যে কারণে হঠাৎ ভারত সফরে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও তাঁর প্রথম আনুষ্ঠানিক সফরে ভারতে এসে পৌঁছেছেন। শনিবার (২৩ মে) ভোরের আলো ফুটতেই তিনি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের কলকাতায় অবতরণ করেন। চার দিনব্যাপী এই দীর্ঘ দ্বিপাক্ষিক সফরে তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সাথে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে মিলিত হবেন।

সফরসূচি অনুযায়ী, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভারতের মোট চারটি অঞ্চল বা এলাকা পরিদর্শন করবেন, যার প্রথম গন্তব্য হিসেবে তিনি কলকাতাকে বেছে নিয়েছেন। মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্যমতে, কলকাতায় অবস্থানকালে রুবিও প্রয়াত শান্তিতে নোবেলজয়ী মাদার তেরেসার স্মৃতিবিজড়িত বেশ কয়েকটি স্থান ঘুরে দেখবেন। এরপর তিনি রাজধানী নয়াদিল্লির উদ্দেশ্যে রওনা হবেন এবং আজ দিনের পরবর্তী অংশে প্রধানমন্ত্রী মোদীর সাথে সাক্ষাৎ করবেন।

রুবিওর এই ঝটিকা সফরটি এমন এক তাৎপর্যপূর্ণ সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশেষ করে চিনের সাথে আমেরিকার কূটনৈতিক যোগাযোগ নতুন করে জোরদার হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক চীন সফর শেষ হওয়ার মাত্র এক সপ্তাহের মাথায় তাঁর পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভারতে এই সফর শুরু করলেন।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি-র এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, মূলত ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে বিশ্বজুড়ে যে তীব্র জ্বালানি সংকট ও জটিল ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তার পটভূমিতেই রুবিওর এই সফর অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করছে।

বর্তমানে ভারত তার অভ্যন্তরীণ জ্বালানি চাহিদার ৮০ শতাংশেরও বেশি মেটায় আন্তর্জাতিক বাজার থেকে আমদানির মাধ্যমে। ফলে ১৪০ কোটিরও বেশি জনসংখ্যার এই বিশাল দেশটি চলমান বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটে সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী রাষ্ট্রগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে। দৈনন্দিন গৃহস্থালির রান্নার গ্যাস থেকে শুরু করে পরিবহন খাতের পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য—সবকিছুর জন্যই ভারতকে পুরোপুরি বিদেশি জ্বালানির ওপর ভরসা করতে হচ্ছে।

ভারতের এই কঠিন চ্যালেঞ্জের বিষয়টি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিও নিজেও স্বীকার করেছেন। এক বিবৃতিতে তিনি আশ্বস্ত করে বলেন, "ভারত নিজেদের চাহিদানুযায়ী যে পরিমাণ জ্বালানি আমাদের কাছ থেকে কিনতে আগ্রহী হবে, আমরা ঠিক ততটাই তাদের সরবরাহ করতে প্রস্তুত। আর আপনারা সবাই জানেন যে, বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি উৎপাদন ও বিদেশে রপ্তানির পরিমাণ ইতিহাসের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে।"

নয়াদিল্লিও এই সংকটের মুখে আমেরিকা থেকে তেল ও গ্যাস আমদানির পরিমাণ বাড়াতে বিশেষ আগ্রহী হতে পারে। এর ফলে ভারতের সাথে ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের বিদ্যমান বাণিজ্যঘাটতি কিছুটা হ্রাস পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে, যা মূলত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বরাবরই অসন্তুষ্ট বা বিরক্ত করে আসছিল। তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালে ভারতের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য বাণিজ্যঘাটতির পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ৮২০ কোটি ডলার, যা ২০২৪ সালের তুলনায় প্রায় ২৭ দশমিক ১ শতাংশ বেশি।

তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই জ্বালানি সমীকরণটি কাগজে-কলমে যতটা সহজ, বাস্তবে ততটা নয়। কারণ আমেরিকা থেকে জলপথে ভারতে জ্বালানি নিয়ে আসার পথটি অত্যন্ত দীর্ঘ, যার ফলে পরিবহন খরচ (শিপিং কস্ট) অনেক বেশি বেড়ে যাওয়ার একটি বড় ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে। সূত্র: এএফপি ও বিবিসি