তিন মাস ধরে চলমান ইরান সংকটে চরম ঝুঁকিতে পড়েছে পাকিস্তানের জ্বালানি খাত। এই দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে এবং ভবিষ্যতের বড় বিপর্যয় এড়াতে প্রথমবারের মতো নিজস্ব ‘কৌশলগত পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ’ (Strategic Petroleum Reserve) বা তেলের মজুত গড়ে তোলার জরুরি উদ্যোগ নিয়েছে ইসলামাবাদ।
সোমবার (১ জুন) জাপানভিত্তিক খ্যাতনামা সংবাদমাধ্যম নিক্কেই এশিয়ার এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার খোঁজে পাকিস্তান
নিক্কেই এশিয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাকিস্তানের জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের অধীন পেট্রোলিয়াম বিভাগ সম্প্রতি কৌশলগত তেল মজুত গড়ে তোলার সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে একটি সমীক্ষা পরিচালনার জন্য দরপত্র আহ্বান করেছে।
সরকারি নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তীব্র অস্থিরতা এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা দেশটিকে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করিয়েছে।
বর্তমানে পাকিস্তানের প্রায় ৯০ শতাংশ আমদানিকৃত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) বড় অংশই ওমান ও পারস্য উপসাগর সংলগ্ন হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে আসে। কিন্তু জরুরি পরিস্থিতিতে ব্যবহারের জন্য দেশটির নিজস্ব কোনো কৌশলগত তেল মজুত নেই।
এই সংকট মোকাবিলায় পাকিস্তান সরকার এখন একটি ত্রিমুখী কাঠামো তৈরির পরিকল্পনা করছে:
রাষ্ট্রীয় সংরক্ষণাগার (State-owned reserves)
শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বাধ্যতামূলক মজুত (Mandatory industry stocks)
বাণিজ্যিকভাবে পরিচালিত বন্ডেড স্টোরেজ সুবিধা (Bonded storage)
গওয়াদর বন্দরে বন্ডেড টার্মিনাল ও বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব
সরকারি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ও চীনের সঙ্গে পাকিস্তানে বন্ডেড তেল টার্মিনাল স্থাপনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চালাচ্ছে পাকিস্তান সরকার।
কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ গওয়াদর বন্দরকে এই প্রকল্পের সম্ভাব্য প্রধান স্থান হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। কোনো জরুরি পরিস্থিতি বা যুদ্ধাবস্থা সৃষ্টি হলে এসব স্থাপনায় সংরক্ষিত জ্বালানি সরাসরি দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণে ব্যবহার করা যাবে।
লক্ষ্যমাত্রা: পরিকল্পনার প্রথম ধাপে অন্তত ৪৫ দিনের জ্বালানি চাহিদা মেটানোর সক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে তা বাড়িয়ে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ৯০ দিনের সমপরিমাণ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) সুপারিশ অনুযায়ী, আমদানিনির্ভর দেশগুলোর কমপক্ষে ৯০ দিনের তেল মজুত রাখা আবশ্যক।
অর্থায়ন ও বিশ্লেষকদের মতামতঃ চ্যালেঞ্জ যেখানে
জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, বন্ডেড সংরক্ষণ ব্যবস্থা কার্যকর করতে হলে জরুরি অবস্থায় মজুত তেল ব্যবহারের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা, মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি ও সরবরাহ অগ্রাধিকার বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা থাকতে হবে।
অন্যথায় এটি প্রকৃত কৌশলগত মজুতের পরিবর্তে সাধারণ বাণিজ্যিক গুদাম হিসেবেই থেকে যেতে পারে।
প্রকল্পের সম্ভাব্য খরচ ও অর্থায়ন:
প্রাথমিকভাবে এক মাসের তেল মজুত গড়ে তুলতেই পাকিস্তানের প্রায় ১০০ কোটি মার্কিন ডলার ব্যয় হতে পারে।
এই বিশাল অর্থায়নের জন্য সরকার বিদ্যমান পেট্রোলিয়াম লেভি থেকে প্রতি লিটারে ১০ পাকিস্তানি রুপি করে বিশেষ তহবিল গঠনের বিষয়টি বিবেচনা করছে।
তবে বেসরকারি খাতকে এই প্রকল্পে সম্পৃক্ত করা গেলে সরকারের আর্থিক চাপ অনেকটাই কমবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিকল্প ভাবনার পরামর্শ:
অর্থনৈতিক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, পাকিস্তানের শুধু তেল মজুত বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দিলেই চলবে না। দীর্ঘমেয়াদি টেকসই নিরাপত্তার জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি (Renewable Energy), ব্যাটারি সংরক্ষণ প্রযুক্তি এবং বৈদ্যুতিক পরিবহন (EV) ব্যবস্থার উন্নয়নেও সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।