অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে উঠতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্ত মেনে জ্বালানি তেলের দাম সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়েছে শ্রীলঙ্কা।
মূলত তেলের প্রকৃত উৎপাদন ও আমদানি ব্যয় উসুল করা এবং ভর্তুকি ধীরে ধীরে প্রত্যাহার করার অংশ হিসেবেই দেশটির সরকার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
রোববার (১ জুন) এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি।
পেট্রোল ও ডিজেলের নতুন দাম
শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি সংস্থা 'সিলন পেট্রোলিয়াম করপোরেশন' জানিয়েছে, নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রতি লিটার পেট্রোলের দাম ৪১০ রুপি থেকে বাড়িয়ে ৪৩৪ রুপি (প্রায় ১.৩৩ মার্কিন ডলার) করা হয়েছে। অন্যদিকে, প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ৩৯২ রুপি থেকে বাড়িয়ে করা হয়েছে ৪০৭ রুপি।
আইএমএফের ঋণ ও কঠোর শর্ত
সম্প্রতি আইএমএফ শ্রীলঙ্কার জন্য অনুমোদিত ২.৯ বিলিয়ন ডলারের বেলআউট (আর্থিক সহায়তা) প্যাকেজের আওতায় দ্বিতীয় কিস্তির ৬৯৫ মিলিয়ন ডলার ছাড়ের অনুমোদন দেয়।
২০২৩ সালের শুরুতে দ্বীপরাষ্ট্রটির ধসে পড়া অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করতে এই ঋণ কর্মসূচি চালু করা হয়েছিল। ঋণের নতুন কিস্তি অনুমোদনের মাত্র কয়েক দিনের মাথায় জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধি করা হলো।
আইএমএফের কঠোর নির্দেশনা রয়েছে যে, শ্রীলঙ্কাকে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি পুরোপুরি প্রত্যাহার করে প্রকৃত ব্যয় আদায় নিশ্চিত করতে হবে।
ভর্তুকি নিয়ে প্রেসিডেন্টের বক্তব্য
শ্রীলঙ্কার বর্তমান প্রেসিডেন্ট অনুরা কুমারা দিসানায়েকে আইএমএফকে পাঠানো এক চিঠিতে নিশ্চিত করেছেন যে, আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে জ্বালানি খাতের ভর্তুকি ধাপে ধাপে সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে।
মধ্যপ্রাচ্য সংকট ও শ্রীলঙ্কার অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম ঊর্ধ্বমুখী। ইরান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ 'হরমুজ প্রণালি' কার্যত বন্ধ করে দেওয়ায় বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহে তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে।
উল্লেখ্য, বিশ্বের মোট তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এই নৌপথ দিয়েই পরিবাহিত হয়।
এই সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে শ্রীলঙ্কার ওপর। গত ২৮ ফেব্রুয়ারির পর থেকে দেশটিতে পেট্রোল ও ডিজেলের দাম প্রায় ৪৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সময়ে বিদ্যুতের দামও বেড়েছে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।
২০২২ সালের সংকটের পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা
শ্রীলঙ্কা তাদের প্রয়োজনীয় সব ধরনের জ্বালানি তেল এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কয়লা বিদেশ থেকে আমদানি করে। ফলে বিশ্ববাজারের সামান্য ওঠানামাও দেশটির অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলে।
কলম্বো প্রশাসন সতর্ক করে জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের এই চলমান সংঘাত যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে ২০২২ সালের ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে ওঠার যে প্রক্রিয়া এখন চলছে, তা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে।
২০২২ সালে ৪৬ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক ঋণে খেলাপি হওয়ার পর থেকেই মূলত আইএমএফের সহায়তায় অর্থনীতি স্থিতিশীল করার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশটি।