চুক্তি লঙ্ঘন, গাজায় ৪০টি স্থায়ী সামরিক ঘাঁটি বানাচ্ছে ইসরায়েল

গাজায় যুদ্ধবিরতি চুক্তি অনুযায়ী সেনা প্রত্যাহারের আন্তর্জাতিক চাপ ও প্রতিশ্রুতি থাকলেও, সম্পূর্ণ বিপরীত পথে হাঁটছে ইসরায়েলি বাহিনী। গাজা উপত্যকাজুড়ে তারা গড়ে তুলছে স্থায়ী এবং অত্যন্ত সুরক্ষিত সামরিক ফাঁড়ি (আউটপোস্ট)। 

কৃত্রিম উপগ্রহ বা স্যাটেলাইটের সাম্প্রতিক চিত্রে ইসরায়েলের এই গোপন তৎপরতা স্পষ্ট ধরা পড়েছে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার ‘ওপেন সোর্স ইউনিট’-এর এক বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।

স্যাটেলাইট চিত্রে ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রমাণ

 

অনুসন্ধানে মে মাস পর্যন্ত সংগৃহীত স্যাটেলাইট ডেটা বিশ্লেষণ করে গাজার ভেতরে ৪০টি সুনির্দিষ্ট ইসরায়েলি সামরিক আউটপোস্টের উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, গত বছরের অক্টোবর মাসে যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর সম্পূর্ণ নতুনভাবে ৮টি সামরিক ঘাঁটি তৈরি করা হয়েছে, যার মধ্যে একটির নির্মাণকাজ এখনও সক্রিয়ভাবে চলছে। অথচ, মার্কিন মধ্যস্থতায় সই হওয়া ওই চুক্তি অনুযায়ী গাজা থেকে সম্পূর্ণ সেনা প্রত্যাহারের বাধ্যবাধকতা ছিল ইসরাইলের।

মূল তথ্য: যুদ্ধবিরতির চুক্তি লঙ্ঘন করে গাজায় ৮টি নতুন সামরিক ঘাঁটিসহ মোট ৪০টি স্থায়ী আউটপোস্ট তৈরি করেছে ইসরায়েলি ডিফেন্স ফোর্সেস (IDF)।

গাজা দখলের প্রকাশ্য ঘোষণা নেতানিয়াহুর

এই সামরিক অবকাঠামো সম্প্রসারণের বিষয়টি ইসরায়েলি নেতৃত্বের ভূখণ্ড দখলের প্রকাশ্য উচ্চাকাঙ্ক্ষাকেই প্রমাণ করে। সম্প্রতি এক সম্মেলনে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নিশ্চিত করেছেন যে, গাজা উপত্যকার সিংহভাগ স্থায়ীভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

তিনি জানান, ইসরায়েলি বাহিনী বর্তমানে ‘ইয়েলো লাইন’ বা বাফার জোনে অবস্থান নিয়ে গাজার ৬০ শতাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। এ সময় অনুষ্ঠান থেকে সম্পূর্ণ গাজা অধিভুক্ত করার দাবি উঠলে নেতানিয়াহু বলেন,

"চলুন ধাপে ধাপে এগোই। প্রথমে ৭০ শতাংশ দিয়ে শুরু করা যাক।"

কবরস্থান গুঁড়িয়ে তৈরি হচ্ছে সেনাক্যাম্প

স্যাটেলাইট চিত্রগুলো প্রমাণ করে যে এগুলো কোনো সাময়িক পর্যবেক্ষণ চৌকি নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি সামরিক উপস্থিতির জন্য স্থায়ী অবকাঠামো। এই নতুন ঘাঁটিগুলোর ভৌগোলিক অবস্থান নিচে দেওয়া হলো:

