লেবাননে চলমান সামরিক হামলা বৃদ্ধির মাধ্যমে ইসরায়েল মূলত পরোক্ষভাবে ইরানকে লক্ষ্যবস্তু করছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা।
কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আবদুল্লাহ বান্দর আল-এতাইবির মতে, ইসরায়েল ভালো করেই জানে যে ইরানকে সরাসরি স্পর্শ না করে আঘাত করার এবং দেশটির 'রক্তক্ষরণ' ঘটানোর সবচেয়ে কার্যকর জায়গা হলো লেবানন।
চলমান এই সংকটে ইসরায়েলের বহুমুখী কৌশলগত লক্ষ্য এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এর প্রভাব নিয়ে একটি বিশেষ বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছে কাতারভিত্তিক গণমাধ্যম আল-জাজিরা।
ইসরাইলের বহুমুখী কৌশল ও সম্ভাব্য পরিণতি
বিশ্লেষকদের মতে, লেবাননে হামলার পেছনে ইসরায়েলের সুদূরপ্রসারী কৌশল রয়েছে। চলমান পরিস্থিতির প্রতিটি সম্ভাব্য পরিণতির সুবিধা ইসরায়েল নিজের পক্ষে নিতে চায়:
পূর্ণ মাত্রার যুদ্ধ: যদি কোনো আলোচনা বা কূটনৈতিক সমঝোতার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়, তবে ইসরায়েল পুনরায় পূর্ণ মাত্রার সামরিক অভিযানে ফিরে যাবে, যা তাদের মূল লক্ষ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
লেবাননে অভ্যন্তরীণ সংকট: লেবাননকে যদি এমন এক চরম সংকটে ঠেলে দেওয়া যায় যা দেশটিকে গৃহযুদ্ধের দিকে ধাবিত করবে, তবে তা ইসরায়েলের জন্য আরও বেশি সুবিধাজনক পরিস্থিতি তৈরি করবে।
ভূমি দখল ও বসতি সম্প্রসারণ: যদি উপরের কোনোটিই না ঘটে, তবে ইসরায়েল লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে তাদের বসতি সম্প্রসারণের দিকে এগিয়ে যাবে। ফলে যেকোনো পরিস্থিতিতেই ইসরায়েল তার লক্ষ্য অর্জনে লাভবান হবে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান পরিবর্তন ও ট্রাম্পের নীতি
এদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নীতি পরিবর্তন এই সংকটে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প লেবানন ইস্যুতে ইসরায়েলের ওপর পূর্বে আরোপিত ‘রেড লাইন’ বা সীমারেখাগুলো পুনর্বিবেচনা করেছেন।
বর্তমান মার্কিন প্রশাসন এখন স্পষ্ট বুঝতে পেরেছে যে, লেবাননে ইসরায়েলি হামলা মূলত ইরানের ওপর চাপ বাড়াতে অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা পালন করছে। ফলে ওয়াশিংটন এখন ইসরায়েলকে একপ্রকার সবুজ সংকেত দিয়ে রেখেছে।
কঠিন উভয়সংকটে তেহরান
অধ্যাপক আল-এতাইবি সতর্ক করে বলেছেন যে, ইসরায়েলের এই ক্রমাগত বিমান হামলা এবং বেসামরিক নাগরিকদের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির আদেশ তেহরানকে এক কঠিন উভয়সংকটে (Dilemma) ফেলে দিয়েছে। এর ফলে ইরানের সামনে এখন দুটি পথ খোলা রয়েছে:
সরাসরি যুদ্ধে জড়ানো: পরিস্থিতির চাপে পড়ে ইরান হয়তো পুনরায় সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে বাধ্য হবে, যার পুরো দায় আন্তর্জাতিক মহলে তাদের ওপরই বর্তাবে।
প্রক্সি নেটওয়ার্কের ভাঙন: অথবা এই প্রচণ্ড চাপের মুখে ইরান-লেবানন অক্ষ বা প্রতিরোধ জোট ভেঙে যাবে।
যদি দ্বিতীয় পরিস্থিতিটি ঘটে, তবে তা মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক প্রকল্প এবং তাদের প্রক্সি বা মিত্র গোষ্ঠীগুলোর (যেমন হিজবুল্লাহ) জন্য একটি বিরাট ও দীর্ঘমেয়াদি ধাক্কা হবে।