ইরান যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বড় ধরনের ঝড় তুলেছে। এই যুদ্ধ ট্রাম্প প্রশাসনকে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করে দিচ্ছে এবং আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকানদের জনপ্রিয়তায় ধস নামার ইঙ্গিত মিলছে।
সম্প্রতি কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস-এর বরাত দিয়ে ইরানের ‘ইন্টারন্যাশনাল গ্রুপ অফ স্টুডেন্ট নিউজ এজেন্সি’ এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
"নির্বাচন নিয়ে আমি পরোয়া করি না": ট্রাম্পের দাবি
গত বুধবার মন্ত্রিসভার এক বৈঠকের ফাঁকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, "মধ্যবর্তী নির্বাচনে কী হয়, তা নিয়ে আমি পরোয়া করি না।"
তিনি আরও উল্লেখ করেন, আলোচনার নামে সময়ক্ষেপণ করার জন্য ইরানি নেতারা তার নির্বাচনী দুর্বলতার ওপর নির্ভর করতে পারবে না।
ইরান ইস্যুতে ট্রাম্পের হিসাব-নিকাশ যা-ই হোক না কেন, রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আসন্ন নভেম্বরের নির্বাচনে ইরান একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর বা নির্ধারক ভূমিকা পালন করতে যাচ্ছে।
রাজনীতি ও পররাষ্ট্রনীতি: ট্রাম্পের স্ববিরোধিতা
ইরানের ব্যাপারে নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে তিনি মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ঊর্ধ্বে কাজ করছেন—ট্রাম্পের এমন দাবি অবশ্য নতুন নয়।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে তিনি বারবার রাজনৈতিক চাপে থাকার বিষয়টি অস্বীকার করে বলেছেন, "সময় আমাদের পক্ষে।"
এমনকি চলতি মাসের শুরুতে সাংবাদিকদের তিনি বলেছিলেন, "আমি আমেরিকানদের আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে ভাবি না। আমি কারও কথাই ভাবি না।"
প্রেসিডেন্টদের কাছ থেকে সাধারণত আশা করা হয় যে তারা বলবেন—তাদের পররাষ্ট্রনীতি সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কোনো ভূমিকা নেই। যদিও বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই স্ববিরোধিতার কারণেই বিল ক্লিনটনের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা টনি লেক একে ভিক্টোরীয় যুগের যৌনতা বিষয়ক কঠোর বিধিনিষেধের সাথে তুলনা করে বলেছিলেন:
“এ নিয়ে কেউ প্রকাশ্যে কথা বলে না, কিন্তু এটি সবার মনে ঠিকই থাকে।”
ঐতিহাসিক ধারার মুখে রিপাবলিকানরা
আমেরিকার রাজনৈতিক ইতিহাসে হাউস মিডটার্ম (মধ্যবর্তী) নির্বাচন প্রায়শই ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের কর্মক্ষমতার ওপর একটি গণভোটের মতো কাজ করে। আর এই পরীক্ষায় প্রেসিডেন্টরা খুব কমই সফল হন।
ঐতিহাসিক পরিসংখ্যান: ১৮৬০-এর দশকে আধুনিক দ্বিদলীয় ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে, প্রেসিডেন্টের দল ৪১ বারের মধ্যে মাত্র ৪ বার প্রতিনিধি পরিষদে আসন বাড়াতে পেরেছে।
আসন হারানোর গড়: গত পাঁচটি মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্টের দল গড়ে ৩১টি আসন হারিয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতি: রিপাবলিকানরা এখন প্রতিনিধি পরিষদে মাত্র ৫টি আসনে এগিয়ে আছে।
ইরান যুদ্ধ ট্রাম্পকে রাজনৈতিকভাবে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, যা রিপাবলিকানদের জন্য এই ঐতিহাসিক নেতিবাচক ধারাকে উল্টে দেওয়া আরও কঠিন করে তুলেছে।
হু হু করে কমছে ট্রাম্পের জনসমর্থন
ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরায়েলি আগ্রাসনের শুরুতে ট্রাম্পের সামগ্রিক জনসমর্থন ছিল ঋণাত্মক ১৩.৪ শতাংশ পয়েন্ট (৪২% সমর্থন বনাম ৫৫.৪% অসমর্থন)। বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এই ব্যবধান আরও বেড়ে ঋণাত্মক ১৯.৪ শতাংশ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। এখন মাত্র ৩৮.৫ শতাংশ আমেরিকান তার কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করছেন, আর ৫৭.৯ শতাংশই করছেন বিরোধিতা।
নিজস্ব ‘মেগা’ বেসেও ধস
ট্রাম্পের সাম্প্রতিক সমর্থন হ্রাসের একটি বড় অংশ এসেছে স্বতন্ত্র (Independent) ভোটারদের কাছ থেকে। তবে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, তিনি তার নিজস্ব রাজনৈতিক ভিত্তি বা ‘মেগা’ (MAGA) বেস থেকেও সমর্থন হারাচ্ছেন।
শ্বেতাঙ্গ ভোটার: সর্বশেষ সিবিএস নিউজ জরিপে দেখা গেছে, কলেজ ডিগ্রিহীন শ্বেতাঙ্গদের ৫৪ শতাংশ এখন ট্রাম্পের কর্মকাণ্ডকে নেতিবাচকভাবে দেখছেন; যা গত ফেব্রুয়ারিতে ছিল মাত্র ৩২ শতাংশ।
ল্যাটিনো ভোটার: দুই-তৃতীয়াংশ ল্যাটিনো ভোটার এখন তার ট্রাম্পের ওপর অসন্তুষ্ট।
তরুণ ভোটার: ‘নিউইয়র্ক টাইমস-সিয়েনা কলেজ’ জরিপ অনুযায়ী, গত কয়েক মাসে তরুণদের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা প্রায় ১০ শতাংশ পয়েন্ট কমে গেছে।
মার্কিন অর্থনীতি ও ভোটের মাঠে এর প্রভাব
বিশ্লেষকদের মতে, কিছু ট্রাম্প সমর্থকের এই ক্ষোভ সরাসরি যুদ্ধের চেয়ে মার্কিন অর্থনীতির ওপর যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাবেরই প্রতিফলন। ইরান যুদ্ধ যদি দ্রুত শেষও হয়ে যায়, তবুও পেট্রোলের দাম যুদ্ধ-পূর্ববর্তী পর্যায়ে ফিরে যেতে কয়েক সপ্তাহ বা মাস পেরিয়ে যাবে।
তেল, গ্যাস এবং সারের মূল্যবৃদ্ধির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব মার্কিন অর্থনীতিকে আরও কিছুদিন ভুগিয়ে যাবে। এই সুযোগে বিরোধী ডেমোক্র্যাটরাও নির্বাচনী প্রচারণায় ভোটারদের বোঝানোর চেষ্টা করছে যে—ট্রাম্পের যুদ্ধংদেহী নীতির কারণেই সাধারণ মানুষের আর্থিক অবস্থা ও জীবিকা হুমকির মুখে পড়েছে।
সব মিলিয়ে, নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্প ও তার দলের জন্য এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষা অপেক্ষা করছে।