উত্তর গাজা: ২টি নতুন সামরিক ঘাঁটি।

মধ্যাঞ্চল: ২টি নতুন ঘাঁটি।

নেতজারিম করিডোর (পূর্ব): ১টি সামরিক আউটপোস্ট।

খান ইউনিস (দক্ষিণ): ৩টি নতুন ঘাঁটি।

সবচেয়ে বড় আগ্রাসনের প্রমাণ মিলেছে খান ইউনিসের ‘ইস্টার্ন সেমেট্রি’ বা পূর্ব কবরস্থানে। সেখানে গত নভেম্বরে বুলডোজার দিয়ে কবরস্থানটি গুঁড়িয়ে দিয়ে মে মাসের মাঝামাঝির মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ সামরিক ঘাঁটি তৈরি করা হয়েছে। সেখানে বর্তমানে সামরিক যান রাখার জায়গা এবং সেনাদের থাকার জন্য পাকা ঘর তৈরি করা হয়েছে। একই চিত্র দেখা গেছে উত্তর গাজার বেইত লাহিয়াতেও।

পুরোনো ঘাঁটির আধুনিকায়ন ও গাজা বিভক্তি

নতুন ঘাঁটি তৈরির পাশাপাশি পুরোনো অবস্থানগুলোরও ব্যাপক আধুনিকায়ন ও পরিধি বাড়ানো হচ্ছে। গাজা সিটির পূর্বে একটি সামরিক ঘাঁটির আয়তন গত অক্টোবর থেকে মে মাসের মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। 

ট্যাঙ্কের মতো সাঁজোয়া যান রাখার জন্য সেখানে নতুন জোন তৈরি এবং চারপাশ জুড়ে গভীর প্রতিরক্ষামূলক পরিখা খনন করা হয়েছে।

বিশেষ করে গাজার উত্তর ও দক্ষিণ অংশকে বিচ্ছিন্নকারী ‘নেতজারিম করিডোর’ এলাকায় তিনটি পৃথক আউটপোস্টের মাধ্যমে পুরো গাজার যাতায়াত ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রেখেছে ইসরাইলি বাহিনী।

ফিলিস্তিনিদের অবরুদ্ধ করার সুপরিকল্পিত কৌশল

বিশ্লেষকদের মতে, এই ৪০টি সামরিক ঘাঁটির ভৌগোলিক অবস্থান মূলত ফিলিস্তিনি জনবসতিগুলোকে অবরুদ্ধ করার একটি সুপরিকল্পিত কৌশল। সামরিক রাস্তা, পরিখা এবং মাটির বাঁধ দিয়ে এই ঘাঁটিগুলোকে এমনভাবে যুক্ত করা হয়েছে, যা ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিক ও উদ্বাস্তুদের স্বাধীনভাবে চলাচল বা নিজেদের জমিতে যাওয়ার অধিকারকে সম্পূর্ণ কেড়ে নিয়েছে।

ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক বিশ্লেষক আবদুল্লাহ আকরাবাবি সতর্ক করে বলেছেন:

"ইসরাইলের এই বিশাল নির্মাণযজ্ঞ কেবল সাময়িক বাফার জোন তৈরির জন্য নয়। জনবসতিগুলোকে এভাবে ঘিরে ফেলে এবং অবরুদ্ধ করে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু মূলত গাজায় আবারও নতুন করে একটি গণহত্যা বা নির্মূল যুদ্ধ শুরুর স্থায়ী অবকাঠামো তৈরি করছেন।"

চুক্তি-পরবর্তী সময়েও থামেনি রক্তপাত

উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইসরাইলি হামলায় গাজায় এ পর্যন্ত প্রায় ৭৩ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে বড় অংশই নারী ও শিশু। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হওয়ার পর গত সাত মাসেও ইসরাইলি সহিংসতায় অন্তত ৯২৯ জন ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন।

আন্তর্জাতিক মহলের যুদ্ধবিরতির আহ্বানকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে গাজায় ইসরায়েলের এই স্থায়ী ঘাঁটি নির্মাণ মধ্যপ্রাচ্য সংকটকে আরও দীর্ঘমেয়াদি ও ভয়াবহ করে তুলবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।