যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধাবস্থার অবসান ঘটিয়ে একটি ঐতিহাসিক সমঝোতা চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। দীর্ঘ আলোচনার পর মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ সোমবার (১৫ জুন) ভোরে এই শান্তি চুক্তির ঘোষণা দেন। এর পরপরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ এক পোস্টে ইরানের সাথে চুক্তিতে পৌঁছানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
ইরানের আধা সরকারি বার্তা সংস্থা মেহর নিউজ এই সমঝোতা স্মারকের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শর্ত ও বিষয়বস্তু প্রকাশ করেছে। যদিও দুই দেশের কোনো শীর্ষ কর্মকর্তা এখনো এসব তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেননি।
চুক্তির প্রধান শর্ত ও বিষয়সমূহ
স্থায়ী যুদ্ধবিরতি: চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, লেবাননসহ সংশ্লিষ্ট সকল ফ্রন্টে অবিলম্বে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা হবে।
মার্কিন নৌ-অবরোধ ও সেনা প্রত্যাহার: আগামী ৩০ দিনের মধ্যে ইরানের বন্দরগুলোকে ঘিরে রাখা মার্কিন নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার করা হবে এবং ইরান থেকে মার্কিন সামরিক বাহিনী সরিয়ে নেওয়া হবে।
হরমুজ প্রণালি উন্মুক্তকরণ: কৌশলগত ও বাণিজ্যিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’ ইরানের তত্ত্বাবধানে আগামী ৩০ দিনের মধ্যে পুনরায় খুলে দেওয়া হবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, এই প্রণালি দিয়ে সম্পূর্ণ টোলমুক্তভাবে বৈশ্বিক জাহাজ চলাচল করতে পারবে।
নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও জব্দ তহবিল মুক্তকরণ: ইরানের তেল ও জ্বালানি খাতের ওপর আরোপিত সমস্ত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হবে। তবে মেহর নিউজ জানিয়েছে, নিষেধাজ্ঞার আওতায় জব্দ হওয়া ইরানি তহবিলের অন্তত অর্ধেক মুক্ত না করা পর্যন্ত চূড়ান্ত সমঝোতার আলোচনা শুরু হবে না।
ইরানের পুনর্গঠনে ৩০০ বিলিয়ন ডলার: যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র রাষ্ট্রগুলো ইরানের পুনর্গঠন কর্মসূচিতে সহায়তা করবে, যার জন্য অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি বড় পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে।
অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা: ইরান কোনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না বলে তাদের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করবে। অপরদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে আর কোনো হস্তক্ষেপ না করার এবং নতুন করে কোনো সামরিক শক্তি বৃদ্ধি বা অতিরিক্ত নিষেধাজ্ঞা আরোপ না করার অঙ্গীকার করেছে।
জাতিসংঘের অনুমোদন: দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত হতে যাওয়া এই চূড়ান্ত চুক্তিটি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবের মাধ্যমে অনুমোদন করানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
ট্রাম্পের বার্তা ও ইসরায়েলের প্রতিক্রিয়া
চুক্তি প্রসঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বের সব বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে ‘ইঞ্জিন চালু’ করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, এর মাধ্যমে তেল পরিবহন আবারও স্বাভাবিক হবে। আগামী শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে পারে।
এদিকে ট্রাম্পের এই আকস্মিক ঘোষণাকে ইতিবাচকভাবে নেয়নি ইসরায়েলের কট্টরপন্থী রাজনৈতিক মহল। আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ ডানপন্থি সংবাদমাধ্যমগুলো ইতিমধ্যে ট্রাম্পের এই পদক্ষেপের সমালোচনা শুরু করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তি কার্যকর হলে ইসরায়েল লেবাননে তাদের সামরিক অভিযান সীমিত বা বন্ধ করতে বাধ্য হতে পারে, যা তারা নিজেদের কৌশলগত পরাজয় এবং ইরানের কূটনৈতিক বিজয় হিসেবে দেখছে।