াশিংটন। ইরান যাতে কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা এ সংক্রান্ত কোনো কার্যকলাপে লিপ্ত না হয়, সেই প্রতিশ্রুতিও এই নথিতে অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
এই সমঝোতার একটি অন্যতম চমকপ্রদ দিক হলো ইরানের উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দেশ থেকে সরিয়ে ফেলার বিষয়টি। আগে এই দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করলেও এখন তেহরান তা মেনে নিতে পারে বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। এমনকি আলোচনার টেবিলে একটি প্রস্তাব এমনও রয়েছে যে, এই সব পারমাণবিক পদার্থ সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রে সরিয়ে নেওয়া হবে। এছাড়া জাতিসংঘ পরিদর্শকদের মাধ্যমে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে যেকোনো সময় আকস্মিক পরিদর্শনের সুযোগ দিতেও ইরান সম্মত হতে পারে বলে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি হরমুজ প্রণালিতে তার ঘোষিত সামরিক অভিযান থেকে পিছিয়ে এসেছেন এবং ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি বজায় রাখতে সচেষ্ট হয়েছেন। মার্কিন কর্মকর্তারা দাবি করছেন, মূলত আলোচনার টেবিলে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হওয়ার কারণেই ট্রাম্প এই সংযত অবস্থান নিয়েছেন। তবে হোয়াইট হাউজের একটি অংশ এখনো সন্দিহান যে, ইরানের অভ্যন্তরীণ নেতৃত্বের মধ্যে বিদ্যমান মতভেদের কারণে শেষ পর্যন্ত এই চুক্তিটি বাস্তবে রূপ নেবে কিনা। তেহরানের কট্টরপন্থী এবং মধ্যপন্থীদের মধ্যে ঐকমত্য না হলে আলোচনা আবারো ভেস্তে যাওয়ার শঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এই পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছেন, একদিনের মধ্যে কোনো চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব নয় কারণ এটি অত্যন্ত জটিল এবং কারিগরি বিষয়। তবে তিনি স্পষ্ট করেছেন, ইরানের পক্ষ থেকে কূটনৈতিক সমাধানের সদিচ্ছা এবং সম্মুখভাগে বড় ধরনের ছাড় দেওয়ার মানসিকতা থাকলেই কেবল এই আলোচনা ফলপ্রসূ হবে। রুবিও ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের কঠোর সমালোচনা করলেও একইসাথে একটি সুনির্দিষ্ট কূটনৈতিক কাঠামোর প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। সূত্র: অ্যাক্সিওস